কারখানা-মালিকরা মিথ্যেবাদী বনে যাচ্ছেন 

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৬

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কারখানা-মালিকদের অনেকে ডিজেলচালিত জেনারেটর বসিয়েছেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে অনেকের কারখানার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তারা অনেক সময় ধরে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালু রাখেন। এর মধ্যে খবর এলো—দেশের শতভাগ বিদ্যুতায়িত হয়েছে। উদ্যোক্তারা আশায় বুক বাঁধলেন। কিন্তু এখনো দেখা যাচ্ছে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়া চালু আছে। সম্প্রতিকালে দৈনিক ইত্তেফাকের এক খবরে দেখা গেছে, ভালুকার একটি কারখানায় তিন দিনের মধ্যে মোট ২৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। এই তিন দিনে মোট ১৬ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করেছে। তাহলে আমরা কী দেখলাম? একদিকে গ্যাসের রেশনিং, অপরদিকে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া। বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তাদের ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কারখানা-মালিকরা সময়মতো পণ্য উৎপাদন করতে না পারায় শিপমেন্ট দেরি হচ্ছে।

গ্যাসের রেশনিং এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে রপ্তানিকারক এবং ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার। কারণ ক্রেতারা ইতিমধ্যে শুনেছেন বাংলাদেশে গ্যাসের সমস্যা নেই, বিদ্যুতের সমস্যা নেই। কারখানা-মালিকরা যখন ক্রেতাদের বলেন, বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস সমস্যার কারণে পণ্য উৎপাদন করা যায়নি—তখন তারা এটি আমলে আনতে চান না। এ ধরনের ঘটনা আমাদের ক্ষেত্রে হরহামেশাই ঘটছে।

এমনিতেই বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের অভাবে উদ্যোক্তারা উৎপাদন চালিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। কিন্তু এবার ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে তাদের ওপর চেপে বসেছে গ্যাস রেশনিং। দেশে প্রথম বারের মতো কলকারখানায় চার ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন-পেট্রোবাংলা। আগামী ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এ সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

গত কয়েক মাস ধরে এমনিতেই কলকারখানায় গ্যাসের চাপ নেই। কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্যের কোটায় ছিল। গ্যাস না থাকায় কারখানা মালিকরা বিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এ অবস্থায় গ্যাস রেশনিং-এ বিপদ আরো বাড়বে। চার ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ থাকলে একটি কারখানার উৎপাদন তার লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে বহুমাত্রিক। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ কষ্টদায়ক হবে। কারো মতে, চার ঘণ্টা কারখানা বন্ধ রাখা কোনো বিষয় না। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদের চাকা কিন্তু বন্ধ থাকবে না। এর ফলে তাদের ওপর চাপ বাড়বে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে—টেক্সটাইল, গার্মেন্টস এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য খাতগুলো। এ খাতের কারখানাগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত। যেমন স্পিনিং মিলগুলো সুতা করে, তা দিয়ে কাপড় তৈরি হয়, সে কাপড় গার্মেন্টসে সেলাই করে রপ্তানি করা হয়। এক্ষেত্রে গ্যাসের ওপর নির্ভর করা শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়বে রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর।

শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহারের সিংহভাগ করে থাকে টেক্সটাইল মিলগুলো। এ খাতের শিল্পগুলোতে তিতাস গ্যাস কতৃ‌র্পক্ষ ১৫ পিএসআই চাপ মঞ্জুর করেছে। কিন্তু দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ কারখানার মধ্যে আছে মাত্র দুই থেকে পাঁচ। ১০ শতাংশ কারখানার পুরো পিএসআই পাওয়া যাচ্ছে। বাকি ৩০ শতাংশ কারখানার পিএসআই একবারেই নেই। যেসব কারখানায় গ্যাসের চাপ নেই, সেগুলো বিদ্যুতের মাধ্যমে চালানোর উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় কারখানা চালানো দায় হয়ে পড়েছে। শুধু টেক্সটাইল মিল নয়, বিভিন্ন সিরামিক কারখানা, তৈরি পোশাকশিল্প, ওয়াশিং এবং ডায়িং কারখানাও গ্যাসের স্বল্পচাপে ভুগছে। এসব কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হবার কারণে রপ্তানি আয়েও প্রভাব পড়বে।

তবে এ পরিস্থিতি থেকে উৎতরণের জন্য কি কোনো পথ খোলা নেই? অবশ্যই আছে। এক্ষেত্রে দরকার শুধু সদিচ্ছার। বিদ্যমান ও পরিত্যক্ত গ্যাসকূপগুলো সংস্কার করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থলভাগে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে জরিপ তথ্য রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) যৌথ উদ্যোগে গ্যাস অনুসন্ধান করবে বলে খবর বেরিয়েছে। ইতিমধ্যে যে উন্নয়ন কূপগুলো পরিত্যক্ত বা শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো থেকে আরো কিছু গ্যাস উৎতোলনের সুযোগ রয়েছে। এমন প্রায় ৪০-৫০টি কূপ রয়েছে। গ্যাসের দ্রুত সরবরাহ বাড়াতে এগুলোতে ওয়ার্কওভার বা সংস্কার খনন করা হলে অনেকখানি গ্যাস পাওয়া যাবে। এগুলোর পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। আমাদের যে ভূগঠন, তাতে স্থলভাগে এখনো গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সিলেট-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাইরে এখনো তেমন বড় কাজ এখনো হয়নি। গত ২০ বছরে মাত্র ২৫টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে।

গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাপেক্স উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এই সংস্থাকে সরকার কিছু যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে পারলে অনায়াসে তারা এ কাজটি করতে পারে। কিন্তু বাপেক্সের পরিবর্তে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এ কাজ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারের গঠন করা বাপেক্স যদি এ কূপগুলো খননের কাজ পায় তাহলে খরচ যেমন কম হবে, সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বর্তমানে দৈনিক ৪৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ৩১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে। এ ঘাটতি শুধু ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করে মেটানো সম্ভব হবে না বাজেট ঘাটতির কারণে। এ ছাড়া দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি এলএনজি সরবরাহের অবকাঠামো-সক্ষমতাও নেই। আবার দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়ন না হওয়ায় দেশজ গ্যাসের জোগান বাড়ানো যাচ্ছে না। দেশে বর্তমানে যে প্রমাণিত মজুত আছে তাতে তিন-চার বছরের বেশি চলবে না। সম্ভাব্য মজুত বিবেচনায় নিলে ১০-১১ বেশি বছরের বেশি যাবে না। এমন প্রেক্ষাপটে যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প আর কী আছে? অবশ্যই বিকল্প আছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উৎতরণ হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের এ অবস্থা চলতে থাকলে বিষয়টি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ দুটি খাতকে সচল করে বিপুল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আমরা ক্রমাগত পেছাতে থাকব। যেসব সমস্যা উদ্যোক্তাদের সামনে এসেছে, সেগুলো সমাধানের জন্য যথাযথ লোককে যথাযথ জায়গায় বসানোর বিকল্প নেই।

লেখক: তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা ও সাবেক সহসভাপতি বিজিএমইএ

ইত্তেফাক/কেকে