দেশে সর্বক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতার একটি প্রবণতা সৃষ্টি হইতেছে। ব্যবসায়-বাণিজ্য, রাজনীতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গন কোনো ক্ষেত্রই এখন প্রতিযোগিতাহীন নহে। ইহা অবশ্যই ইতিবাচক। কারণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই যোগ্যতা যাচাই হইয়া থাকে। প্রতিযোগিতা না থাকিলে সেইখানে যোগ্যতা অর্জনের প্রশ্ন থাকে না। স্বনামধন্য লেখক ন্যান্সি র্যানডফ পার্সি বলিয়াছেন, ‘প্রতিযোগিতা সর্বক্ষেত্রেই ইতিবাচক। ইহা যে কাউকে উন্নতি করিতে সাহায্য করে।’ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রেই রহিয়াছে প্রতিযোগিতা।
বড়বড় রাষ্ট্রগুলি প্রতিযোগিতা করিয়া থাকে খনিজ সম্পদ লইয়া, রাষ্ট্রীয় সীমানা লইয়া অথবা আধিপত্য লইয়া, যাহার পিছনে অর্থনৈতিক লাভক্ষতির হিসাব থাকে। এই প্রতিযোগিতায় অন্যকে ছাড়াইয়া যাইবার প্রচেষ্টার কারণে তাহারা জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটায়, মহাকাশে কে কাহার আগে পৌঁছাইবে এবং স্থান করিয়া লইবে সেই চেষ্টায় থাকে (তবে নিশ্চয়ই প্রতিযোগিতা করিতে গিয়া সংঘাত হানাহানি কাম্য নহে। উহাই প্রতিযোগিতার একমাত্র নেতিবাচক দিক)। জগৎ সৃষ্টির পর হইতেই মানবজাতি শুধু নহে, পশু সমাজেও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান রহিয়াছে। বলা যায়, প্রতিযোগিতার কোনো শুরু নাই, প্রতিযোগিতা লইয়াই আমরা জন্মগ্রহণ করি।
আমরা যখন স্কুলজীবনে প্রবেশ করি, সেইখানেই প্রতিযোগিতাটি প্রথম প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা স্কুলেই শুরু হয় না। এমনকি মাতৃগর্ভে স্থান করিয়া লইতেও প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে হয়। ইহার অর্থ হইল, আমরা সহজাতভাবেই প্রতিযোগিতার অংশ। যে এই প্রতিযোগিতায় নামিবে না, তাহাকে পিছাইয়া পড়িতে হইবেই। এই কারণেই বিবর্তনবাদ পড়িয়া ইংরেজ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেনসার বলিয়াছিলেন ‘সারভাইবাল ফর দ্য ফিটেস্ট’। অর্থাৎ যোগ্যরাই কেবল টিকিয়া থাকিবে।
বর্তমান সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি বিশদতর হইয়াছে। পালটাইয়াছে প্রতিযোগিতার ধরন। রাষ্ট্রগুলির পাশাপাশি ব্যক্তি মানুষের জীবনেও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বাড়িয়াছে, ধরন বাড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া বর্তমান যুগে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা অধিক তীব্র হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রতিযোগিতা ধনী-দরিদ্র সর্বদেশেই বিরাজমান, সর্বশ্রেণির মধ্যেই বিরাজমান। তবে ইহা মনে রাখা দরকার যে, এই প্রতিযোগিতার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষা, মেধার বিকাশ ও মান গঠন। সেই সঙ্গে নিষ্ঠা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
পরিশ্রমী প্রতিযোগী সর্বদা চূড়ান্ত শিরোপা হাতে না পাইলেও তাহার প্রতিযোগিতা বৃথা যায় না। পৃথিবীতে এখন অধিক বৈচিত্র্যময় পেশা রহিয়াছে। যিনি যেই পেশাতেই থাকুন, নিজের পেশায় নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও মনোযোগ থাকিলে অবশ্যই তিনি সফলকাম হইবেন। এই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হইয়া ভাগ্যান্বেষণের কোনো সুযোগ নাই। ইংরেজিতে একটি কথা রহিয়াছে, ‘তুমি সব সময় প্রতিযোগিতায় প্রথম হইবে তাহা নহে, কিন্তু তোমাকে সত্যিকার প্রতিযোগী হইতে হইবে।’
বর্তমান পরিস্থিতি ইহাই সাক্ষ্য দেয় যে, যাহারা প্রতিযোগিতায় নামিতে নারাজ তাহাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হইয়া পড়া অস্বাভাবিক নহে। ইহা ঠিক বর্তমান করোনা ভাইরাসের ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শুধু বাংলাদেশ নহে, সারা বিশ্বেই মন্দাবস্থা তৈরি হইয়াছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আরো তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। বহু দেশে শুধু জীবনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। সরকারগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ব্যাবসায়িক সম্প্রদায় তাহাদের উৎপাদন ও সরবরাহ লইয়া বিপাকে রহিয়াছে।
কিন্তু তাহার পরও যদি নিষ্ঠার সঙ্গে, সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়া কেহ আগাইয়া যায়, নিজের প্রতি আস্থা রাখিতে পারে, তাহা হইলে বিফল হইবার আশঙ্কা থাকে না। মনে রাখা দরকার, পেশাগত জীবনের সর্বক্ষেত্রেই রহিয়াছে প্রতিযোগিতা, তাহা হউক কেরানির চাকুরি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, উত্পাদনমুখী ব্যবসায় অথবা কৃষি উৎপাদন। সুতরাং সকলকেই প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে।

কিশোর ও তরুণদের ডায়াবেটিস অশনিসংকেত
সংযম, সহিষ্ণুতা ও মিতভাষ