বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মাদক কারবারে জনপ্রতিনিধি স্থানীয় প্রশাসন একাকার

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৯

মাদক কারবারে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন একাকার হয়ে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের এক শ্রেণীর মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলার চেয়ারম্যান এমনকি কিছু সংসদ সদস্যও মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত। স্থানীয় প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীও মাদকের টাকার ভাগ পান নিয়মিত। প্রতিটি ইউনিয়নে পুলিশের একজন এসআইকে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। স্থানীয় পুলিশ জানে ও তাদের কাছে তালিকা রয়েছে, মাদক ব্যবসার সঙ্গে কারা জড়িত। নিয়মিত ভাগ পাওয়ার কারণে তারাও চুপ। অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান কয়েক কোটি ও মেম্বার প্রার্থী কোটি টাকার অধিক খরচ করেছেন। 

ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিরা বলেন, কোন কোন এলাকায় মাদক বেঁচাকেনা হয় অনেক বেশি। ওই সব এলাকায় চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীরা নির্বাচনে দ্বিগুণ খরচ করেছেন। মাদক ব্যবসায় জড়িতরাই বেশিরভাগ নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায় মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তাদের এই টাকা এক/দেড় বছরের মধ্যেই উঠে যায়। মাদকের টাকায় অনেকেই বিলাশ বহুল গাড়ি ও বাড়ির মালিক হয়েছেন। যারা একদিন ছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। এলাকায় লোকের কাছে তারা পরিচিত। 

স্থানীয় প্রতিনিধির কাছে সাধারণ মানুষ বলেছেন, মাদকের ব্যবসায় এতো লাভ। আমাদের ছেলে মেয়েদের জীবন ধ্বংস করে তারা আজ এতো টাকার মালিক। ওয়ার্ড থেকে উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী থাকার পরও এই ব্যবস্থা কিভাবে চলে? কারণ তাদের ছত্রছায়া না হলে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা হতে পারে না। তারাও ভাগ পায় ।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, তাদের একার পক্ষে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। তাদের জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট পর্যাপ্ত নেই। তাই মাদক নির্মূলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা অরক্ষিত। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে যাতে মাদক না আসতে পারে সেজন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদক দ্রব্যের পক্ষ থেকে সর্বনাশা মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য জনগণসহ সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করে তুলতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

শহর থেকে গ্রামের সর্বত্র মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ভেতর মাদক পাচারের পরিমাণ বেড়ে চলেছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে ব্যাপক হারে বেড়েছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। দেশের সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে মাদকাসক্ত রয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত বেশি। আর অভিজাত শ্রেণীর মানুষ আইস, এলএসডি ও ডিওবি মাদকাসক্ত। শহর-গ্রাম গঞ্জ, হাট-বাজার, মুদির দোকান, পথে, ঘাট-মাঠে, অলি-গলিতে প্রকাশ্যে চলছে মাদক বেঁচাকেনা। সড়ক পথে মাছের ট্রাক, বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বহনকারী পরিবহন, বিলাসবহুল গাড়ি, বাস কভার্টভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মাদক পাচার হচ্ছে। সড়ক পথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট বেশি থাকায় এখন নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি যাচ্ছে মাদক। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিমান যোগেও মাদক পাচার হচ্ছে। বিমানের এক শ্রেণীর ক্রু’রা এই মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত অর্থাৎ এমন কোন জায়গা নেই যেখানে মাদক পাওয়া যাবে না।

সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। কিন্তু কোন কিছুতেই থামছে না মাদকের পাচার। সীমান্ত দিয়ে মাদক আসছেই। সবচেয়ে বেশি মাদকের চালান আছে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাদক আসছে পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে। পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় ২৫ কিলোমিটার অরক্ষিত। এছাড়া দেশের সব সীমান্ত দিয়ে আসছে। অনেকটা সহজলভ্য হওয়ায় মাদকের চাহিদাও বেড়েছে। দেশের অভিজাত এলাকা হয়ে পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে মাদকের ভয়াল থাবা শহর থেকে শুরু করে এখন গ্রামের ঘরে ঘরে। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত। ভয়াল মাদকাসক্তি তারুণ্য, মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। এছাড়া উঠতি বয়সীরা নেশাগ্রস্ত হয়ে খুন-খারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে। স্কুল-কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মাদকে আসক্তদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যা দেশের মেধা ধ্বংসের বিপদজনক মাত্রা।

কক্সবাজার, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী ও চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইত্তেফাকের উপজেলা প্রতিনিধিরা জানান, মাদক নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন বিরোধ নেই। এক্ষেত্রে সবই ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবসা করছে। কারণ মাদকে লাভ অনেক বেশি। স্থানীয় প্রশাসনও গুরুত্বপূর্ণ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। কারণ স্থানীয় প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার পকেটে যায় মাদকের টাকা। মাঝে মধ্যে মাদকের চালান ধরা পড়ে, কিন্তু শুধুমাত্র বহনকারী গ্রেফতার হন। ডিলার ও মাফিয়ারা ধরাছোয়ার বাইরেই থাকছেন। মাঝেমধ্যে দুই একটি চালান ধরা পড়লেও মাদকের চালান আসছে এর চেয়ে ৯ গুণ বেশি। 

মাদক দ্রব্য নিরাময় কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসকরা বলেন, প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ মাদকাসক্ত রোগী আসছে। সব শ্রেনী-পেশার মানুষ মাদকে আসক্ত হয়েছেন। এখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা ইয়াবায় আসক্তের সংখ্যা বেশি।

মনোরোগ বিজ্ঞানীরা বলেন, দেশে যে হারে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে তা অশনিসংকেত। মাদকের কারণে অপরাধ বাড়ছে। যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনায় মেধার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধির পেছনে দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা দেখতে হবে। 

স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে এলাকার বাসিন্দারা বলেন, জেলা প্রশাসন, এসপি, উপজেলা প্রশাসন, থানা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সরকারের প্রশাসন রয়েছে। এছাড়া রয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী। তারা এক সঙ্গে যদি মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে প্রতিটি এলাকা মাদকমুক্ত করা সম্ভব। অর্থাৎ এইসব প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা মুদ্রার এপিট-ওপিট। তাদের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে আজ প্রতিটি এলাকা মাদকে সয়লাব। তিন বিভাগের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে।

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস আজ

বিশেষ সংবাদ

ইয়াবার অর্থ হুন্ডি হচ্ছে দুবাই থাইল্যান্ড সিঙ্গাপুরে

বিশেষ সংবাদ

মাদকের বড় চালানে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স

মাদকের লাগাম টানতে ‘সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নিত্য নতুন কৌশলে দেশে ঢুকছে মাদক 

শুধু দাম বাড়িয়ে তামাকজাত পণ্যের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় : এনবিআর চেয়ারম্যান

ইয়াবার নতুন রুট এখন আকাশপথ

করোনাকালে নারী ও শিশু মাদকাসক্ত বেড়ে দ্বিগুণ