সুনামগঞ্জের হাওরের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। হাওর পাড়ের লাখ লাখ মানুষের মনে স্বস্তি নেই। হাওরের প্রথম বাঁধটি ভাঙার প্রায় বিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বুধবার (২০ এপ্রিল) পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি হাওর পরিদর্শন করেছেন। এসময় মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে হাওর পরিদর্শন করেন।
প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, ২-৩ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
তবে হাওরে ফসলহানির হাহাকার ও বড় ক্ষতির শঙ্কা থাকলেও মন্ত্রী বলেছেন, হাওরে যে ফসল তলিয়ে গেছে সেটা সারা দেশের খাদ্য সংকটের কোনো প্রভাব ফেলবে না। সুনামগঞ্জে এ বছর ২০১৭ সালের থেকেও বেশি পানি হয়েছে তবে বাঁধের কাজ ভালো হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছে। অথচ গণমাধ্যমের কারণে বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।
এদিকে কয়েকটি হাওরে ধান কাটা শুরু হলেও অধিকাংশ হাওরের ৮০ ভাগ ধান এখনো কাটার উপযুক্ত হয়নি। সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও জগন্নাথপুরের বাঁধগুলো। কয়েকটি হাওর ডুবির ঘটনা ঘটলেও বড় হাওরগুলো এখনো অক্ষত। তবে বুধবার (২০ এপ্রিল) পানি আরও বাড়ায় এই হাওরগুলো নিয়েও শঙ্কা কাটছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি হাওরেই ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে পাহাড়ি ঢলের ভয়ে হাওরে কৃষকরা আধাপাকা ধান কাটছেন। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ধান তলিয়ে গেছে বহু জায়গায়। সে ধান কৃষকরা কোমর পানিতে নেমে কেটে তোলার চেষ্টা করছেন।
সালাম মিয়া নামে স্থানীয় এক কৃষক বলেন, পানিতে কষ্টের ফসল তলিয়ে গেছে। এখন পানিতে নেমেই ফসল কাটছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, ২০১৭ সালের বন্যার চেয়েও এবার ঢলের পানির পরিমাণ বেশি। হাওরে বাঁধের উচ্চতার প্রায় কাছাকাছি সীমায় চলে এসেছে পানি। সুরমা নদীতে বিপদসীমা ৬ সেন্টিমিটার। এদিকে বুধবার বিকালে নদীর পানির উচ্চতা সমতলের ৫ দশমিক ৯১ সেন্টিমিটার উপরে উঠে আসে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিশ দিন ধরে হাওরে পানির সাথে লড়াই চলছে। পানির এতো চাপ, কখন কি হয় বলা মুশকিল। তবে আমরা হাওরেই আছি ধান ঘরে না ওঠা পর্যন্ত।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, বুধবার পর্যন্ত ৮৪ হাজার ৭৯৯ হেক্টর বোরো জমির ধান কাটা হয়েছে। আনুমানিক সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার ফসল এখনো অক্ষত রয়েছে।
এর আগে সোমবার (১৮ এপ্রিল) জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওর সহ কয়েকটি হাওরে অন্তত ৬টি বাঁধে ফাটল ধরলে ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল হুমকিতে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কৃষকরা সেগুলো দ্রুত মেরামত করেন। মঙ্গলবার ছাতক-দোয়ারাবাজারের সর্ববৃৎ নাইন্দার হাওর রক্ষা বাঁধে ফাটল সৃষ্টি হলে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাওর রক্ষায় স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে মাঠে কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে তাহিরপুরে গুরমার হাওরের কান্দা উপচে জমিতে পানি ঢুকলে বিকল্প আরেকটি বাঁধ নির্মাণ করে ফসল রক্ষা করা হয়।
জামালগঞ্জের হালি হাওরের হেরাকান্দি বাঁধ, মহালিয়া হাওরের হিজলা গ্রাম সংলগ্ন বাঁধ ও পাগনা হাওরের বৌগলাখালি ক্লোজারও রয়েছে ঝুঁকিতে। বাঁধ রক্ষায় জোর প্রচেষ্টা চলছে। এছাড়া মহালিয়া হাওরের ৭ ও ৮ নম্বর পিআইসি এবং হালি হাওরের আছানপুর গ্রামের উত্তর দিকের হেরাকান্দি বাঁধ ঝুঁকিতে। মহালিয়া হাওরের হিজলা গ্রামের পূর্বদিকের বাঁধের সুরঙ্গপথ চুইয়ে পানি ঢুকতে থাকলে প্রশাসন ও কৃষকের প্রচেষ্টায় সেটি রক্ষা পায়।
মঙ্গলবার সকাল থেকে ওই বাঁধে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও হালি হাওরের হেরাকান্দি বাঁধেও ফাটল দেখা দিয়েছে। বাঁধ রক্ষায় এক্সেভেটর দিয়ে মাটি ফেলা হচ্ছে। তবে বাঁধের গোড়ায় ভলগেট দিয়ে বালু না ফেললে এই বাঁধ রক্ষা করা যাবে না বলে কৃষকরা জানান।
পাগনা হাওরের গজারিয়া অংশের স্লুইচ গেইটের কপাট পানির চাপে ভেঙ্গে গত রবিবার রাতে পানি ঢুকতে শুরু করে। পরে প্রশাসনসহ স্থানীয়দের চেষ্টায় ৪ হাজার মাটির বস্তা ফেলে জলকপাট নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
হালি হাওরপাড়ের আছানপুর গ্রামের কৃষক মো. সাইদুল ইসলাম জানিয়েছেন, হালি হাওর রক্ষা করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হাওরের ভেতরের অংশের হেরাকান্দি বাঁধঘেঁষা প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে যে গর্ত আছে সেগুলো ভরাট করা।
সরকারি হিসাবে এরইমধ্যে ৫ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির বোরো ফসল বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ২৪ ঘণ্টা বাঁধ পাহারায় রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে ৮০ ভাগ ধান পাকলেই দ্রুত ধান কাটতে বলা হয়েছে।
করচার হাওরের কৃষাণী রাণী বেগম বলেন, সকাল থেকে হাওরের বাঁধের পাশে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ধান শুকানোর কাজ করছি। বাঁধ পাহারা দিচ্ছি।
একই হাওরের কৃষক হদিস মিয়া বলেন, বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে। তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ধান। সেজন্য উঁচু জমির পাকা ধান রেখে নিচু জমির আধাপাকা ধান আগে কাটছি।
সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, নদীতে পানির যে চাপ সেটা কোনো বাঁধের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। তারপরও আমরা বাঁধ রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
এবার জেলার ১৫০ ছোট-বড় হাওরে দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদ করা হয়েছে। ৫৩৭ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধের জন্য ১২১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
পানি নামছেনা কেন?
নদীর পানি কেন নিচে নামছেনা, তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই। জেলার সচেতন মহল বলছেন, কেবল বাঁধ নির্মাণ নয়, নদী ও খাল খননে গুরুত্ব দিতে হবে। যে হারে পানি পাহাড়ি ঢল থেকে এসে জমা হয় তা ধারণ করার ক্ষমতা থাকলে বন্যা ঠেকানো সম্ভব।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, চেরাপুঞ্জিতে গত ১৭ এপ্রিল হতে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এবং ১৮ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিতার বৃষ্টিপাত হয়। ১৮ এপ্রিল সকাল ৬টায় সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি ছিল সমতল থেকে ৫ দশমিক ৯৬ সেন্টিমিটার উচ্চতায় এবং রাত ১১টায় ৫ দশমিক ৯১ সেন্টিমিটারে। আবার ১৯ এপ্রিল সকাল ৬টায় সুরমা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ছিল ৫ দশমিক ৯৪ সেন্টিমিটার। প্রশ্ন হলো— পানি নামছে না কেন?
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সুনামগঞ্জ থেকে ভৈরব সেতু পর্যন্ত কোথাও পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগে সুরমা নদীর পানি ভাটিতে প্রথমে বউলাই ও পরে ধনু সহ বিভিন্ন চ্যানেলে প্রবাহিত হতো। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের ফলে এসব চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এখন শুধুমাত্র বউলাই ও ধনু নদী দিয়ে সুরমার পানি মেঘনায় যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার ঘোষ বলেন, সুনামগঞ্জে সুরমা নদীতে প্রায় ৪ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অথচ বউলাই ও ধনু নদী দিয়ে মাত্র ২ হাজার ৫০০ কিউসেক এবং সবশেষে ভৈরব বাজারের কাছে ১ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সুরমার তুলনায় বউলাই ও ধনু নদী ছোট নদী হওয়ায় এবং বিভিন্ন চ্যানেল ক্লোজ করে দেওয়ার পাশাপাশি মিঠামইনে অল অয়েদার রোড তৈরি করায় সুনামগঞ্জের সুরমার ৪ হাজার কিউসেক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ভৈরব বাজার ব্রিজ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার কিউসেক পরিমাণে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অবশিষ্ট ৩ হাজার কিউসেক পানি ক্রমাগতভাবে সুনামগঞ্জে বন্যার সৃষ্টি করছে। সেই সাথে উপচে পড়া পানির চাপে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। জরুরিভিত্তিতে ফিজিক্যাল ও ম্যাথমেটিক্যাল মডেল স্টাডির মাধ্যমে যথাযথভাবে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবেনা। কৃষকদের দাবি, যে করেই হোক— তাদের কষ্টের ফসল রক্ষায় প্রতিবারের এই দুর্যোগ থেকে স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
