ভূপৃষ্ঠের ওপরে ও নিচে পানির সংকট

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ০১:১০

পানি যেমন সম্পদ, তেমনি আপদও বটে। এক সময় পানির দেশ নামে খ্যাতি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। এ দেশে ছিল পানি আর পানি। সারা বছর পানির কারণে কৃষকের ঘরে ফসল তোলা ছিল বড় দায়। ১৯৮৮ ও ২০০৪-এর অনেক সর্বনাশা বন্যা এ দেশকে ধ্বংস করেছে। অভাব-অনটন, মঙ্গা মানুষের পিছু ছাড়েনি। আর এখন পানির দেশে পানি নেই। সময়ের ব্যবধানে পানি এখন সম্পদ। পানির অভাবে কৃষি, শিল্প, পশু-পাখিসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

সংকট মাটির ওপরে ও নিচে। মাটির নিচের পানি এখন বোতলে। পানির উৎস ভরাট ও দখল দূষণে মাটির নিচের পানি তুলে এ দেশের আরো বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে। স্বচ্ছ পানির অভাবে দেশে সাদা কাপড়ের ব্যবহার কমে গেছে। দেশে তীব্র পানি সংকট থাকলেও দখলবাজদের মাথায় পানি সংকটের কথা ঢুকছে না। অনেকে এখনো নদীকে অবহেলার চোখে দেখেন। অথচ দেশের তহশিল অফিস ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাশয়গুলোর সীমানা চিহ্নিত করে সংরক্ষণ ও তদারকি করলে এমনভাবে পানির সংকট হতো না।

বর্তমান সরকার দেশের পানির সংকট নিরসনে ছোটবড় নদী-জলাশয় খনন এবং গ্রাম পর্যায়ে সাবমারসিবল পাম্প বা গভীর নলকূপ স্থাপন করছে। কিন্তু নদী খনন ও নলকূপ স্থাপনে দুনী‌র্তির কারণে সরকারের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না। গভীর নলকূপ দিয়ে বেশি পানি উত্তোলন করলে এলাকার কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত অন্য নলকূপে পানি উঠে না। অথচ ব্যবসায়িক কারণে তাই করা হচ্ছে। ভূপৃষ্ঠের নিচের পানি কমে গেলে ভূমিধসেরও আশঙ্কা থাকে। নদী খনন প্রকল্প গ্রহণের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প স্থান সরেজমিনে পরিদর্শন না করে প্রকল্প তৈরি করে। ফলে নদীর তলদেশ ভরাট, নদীভাঙন ও তীর সংরক্ষণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় না। ঠিকাদার টেন্ডার নিয়ে তিন-চার হাত বদলের পর নদীর ঘাস পরিষ্কার ও যৎসামান্য মাটি কেটে বিল তুলে নিয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এমন ঘটনার দায় এড়াতে পারেন?

সিলেট বিভাগের বেশ কিছু অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, সর্বত্রই পানির সংকট। এ অঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, কালনিসহ আরো ছোটবড় নদীগুলো দখল দূষণে মরে যাচ্ছে। সুরমা নদীর তীরে লামাকাজিতে বালু-পাথরের ব্যবসায়ের কারণে কার্গোর ধাক্কায় নদীভাঙন হচ্ছে। একই এলাকার মাহতাবপুর গ্রামের পশ্চিমে সুরমা নদীর তীর কেটে বিরাট ইটভাটা, বাসিয়া নদীর কালিগঞ্জে নদীর তীর কেটেও একই ধরনের ইটভাটা হয়েছে। সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় হাওর ‘দেখার হাওরে, পানির সংকটে কৃষিখেত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুরমা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে প্রায় তীরের সমান হয়ে যাওয়ায় উজান থেকে আসা ঢল ও বানের পানিতে নদী ভরে অকালে বন্যা দেখা দেয় এবং ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সম্প্রতি সুরমার পানিতে সুনামগঞ্জের বড় বড় কয়েকটি হাওরে বাঁধ ভেঙে শত কোটি টাকার ইরি-বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

সুরমা নদীর বড় উপনদী বাসিয়া ও খাজাঞ্চী। এ দুটি নদী বিশ্বনাথ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে কুশিয়ারা নদীতে মিলিত হয়েছে। নদী দুটি ভরাট হওয়ায় চারটি উপজেলায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর পূর্বে বাসিয়া নদীর ২৫ কিলোমিটার খননের জন্য ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। নদীটির মাত্র কয়েক কিলোমিটার তীরের ঘাস পরিষ্কার করে ঠিকাদার চলে যায়। বিশ্বনাথ থানা সদরে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক কিলোমিটার নদী খনন হয়নি। এখানে ময়লা আর্বজনা ফেলে নদীটিকে ড্রাস্টবিন বানানো হয়েছে। নদীর দুই তীরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের সামনে নদী হচ্ছে ড্রাস্টবিন। বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের হাজারিগাঁও গ্রামের পাশে মরা সুরমাসহ ২৮ কিলোমিটার খাজাঞ্চী-মাকুন্দা নদী খননের জন্য ১৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রথম দফায় এবং পরবতী‌র্ সময় ৬ কোটি টাকায় আরো ১৩ কিলোমিটার নদী খননের টেন্ডার পায় দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু খনন নিয়ে এলাকায় অত্যন্ত অসন্েতাষ তৈরি হয়েছে। নদীর তলদেশ খননের বদলে নাকি তীরের ঘাস পরিষ্কার করেছে প্রতিষ্ঠান দুটি। এতে নদীর তীর সংরক্ষণের পরিবর্তে, নদী ভাঙনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত বছর ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় বাসিয়া ও খাজাঞ্চী নদী খননে অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে ঠিকাদার পুনরায় এসে কিছু মাটি কেটে কাজ বন্ধ করে দেয়। দুবার মরা সুরমা নদীর মুখ খনন করার পরও পানি চলাচলের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। ফলে বাসিয়া ও খাজাঞ্চী নদীর জগন্নাথপুর পর্যন্ত নদীপথ নিশ্চিতভাবে মরে গেল। এটি একটি উদাহরণ মাত্র।

দেশের প্রত্যক উপজেলায় পল্লি অঞ্চলে পানি সরবরাহ প্রকল্প নামে গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০/২৫টি পরিবারের জন্য লাখ টাকা মূল্যের একটি করে গভীর নলকূপ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা। নলকূপ পেতে ১০ হাজার টাকা ব্যাংকেও জমা দিতে হয়। অনেক গরিব পরিবার টাকা জমা দিতে না পারায় তারা নলকূপ পায় না। মূলত এসব গরিব পরিবারই খাবার পানির সংকটে ভুগছেন। গভীর নলকূপ বরাদ্দ নিয়ে সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও বিত্তশালীদের কাছে লাখ টাকা মূল্যে বিক্রির অভিযোগ দেশ জুড়ে। টেন্ডারের মাধ্যমে নলকূপ স্থাপন করা হলে তালিকা করেন জনপ্রতিনিধিরা। মূল ঠিকাদার কাজ না করে অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেয়। সাব-ঠিকাদাররা বেশি লাভের আশায় নিম্নমানের পাইপ, ফিল্টার, ট্যাংকি ও টেপ বসিয়ে দেয়। ঠিকাদার নিজ খরচে নলকূপের সব কাজ সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু সাত-আট জন লোককে আট-দশ দিন থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ও বিদু্যত্ও খরচ দিতে হয় গরিব পরিবারগুলোকে। এজন্য আরো দশ-পনেরো হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়। মাটির নিচের পানির স্তর বা লেয়ার সমান থাকে না। কিন্তু ঠিকাদাররা পাঁচ-ছয় শত ফুট পাইপ গভীরে দিয়ে ফিল্টার স্থাপন করে দেয়। কিছ দিন পর এসব নলকূপে পানিও আসে না। আর্সেনিক দূষণও থাকে। নলকূপ স্থাপনের সময় তদারকিও হয় না। স্থানীয় জনস্বাস্হ্য প্রকৌশলী অফিসগুলো ভাগ পেয়ে থাকে। কিছু পানি ব্যবসায়ী গোপনে গভীর নলকূপ বসিয়ে বোতলের পানির ব্যবসা করছেন। হরেকরকম পানি এখন বাজারে। যে অঞ্চলে এ ধরনের ওয়াটার কোম্পানি রয়েছে, সেখানে ভূমিধস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নজরদারি আবশ্যক। সর্বাবস্থায় গভীর নলকূপ স্থাপনে চরম দুনী‌র্তির আশ্রয় নিয়ে ভূপৃষ্টের নিচের পানির স্তর ধ্বংস করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় একটি দৈনিকে ‘রাজনীতির ফাঁদে নিরাপদ পানি’ শিরোনামে একটি সংবাদে নলকূপ বরাদ্দের ব্যাপক অনিয়ম, দুনী‌র্তির করা উল্লেখ করা হয়েছিল।

ভূপৃষ্টের উপরিভাগের পানির উৎস নদনদী, খালবিল, পুকুর ও জলাশয়ে যদি পানি না থাকে, তবে মাটির নিচে পানি থাকারও কোনো সুযোগ নেই। আমাদের এই বোধশক্তি জাগ্রত হলে আমরা কখনো পানির উৎস ভরাট করতে পারি না। ছোটবড় খালবিল, পুকুর খনন এবং বৃষ্টির পানি জমা রাখার ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। নদীখনন ও নলকূপ স্থাপনে সর্বগ্রাসী দুনী‌র্তি সরকারের সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যৌথভাবে যদি সরকারি নদনদী, খালবিল, পুকুরের সীমানা চিহ্নিত করে সরজমিনে প্রকল্প তৈরি করে সিডিউল মোতাবেক নদী খনন করেন, তবে পানির সংকট থেকে এদেশকে মুক্ত করা সম্ভব। দুনী‌র্তিবাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে নদী খননে বা তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হলে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে এবং দেশ পানির অভাব থেকে মুক্ত থাকবে। নলকূপ নিয়ে অনিয়ম, দুনী‌র্তি বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, চাইলেই পানি সংকট দূর করা সম্ভব হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এদেশের পানির সংকট দূর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজবিশ্লেষক

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন