শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ দশা। নিত্যপণ্যের অভাবে চারদিকে হাহাকার। বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে আমদানি করতে পারছে না সার, ওষুধসহ জরুরি পণ্য। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। অর্থনীতির এই দুরবস্থার প্রভাব আছড়ে পড়েছে লঙ্কান রাজনৈতিক অঙ্গনে। এই বেহাল দশার জন্য অনেকে অনেক কারণ দাঁড় করাচ্ছেন।
শ্রীলঙ্কার এই দুর্দশা দেখে বাংলাদেশে আবার অনেকে নড়েচড়ে বসেছেন। বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। আলোচনা হয়েছে মহান জাতীয় সংসদে। এসব দেখে শ্রীলঙ্কার দুরবস্থার কারণ জানতে ইচ্ছে করে।
ইতিহাস বলে, নবম শতাব্দীতে মোরাভিয়ার (বর্তমানের চেকোস্লোভাকিয়া অঞ্চল) রাজা রোমান রাজা মাইকেল-৩-এর কাছে পত্র মারফত প্রযুক্তিগত সহায়তার অনুরোধ করেছিলেন। ঔপনিবেশিক আমলে ফ্রান্স ও ব্রিটেন যথাক্রমে Conolial Development and Welfare Fund এবং Conolial Development Corppration এর আওতায় তাদের ঔপনিবেশিক অঞ্চলে উন্নয়ন-সহায়তা প্রদান করেছিল। ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য ত্রাণসহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করেছিল ১৮১২ সালে। লীগ অব নেশনসের আমলে সংস্থাটি থেকে চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নিয়েছিল পুঁজি ও প্রযুক্তি সহায়তা। এসব আইন, উদ্যোগ থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা বহু পুরোনো। স্বাধীন শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এরূপ ঋণ সহায়তার প্রচলন ছিল।
আধুনিককালের উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান প্রবক্তা সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ ক্যাটলেট মার্শাল ১৯৪৭ সালের ৫ জুন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক যুগান্তকারী ভাষণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের দেশসমূহের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য এক কালজয়ী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন, অর্থনীতিতে যা ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত। এই মার্শাল প্ল্যানের আওতায় ইউরোপের ১৬টি দেশ পেয়েছিল ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তা। তারই ধারাবাহিকতায় ১৬ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Organization for European Economic Co-operation (OEEC), যা পরে Organization of Economic Co-operation and Development (OECD) হিসেবে বিবর্তিত হয়। বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্তর এই উন্নয়ন সহযোগী ফোরামের সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা ৩৪ এবং তাদের কর্তৃক প্রবর্তিত রূপ Official Development Assistance (ODA)।
শুধু OECD নয়, বর্তমান বিশ্বে বহুবিধ উৎস থেকে রাষ্ট্রসমূহ বৈদেশিক সহায়তা গ্রহণ করে থাকে। উৎস বিবেচনায় বৈদেশিক সহায়তাকে বহুপাক্ষিক (বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘের মতো সংস্থাসমূহ), দ্বিপাক্ষিক (জাপান, রাশিয়ার মতো বন্ধু দেশসমূহ) এবং বাণিজ্যিক (বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান) এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট’। নেতিবাচক শোনালেও ‘ঘাটতি বাজেট’ নেতিবাচক কোনো বিষয় নয়; বরং উন্নয়নসহায়ক।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশ সাক্ষী হয়েছে দুর্দান্ত সব অর্জনের। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে উন্নয়ন কৌশলে। বৈদেশিক সহায়তার জন্য বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে সম্পর্ক জোরদার করছে বহুপাক্ষিক সংস্থার সঙ্গে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কর্তৃক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ‘Flow of External Resources into Bangladesh 2020-2021, Golden Jubilee Special Edition’ মোতাবেক স্বাধীনতার পর থেকে ৩০ জুন ২০২১ পর্যন্ত সময়ে মোট জতায় ১০১,৩৬৭ দশমিক ৩১৭ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে পাওয়া গেছে। যার মাঝে ৫৩,৮৫৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার (৫৩ দশমিক ১৩ শতাংশ) এসেছে বহুপাক্ষিক উৎস থেকে এবং ৪৭,৫১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার (৪৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ) এসেছে দ্বিপাক্ষিক উৎস থেকে। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের নজির নেই বললেই চলে। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে বহুপাক্ষিক উৎস থেকে সহায়তার পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে বহুপাক্ষিক উৎস থেকে গৃহীত সহায়তার পরিমাণ ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ। পক্ষান্তরে শ্রীলঙ্কার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শ্রীলঙ্কা Department of Extarnal Resources কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক ২০২১ সালের সরকার কর্তৃক গৃহীত ২৪১৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তার মাঝে অনুদান ছিল ১৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, ঋণ ২৩৯৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। গৃহীত ঋণের ৫০৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার দ্বিপাক্ষিক, ১১০১ মিলিয়ন ডলার বহুপাক্ষিক উৎস থেকে। বাকি ৮০৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার বাণিজ্যিক উৎস Commercial China Development Bank থেকে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে, কঠিন শর্তে ঋণ গ্রহণের প্রবণতাই শ্রীলঙ্কার জন্য কাল হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বৈদেশিক সহায়তার তিনটি ভিন্ন রূপ— অনুদান, ঋণ ও কারিগরি সহায়তা। অনুদান ফেরত দিতে হয় না বলে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের কাছে সব সময়ই আকর্ষণীয়। স্বাধীনতার পরের বছর যুদ্ধবিদ্ধস্ত অর্থনৈতিক সময়ে, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রাপ্ত সহায়তার ৯০ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল অনুদান। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের ১৬৩০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তার মাঝে অনুদান ছিল ৫৯০ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের (৩৬ দশমিক ২ শতাংশ), ঋণ ১০৪০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে গৃহীত ৭৯৫৭ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার মধ্যে অনুদান ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ (৫০৮ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার), বাকি ৭৪৪৮ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলারই ঋণ। অনুদাননির্ভরশীলতা থেকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বের হয়ে এসেছে।
পক্ষান্তরে শ্রীলঙ্কা সরকারের Department of Extarnal Resources কর্তৃক পÌকাশিত ANNUAL REPORT ২০০৬ মোতাবেক (পৃষ্ঠা-১৪) ২০০৬ সালে গৃহীত ১০৯৪ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সহায়তার মধ্যে অনুদান ছিল ৩০৯ মিলিয়ন ডলার (২৮ দশমিক ২ শতাংশ), যেখানে ২০২১ সালে গৃহীত ২৪১৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে অনুদান ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার (শূন্য দশমিক ৭১৬ শতাংশ)। অনুদাননির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসা নিশ্চয় ভালো, কিন্তু শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে অনুদান পরিহার করার ঘটনা ঘটেছে হঠাত্ করে, কোনোরূপ পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই।
ঋণ, অনুদান যাই হোক, গৃহীত বৈদেশিক সহায়তা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহূত হবে, সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্রের আর্থিক সংগতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর। উন্নয়ন সহযোগী দেশ বা সংস্থাসমূহ সাধারণত সরাসরি খাদ্যসহায়তা, ওষুধ অথবা অন্যান্য জরুরি পণ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থসহায়তা, বিশেষ কোনো খাত উন্নয়নের জন্য অর্থসহায়তা এবং সরাসরি বাজেট-সহায়তা—এই পাঁচভাবে সহায়তা প্রদান করে থাকে।
উন্নয়ন অর্থনীতিতে বৈদেশিক সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে নানাবিধ বিতর্ক বিদ্যমান। অনেকে বিশ্বাস করেন যে, ODA অকার্যকর এবং এরূপ সহায়তা বছরের পর বছর ধরে দরিদ্র দেশগুলোকে উলটো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উন্নয়ন কর্মী থমাস ডিকচার যেমন বলেছেন, ‘বৈদেশিক সাহাঘ্য একটি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে একধরনের সাহাঘ্যশিল্প গড়ে উঠেছে এবং ঋণ নামক পণ্য বিক্রি করাই তাদের উদ্দেশ্য।’ বলা হয়ে থাকে, বৈদেশিক সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্য যতটা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তার চেয়ে ঢের বেশি থাকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার। নিজেদের ভূরাজনীতির সমীকরণ মেলাতে সহায়তার ছদ্মবেশে শাসনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, প্রয়োজনে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করেও থাকে। সহায়তা গ্রহণকারী দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক রীতিনীতি পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে। পরামর্শক ফি-র নামে সাহাঘ্যের সিংহভাগ তারা নিজেরাই নিয়ে যায়। নিরীক্ষা মিশন নামে যুক্ত করা হয় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ। সহায়তা গ্রহণকারী দেশের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিবেচনায় না নিয়ে সব দেশের জন্য একই সমাধান, one-size-fits-all মহোঔষধ কোনো কাজেই আসে না। তাছাড়া ভিন্ন ভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর হরেক রকমের পরামর্শ মানতে গিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয় উন্নয়নকাজে।
এত সব কথা শুনে মনে হতে পারে বৈদেশিক সহায়তা শুধু ক্ষতিরই কারণ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক সহায়তার উচ্চচাহিদার মূল কারণ এর পরিমাণ, দীর্ঘ মেয়াদ, রেয়াতকাল, এবং কম সুদহার। বাণিজ্যিক ঋণের তুলনায় এই ঋণের সুদ একেবারেই নগণ্য। বর্তমান দেশীয় বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার যেখানে কম-বেশি ৯ শতাংশ, সেখানে বিশ্বব্যাংকের সুদের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। বৈদেশিক সহায়তার সঙ্গে উন্নত দেশের কারিগরি ও গবেষণালব্ধ জ্ঞানের বিনিময় ঘটে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। নিবিড় নিরীক্ষার ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। জলবায়ু, দুর্যোগ, সন্ত্রাস, পাচারের মতো আন্তঃদেশীয় সমস্যা মোকাবিলায় এরূপ সহায়তার বিকল্প নেই। এসডিজির ১৭ নম্বর অভীষ্ট মোতাবেক উন্নত দেশগুলো তাদের জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের জন্য সহায়তা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধও বটে। বৈদেশিক সহায়তা পেলেই হবে না, দরকার যথাযথ বাস্তবায়ন। সহায়তার সর্বোচ্চ কার্যকারিতার জন্য Global Partnership for Effective Development Co-operation (GPEDC) চারটি মূলনীতি অনুসরণের তাগাদা দিয়ে আসছে। ঙতহণকারী দেশের কর্তৃত্ব (Country Ownership) প্রতিষ্ঠা, নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী বিদেশি নীতি সমন্বয় করা, দেশীয় মানদণ্ড মোতাবেক প্রতিবেদন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন এবং যৌথ দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ। কার্যকারিতার জন্য দরকার সঠিক নেতৃত্ব, দেশপ্রেমিক-সুদক্ষ সরকারি চাকুরে, জাতীয় রূপকল্পভিত্তিক সঠিক কর্মপরিকল্পনা। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে এসবেই ঘাটতি ছিল।
লেখক: জেলা প্রশাসক, মেহেরপুর
