কিশোর ও তরুণদের ডায়াবেটিস অশনিসংকেত

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২২, ০২:২২

বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হা জানাইয়াছে, পৃথিবীতে মোট মৃত্যুর নবম কারণ হইল ডায়াবেটিস কিংবা বহুমূত্র রোগ। অসংক্রামক এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য হইলেও বিশ্বে প্রতিদিনই বাড়িয়া চলিয়াছে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা। আশঙ্কার বিষয় হইল—পূর্বে ডায়াবেটিসকে প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ হিসাবে ধারণা করা হইলেও বর্তমানে উহাতে কিশোর-তরুণরাও আক্রান্ত হইতেছে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ পরিচালিত ‘বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অসংক্রামক রোগ’ শিরোনামের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় উঠিয়া আসিয়াছে দেশে ২০ বত্সরের নিচে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে চার জনের অধিক ছেলেমেয়ের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। আরো আশঙ্কার বিষয় হইল, শনাক্তকারীদের মধ্যে ৬১ শতাংশের কোনো উপসর্গ ছিল না, ইহার ফলে তাহারা জানিত না তাহারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ইহা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অশনিসংকেত বটে। দেশ ও সমাজের ভবিষ্যৎ যাহারা, তাহারাই যদি অল্প বয়সে অসুস্হ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে ভবিষ্যতে দেশ যে নিদারুণ বিপদের সম্মুখীন হইবে—উহা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়।

কিশোর ও তরুণদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হইবার পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হইল খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন। আলোচ্য সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, যেই সকল কিশোর ও তরুণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হইয়াছে তাহাদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করে না এবং প্রায় ৯৯ শতাংশই পরিমিত সুষম খাদ্য গ্রহণ করে না। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোর এবং তরুণরা খেলাধুলা এবং শারীরিক পরিশ্রম-বিমুখ হইয়া পড়িয়াছে; পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব, সোশ্যাল মিডিয়া এবং গেমস-অনলাইনের প্রতি আসক্তির কারণে তাহাদের মধ্যে বাড়িতেছে স্হূলতা, যাহা ডায়াবেটিস সৃষ্টির নিয়ামক। তরুণদের খাদ্যাভ্যাসেও আসিয়াছে আমূল পরিবর্তন, পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে তাহারা ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে ফাস্টফুডের দিকে। চটজলদি তৈরি বিভিন্ন প্রকার ফাস্টফুডে একদিকে যেমন পুষ্টিকর উপাদান অনুপস্হিত, অন্যদিকে উহাতে রহিয়াছে স্হূলতা, রক্তে চর্বির আধিক্য বাড়িয়া যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ স্বাস্হ্যঝুঁকি। ইহার পাশাপাশি তরুণদের ডায়াবেটিস হইবার যেই সকল রিস্ক ফ্যাক্টর রহিয়াছে তাহা হইল—পরিবারে কাহারো ডায়াবেটিস থাকা, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ করা, অপর্যাপ্ত ঘুম, বাড়তি মানসিক চাপ ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্পবয়সিদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগ বাড়িয়া যাওয়া উদ্বেগজনক, কারণ ইহার ফলে কিডনি, হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়িবে, ইহার সহিত গড় আয়ু কমিয়া যাইবারও আশঙ্কা বাড়িবে।

ডায়াবেটিস হইতে বাঁচার অন্যতম উপায় হইল—যাহাদের ঝুঁকি রহিয়াছে তাহাদের স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করিয়া লওয়া। বর্তমানে দেশে ৪০ বত্সরের অধিক বয়সিরা স্ক্রিনিংয়ের আওতায় থাকিলেও কিশোর-তরুণদেরও এই আওতায় লইয়া আসা জরুরি। যেহেতু আক্রান্তদের অনেকেরই কোনো উপসর্গ প্রকাশ পাইতেছে না, সেই কারণে পরীক্ষার আওতায় লইয়া আসিতে পারিলে এবং শুরুতেই রোগ ধরা পড়িলে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হইবে। ইহার পাশাপাশি তাহাদের সুস্হ জীবনযাপনের লক্ষ্যে নিয়মিত খেলাধুলা, ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো—সর্বোপরি শারীরিক পরিশ্রমের দিকে অধিক নজর দিতে হইবে। কিশোর ও তরুণরা যাহাতে সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেমস ইত্যাদিতে আসক্ত না হইয়া পড়ে সেই বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হইতে হইবে। খাদ্যাভ্যাসের বিষয়েও অভিভাবকদের অধিক সতর্ক হইতে হইবে; ফাস্টফুডের পরিবর্তে শিশু-কিশোর, তরুণদের পুষ্টিকর এবং সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়িয়া তুলিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করিতে হইবে। যেই সকল কিশোর এবং তরুণের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রহিয়াছে তাহাদের নিয়মিত পরীক্ষা করাইতে হইবে, কারণ রোগের চিকিত্সার চাইতে উহা সময় থাকিতে প্রতিরোধ করা উত্তম। সর্বোপরি সুষম খাদ্যাভ্যাস, সুস্হ জীবনযাপন এবং সচেতনতার মাধ্যমেই কিশোর-তরুণদের ডায়াবেটিসের বেড়াজাল হইতে নিরাপদ রাখিতে হইবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি