সংযম, সহিষ্ণুতা ও মিতভাষ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:৫১

দ্বাদশ শতাব্দীর তিব্বতীয় দার্শনিক শাক্য পণ্ডিত বলিয়াছিলেন, ‘বেশি কথা বিপদের কারণ। যতটা সম্ভব নীরব থাকিলে দুর্ভাগ্য এড়ানো যায়। খাঁচাবন্দি টিয়া বকবক করে, কিন্তু মুক্ত আকাশে উড়িয়া বেড়ানো টিয়া চুপ থাকে।’ আধুনিক কালে উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষকে আমরা খাঁচার টিয়ার মতোই আচরণ করিতে দেখিয়া থাকি।

কথা বলিতে হয় সংক্ষেপে এবং যুক্তিযুক্ত কথা। সংযম ও সহিষ্ণুতা শুধু মুখের কথায় নহে, চর্চাতেও রাখিলে তাবত্ দুনিয়ার বিদ্যমান সমস্যা বহুলাংশে দূর হইয়া যাইতে পারে। প্রতিটি মানুষের মনে রাখা দরকার যে, যাহা করিবেন, যাহা বলিবেন তাহার পিছনে যুক্তি থাকিতে হইবে, তাহা হইলেই কথার বা কাজের ভার তৈরি হইতে পারে। যেই কথার সারমর্ম নাই, যেই কথার কার্যকরণ নাই তাহা শুনিলে মানুষের কেবল হাসির উদ্রেক করে। আমরা সকলেই জানি, ভালো কথা বলা যত সহজ, পালন করা তত সহজ নহে। যাহা কেহ নিজে না করিতে পারে, তাহাও অন্যকে পালন করিতে বলা সমীচীন নহে। ইহা লইয়া প্রাসঙ্গিক ইসলামের একটি ঘটনার কথা অনেকেরই জানা আছে। একবার রসুলে

আকরামের (স.) নিকট একজন লোক আসিয়া বলিলেন, হুজুর, আমার সন্তান প্রচুর মিষ্টি খাইয়া থাকে। আপনি নিষেধ করিলে সে আর মিষ্টি খাইবে না। নবিয়ে করিম তাহাকে সাত দিন পরে আসিতে বলিলেন। এই সাত দিনে তিনি মিষ্টি না খাওয়ার অভ্যাস রপ্ত করিলেন এবং তাহার পরেই কেবল ছেলেটিকে মিষ্টি খাইতে নিষেধ করিলেন। এই কাহিনির একটি বিশেষ তাত্পর্য রহিয়াছে, বিশেষ বার্তা রহিয়াছে :তুমি নিজে যাহা করো তাহা অন্য কেহ করিলে তাহাকে নিষেধ করিতে পারো না এবং তুমি নিজে যাহা পারো না, তাহাও অন্যের নিকট হইতে আশা করিতে পারো না। ইহা মোনাফেকিরই সমার্থক। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ১৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্হান করিবে, আর আপনি তাহাদের সাহাঘ্যকারী হিসাবে কখনো পাইবেন না।’ আবার সুরা তওবার ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হইয়াছে, ‘হে নবি, কাফির ও মুনাফিক উভয়ের বিরুদ্ধে পূর্ণশক্তিতে জিহাদ করো। এবং তাহাদের ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করো। শেষ পর্যন্ত তাহাদের পরিণতি জাহান্নাম, আর তাহা অত্যন্ত নিকৃষ্ট স্হান।’

পবিত্র রমজান মাস চলিতেছে। আমরা জানি, রমজানের উদ্দেশ্য কেবল না খাইয়া থাকা নহে। এই সকল মানবিক গুণের চর্চা রমজানের একটি প্রধান উদ্দেশ্য। কেবল আত্মসংযম, সহিষ্ণুতা ও মিতভাষই ঐ গুণাবলি সৃষ্টিতে সহায়ক হইতে পারে। কিন্তু তাহা কতটুকু অর্জিত হইল আমাদের দেশে? আমরা লক্ষ করি, সকলেই অন্যকে উপদেশ দিলেও নিজে তাহা পালন করেন না। নিজে কোনো কর্তব্য পালন না করিয়া অন্যকে তাহা করিতে উপদেশ দেওয়ার মতো চরম ধৃষ্টতা আর কিছু নাই। দুঃখের বিষয়, সমাজের সর্বস্তরেই আমরা ইহা প্রকট আকারে দেখিতেছি।

যাহারা উপদেশ দিয়া যাইতেছেন তাহারা যদি নিজেদের বক্তব্য রেকর্ড করিয়া শুনেন, তাহা হইলেই বুঝিতে পারিবেন, তাহা কেমন শুনা যায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করিয়াও কেহ কেহ অন্যদের উপদেশ দিয়া থাকেন। আমরা গায়ে পড়িয়াও মিথ্যা কথা বলিতে শুনি, যাহা প্রায়শই অপ্রয়োজনেও বলা হইয়া থাকে। ভালো কথা বলিয়া তাহা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা না করিলে উহা কি অর্থহীন হইয়া পড়ে না? শুধু অর্থহীনই হয় না, বরং মানুষ ভেতরে ভেতরে হাসে। এই সকল কারণেই সমাজ-জীবনে আমরা অসংযম ও অসহিষ্ণুতার সম্মুখীন। এই যে দলে দলে সংঘর্ষ, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছাত্রসমাজের সংঘর্ষ, মানুষ মানুষের প্রতি বৈরী— ইহার কারণ এই অসহিষ্ণুতা।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন