একজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, দেশের কোনো বেকার সমস্যা নেই। বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে কাজ করার মতো উপযুক্ত লোক পাওয়া যায় না। তার এই বক্তব্য আংশিক সত্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, দেশে যেমন কর্মসংস্থানের প্রচণ্ড অভাব রয়েছে তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে কাজ করার মতো উপযুক্ত লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এর আগে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় একজন উদ্যোক্তা দুঃখ করে বলেছিলেন, তার প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত কর্মী খুঁজে না পেয়ে তিনি দেশের বাইরে থেকে উপযুক্ত লোকবল আনতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক যে, দেশে এত উচ্চশিক্ষিত লোকবল থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাচ্ছেন না।
মনে পড়ে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের দেওয়া পরিসংখ্যানে উল্লেখ করেছিল, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। পরের বছর তা ২৭ লাখে উন্নীত হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরো বেকারের যে পরিসংখ্যান নির্ধারণ করে তা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু উন্নত বিশ্বের বেকারের স্বরূপ আর বাংলাদেশের বেকারের স্বরূপ একই রকম নয়। কাজেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ বিভিন্ন সময় যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪ কোটিরও বেশি। বেকারের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি বা মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু দেশের কর্মক্ষম লোকবলের একটি বিরাট অংশই যে বেকার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনাকালে দেশে বেকারের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোনো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতে, করোনার কারণে অন্তত ৩ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। এদের অধিকাংশই কর্মচ্যুত বা পেশাচ্যুত হয়েছেন। অনেকে চাকরিতে বহাল থাকলেও তাদের বেতন-ভাতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর সামাজিক সুরক্ষাবলয় আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। উন্নত দেশগুলোতে বেকারদের নিয়মিত ভাতা প্রদান করা হয়। তাদের দেশে বেকারের সংজ্ঞা আর আমাদের দেশের বেকারের সংজ্ঞা একই রকম নয়। কাজেই বাংলাদেশের বেকারের সংখ্যা এবং হার নির্ণয় করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থনীতির পরিভাষায় পূর্ণাঙ্গ এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান বলতে এমন অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি তার স্ট্যাটাস বজায় রেখে চার-পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের ভরণ-পোষণ এবং অন্যান্য আবশ্যিক ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ উপার্জন করতে পারেন।
একজন মানুষ যদি তার উপযুক্ততা অনুযায়ী কর্মসংস্থান করতে না পারেন তাহলে তাকেও এক ধরনের বেকারত্ব বলা যেতে পারে। যেমন, কোনো একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে পেশাগত দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্হা করতে না পেরে একটি মুদি দোকানের ম্যানেজার হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে কোনোভাবেই উপযুক্ত এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান বলা যাবে না। আবার কেউ যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে তার পেশাগত দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি পান কিন্তু তাকে যে বেতন-ভাতা দেওয়া হয় তার পরিমাণ খুবই কম, তাহলে তাকে কোনোভাবেই পূর্ণ কর্মসংস্থান বলা যাবে না। অর্থনীতির পরিভাষায় ছদ্ম বেকার, মৌসুমি বেকার, আন্ডার এমপ্লয়মেন্টের আলাদা আলাদা সংজ্ঞা দেওয়া আছে। বেকারত্বের সঙ্গে দারিদ্রের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কোনো বেকার মানুষের পক্ষে তার পরিবারের দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবার যে ব্যক্তিটি উপযুক্ত এবং পূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন তার পরিবার সাধারণত দরিদ্র থাকে না। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে, সবার জন্য উপযুক্ততা অনুযায়ী পূর্ণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
কর্মসংস্থান বলতে শুধু সরকারি চাকরি পাওয়া বোঝায় না। বরং সরকারি চাকরির পরিবর্তে আয়বর্ধক আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূর করা অধিক সহজ। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশে স্বল্পশিক্ষিতদের চেয়ে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা বেশি। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি তিন জনের মধ্যে অন্তত এক জন বেকার। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মসংস্থানমূলক নয়। বরং বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন ব্যক্তিকে আত্ম অহমিকাপূর্ণ বেকারে পরিণত করে। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিটি ইচ্ছে করলেই সাধারণ কোনো কাজ করতে চান না। কারণ, শিক্ষাব্যবস্থা তাদের তেমনভাবে বিকশিত করেনি। শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর আত্মস্থ সৃজনশীল শক্তিকে বিকশিত করে তাতে একটি কাজের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও তেমনটি নয়। এ প্রসঙ্গে আমাদের বর্তমান শিক্ষার গুণমান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার অবকাশ রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের খ্যাতিমান অনেক শিক্ষাবিদের সঙ্গে শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা করেছি। একজন শিক্ষাবিদকেও পাইনি, যিনি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে সন্তুষ্ট।
তারা বলেছেন, আমাদের দেশের আগের শিক্ষাব্যবস্থাই বরং তুলনামূলক ভালো মানের ছিল। অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে শিক্ষার্থী এবং ভালো রেজাল্ট করে পাশ করার হার আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমরা শিক্ষার মান ধরে রাখতে পারিনি। এমসিকিউ পদ্ধতি শিক্ষার গুণমানকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। এমসিকিউ পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থীর সত্যিকার মেধা যাচাই কোনো দিনই সম্ভব নয়। কারণ পাঁচ জন শিক্ষার্থী যদি একই উত্তরের ঘরে টিক মার্ক দেন, তাহলে তারা সবাই একই মার্কস পাবেন। কিন্তু তাদের যদি ১০ লাইন লিখতে দেওয়া হয় তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন মার্কস পাবেন। আগে ১০০ নাম্বারের পরীক্ষায় পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ৬০ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়া সহজ ছিল না। দেখা যেত একটি বিদ্যালয় থেকে এক বা দুজন শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগে পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এখন এমসিকিউ পদ্ধতির পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অনেকেই ৯৬-৯৭ নম্বর পাচ্ছে। এখন যারা গোল্ডেন এ+ পাচ্ছে তাদের অনেকেই সনাতন পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিলে প্রথম বিভাগ পাবে না। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে কোয়ান্টিটি বেড়েছে কিন্তু শিক্ষার কোয়ালিটি বাড়েনি। এমসিকিউ পদ্ধতির পরীক্ষা জাতিকে মেধাহীন করে তুলছে। এখনই বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগদানের মতো উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী দিনে এই সংকট আরো ঘনীভূত হবে। এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে যেখানে দেশের শত শত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি চাকরির আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরবে কিন্তু প্রতিষ্ঠিত শিল্পকারখানার শীর্ষ পদে নিয়োগদানের জন্য বিদেশ থেকে লোক আনতে হবে।
বর্তমানে যেভাবে উচ্চশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে সেখানেও পরিবর্তন সাধন করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী এবং কারিগরিভিত্তিক নয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ দীর্ঘ দিন বেকার থাকতে পারেন না। কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেলে তিনি অন্তত আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্নাপিত হতে যাচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়নের পর শ্রমিক-কর্মচারীর সংকট দেখা দেবে। কারণ, বিদেশি উদ্বৃত্ত পুঁজির মালিকরা তাদের পুঁজি বা অর্থ নিয়ে আসবে বিনিয়োগের জন্য। তারা শ্রমিক-কর্মচারী নিয়ে আসবে না। স্থানীয়ভাবেই আমাদের দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত শ্রমিক-কর্মচারীর জোগান দিতে হবে। আমরা কি সেই অবস্থার জন্য প্রস্ত্তত আছি? যদি স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় লোকবলের জোগান দেওয়া না যায়, তাহলে তারা আশপাশের দেশ থেকে প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ কর্মী সংগ্রহ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের উপার্জিত অর্থ নিজ দেশে প্রেরণের বিধান সহজীকরণ করেছে। আগে একজন বিদেশি কর্মী যে উপার্জন করতেন তার মধ্যে তাত্ক্ষণিকভাবে ৭৫ শতাংশ নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারতেন।
উপার্জনের অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ অর্থের মাধ্যমে স্থানীয় নিয়ম মোতাবেক ট্যাক্স এবং অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করার পর যা হাতে থাকত, তা বাংলাদেশেই সংরক্ষণ করতে হতো। তারা বাংলাদেশে নিজ চূড়ান্তভাবে ফিরে যাওয়ার সময় এই অর্থ নিয়ে যেতে পারতেন। সংশোধিত আইনে একজন বিদেশি কর্মী তাত্ক্ষণিকভাবে তার উপার্জনের ৮০ শতাংশ নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারবেন। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ উপার্জন হতে স্থানীয় ট্যাক্স ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের পর যা হাত থাকবে তাও নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারবেন। এর ফলে আগামী দিনে বিদেশি কর্মীদের বাংলাদেশে কাজ করার পরিবেশ আরো অনুকূল এবং আকর্ষণীয় হবে। একদিকে স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত এবং দক্ষ লোকবল না পাওয়া এবং বিদেশিদের কর্মানুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ফলে বিদেশিরা অধিক হারে বাংলাদেশে আসবে। কারণ, এমসিকিউ পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা আর যা-ই করুক না কেন অবাধ প্রতিযোগিতায় সক্ষম লোকবল গড়ে তুলতে পারবে না। এখনই যদি বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখা না হয় তাহলে আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে; যা চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিতে পারে।
লেখক: অর্থনীতি বিষয়ক লেখক
