বাঁচিয়া থাকিবার জন্য আমাদের সকলকে খাবার গ্রহণ করিতে হয়; কিন্তু এই খাবার অবশ্যই স্বাস্থ্যকর ও সুষম হইতে হইবে। খাবার গ্রহণ করিতে হইবে সময়মতো; কিন্তু আধুনিক কালে ও জীবনযাপনের পদ্ধতিগত কারণেই অনেক সময় সঠিক খাবার যথাযথভাবে গ্রহণ করিতে পারি না আমরা। আমরা ফাস্টফুড বা জাংকফুডের ক্ষতি সম্পর্কে কমবেশি জানি; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানিয়া চলিতে পারি না। ইহা এক নির্মম বাস্তবতা। পথেঘাটে সহজলভ্য বিধায় আমরা প্রতিনিয়ত ফাস্টফুড গ্রহণ করিতেছি। বলিতে গেলে একপ্রকার বাধ্য হইয়াই খাইতেছি। এই ব্যাপারে আমাদের যেমন আরো সচেতনতা দরকার, তেমনি এই সকল খাবারের উত্তম ও সুলভ বিকল্পও থাকা একান্ত প্রয়োজন।
আমরা যদি একটু পিছনে ফিরিয়া তাকাই তাহা হইলে দেখিতে পাই যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বেও আমাদের প্রায় সকল খাদ্যসামগ্রী ঘরের ভিতরেই তৈরি করা হইত। এই সকল কাঁচামাল নিজ হাতে চাষ ও পরবর্তী সময়ে সেইগুলির প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ির মধ্যেই সম্পন্ন করা হইত। ফলে তাহার মধ্যে প্রাকৃতিক সকল উপাদান সংরক্ষিত থাকিত। তবে ইদানীং রাস্তার পাশের জাংকফুডের সহজলভ্যতা দিনদিন আমাদের স্বাস্থে্যর জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসাবে দেখা দিতেছে। নিয়মিত জাংকফুড খাওয়ার ফলে মানুষ স্হূলকায় হইয়া নানা অসুখবিসুখের শিকার হইতেছে। তাই অন্তত নিজের সুস্বাস্থে্যর কথা চিন্তা করিয়া হইলেও এই সকল খাবার যথাসম্ভব পরিহার করা উচিত। আসলে ফাস্টফুড হইল বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি খাবার। এই সকল খাবারে চর্বি, লবণ, কার্বনেট ইত্যাদি অতিরিক্ত মাত্রায় থাকে। ইহাতে থাকে গোপন বা লুক্কায়িত ও কৃত্রিম চিনি যাহা পরিপাকতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত বার্গার, স্যান্ডউইচ, পেস্ট্রি, কেক, বিস্কুট, পুডিং, সস, চকলেট, সুপ, কোল্ড ও অরেঞ্জ ড্রিংকস, জুস, জেলি প্রভৃতি ফাস্টফুডের অন্তভুর্ক্ত। এই সকল খাদ্যে থাকে টারট্রাজিন, কুইনোলিন ইয়েলো, সানসেট ইয়েলো, কারমোসিন, ইনডিগো কারমিন, কার্বন ব্ল্যাক, বেনজোয়িক অ্যাসিড ইত্যাদি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। ইহাতে অস্হিরতা, মাথা ঘোরা, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, পেটের বিভিন্ন পীড়া, যকৃতের সমস্যা, ডায়াবেটিস, হূদ্রোগ, আলঝেইমার এমনকি ক্যানসার সৃষ্টি হইতে পারে। ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টগুলি খাবার তৈরিতে ঘনঘন হাইড্রোজেনযুক্ত তৈল ব্যবহার করে। এই হাইড্রোজেনেটেড তৈল শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াইয়া হূদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার সৃষ্টি করে। বাণিজ্যিকভাবে প্যাকেজকৃত খাবার, বিশেষ করিয়া চিপস এবং ক্র্যাকারগুলি হাইড্রোজেনেটেড তৈলে তৈরি।
ফাস্টফুড মূলত বাসিজাতীয় খাবারে পরিণত হইয়াছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হার এক প্রতিবেদন অনুসারে, বিগত ৪০ বত্সরে স্হূলকায় মানুষের হার প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহার পাশাপাশি বৃদ্ধি পাইয়াছে উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ডায়াবেটিসের মতো অনেক সমস্যা। প্রতিনিয়ত জাংকফুড গ্রহণই এই সকল সমস্যার অন্যতম কারণ। ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের এক রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মধ্যে শতকরা প্রায় ১৭ শতাংশ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে সাড়ে ৪ শতাংশ স্থূলকায়। ফাস্টফুডে পরিমাণের অধিক কার্বোহাইড্রেড বা শর্করা এবং চর্বি থাকায় এই সমস্যা তৈরি হয়। এখন প্রশ্ন হইল, প্রতিনিয়ত ছুটিয়া চলা কর্মজীবী মানুষের যেইখানে খাবার তৈরির সময়টুকুও হইয়া উঠে না অনেক সময়, তাহাদের ফাস্টফুড গ্রহণ না করিয়া উপায় কী? আসলে আমাদের বিজ্ঞাপনে প্রলোভিত হওয়া উচিত নহে। তাই পূর্বে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করিতে হইবে। ইহার সহিত ফাস্টফুড না খাইয়া রান্না খাবার—যেমন ভাত, রুটি, ডাল, তরকারি, মাছ, বাদাম, শাকসবজি ইত্যাদি খাওয়ার অভ্যাস করিতে হইবে। রেস্টুরেন্টগুলিতে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রচলন করিতে হইবে এবং রাস্তাঘাটে ও ফুটপাতে খাবারের দোকানগুলির উপযোগিতা লইয়া নূতন করিয়া ভাবিয়া দেখিতে হইবে।
