অর্থনৈতিক উন্নয়নে বন্দরসুবিধার গুরুত্ব অপরিসীম। স্থল, নৌ, সমুদ্র ও আকাশপথে বাংলাদেশের বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা রহিয়াছে; কিন্তু বিস্তৃত বন্দরসুবিধা গড়িয়া তুলিতে না পারায় আমরা এই সম্ভাবনাকে পুরাপুরি কাজে লাগাইতে পারি নাই। যতটুকু অবকাঠামোগত সুবিধা রহিয়াছে, তাহারও সদ্ব্যবহার করিতে পারিতেছি না আমরা। স্ক্যানিং মেশিন, অর্থ লেনদেনের বুথ ও বিশ্রামাগার স্থাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৈন্যদশা বিদ্যমান। বিশেষত নিরাপত্তার কারণে বন্দরগুলিতে স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের গুরুত্ব সর্বাধিক; কিন্তু গতকাল পত্রিকান্তরে প্রকাশ, আমাদের চারটি বন্দরে ১৬টি স্ক্যানার মেশিন স্থাপনের বিষয়টি ঝুলিয়া রহিয়াছে। ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি। দীর্ঘদিন ধরিয়া চট্টগ্রাম বন্দর, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই সকল স্ক্যানার মেশিন স্থাপন করা হইতেছে না। ইহাতে পণ্য রপ্তানিতে জটের সৃষ্টি হইয়াছে। বাড়িয়া গিয়াছে ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ ও ভোগান্তি। ইহার কারণে বন্দরগুলিতে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংকট তৈরি হইতে পারে।
বন্দরগুলিতে স্ক্যানিং মেশিন বারংবার বিকল হইয়া যাইবার ঘটনাও ঘটিতেছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে। ইহা রহস্যজনকও বটে। একবার মেশিন বিকল হইলে তাহা মেরামত করিতে সময় লাগে এক হইতে দুই মাস। তাহা ছাড়া অভিযোগ রহিয়াছে যে, স্ক্যানার ও ওজন মাপার মেশিন নষ্ট থাকিবার সুযোগে একটি সিন্ডিকেট ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাদক ও নানা ধরনের অবৈধ পণ্য পাচারে সক্রিয় রহিয়াছে। এই সিন্ডিকেটের সহিত স্ক্যানার মেশিন অপারেটর, নিরাপত্তাকর্মী, লোডারসহ কার্গো বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। একই কারণে দরপত্রে নানা শর্ত জুড়িয়া দিয়া বত্সরের পর বত্সর ঝুলাইয়া রাখা হইতেছে বন্দরের স্ক্যানার ও নিরাপত্তাসামগ্রী ক্রয় ও স্থাপন প্রক্রিয়া— এমন অভিযোগও নূতন নহে। উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালে দুর্বল নিরাপত্তা ও স্ক্যানিংয়ের অপ্রতুলতার অভিযোগ তুলিয়া যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ গোটা ইউরোপ বাংলাদেশ হইতে আকাশ ও নৌপথে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়াছিল। কূটনৈতিক তত্পরতায় সেই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়া গেলেও ফের নৌবন্দর ও বিমানবন্দরগুলিতে অডিট অভিযান শুরু করিয়াছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তাই বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। বর্তমানে ঈদ উপলক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানির চাহিদা বাড়িয়া গিয়াছে। পূর্বে যেইখানে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০টি কার্গো ফ্লাইট চলাচল করিত, সেইখানে শিডিউল ও নন-শিডিউল মিলাইয়া শতাধিক ফ্লাইট উঠানামা করিতেছে। চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের তিনটি বিমানবন্দরকে সক্ষমতার চাইতে অধিক কার্গো সামলাইতে হইতেছে। একদিকে সমুদ্রবন্দরে কনটেইনার জট, অন্যদিকে কার্গো শিপিং চার্জ চড়া হওয়ায় ক্রেতা ও রপ্তানিকারকগণ আকাশপথে পণ্য পরিবহনে বাধ্য হইতেছেন; কিন্তু এইখানেও ভোগান্িতর শেষ নাই। বিমানবন্দরে স্ক্যানার ও ওজন মাপার মেশিন প্রায়শ বিকল থাকিবার কারণে রপ্তানিতে সৃষ্টি হইতেছে বড় ধরনের জট।
উপর্যুক্ত সমস্যার সমাধান হইল বিদ্যমান স্ক্যানার মেশিনগুলি সচল রাখা এবং নূতন যেই সকল স্ক্যানার ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হইয়াছে তাহা দ্রুত সম্পন্ন করা। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে ইহাও বলা হইয়াছে যে, স্ক্যানিং মেশিন সংগ্রহে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সংকটে পড়িবে বাংলাদেশের রপ্তানি। একটি বিতর্কিত ও আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ কোম্পানি হইতে স্ক্যানার মেশিন ক্রয় করায় এবং নূতন করিয়া ক্রয়ের উদ্যোগ লওয়ায় সেই সকল স্ক্যানিং মেশিনের রিপোর্ট অনেকাংশে গ্রহণযোগ্য নাও হইতে পারে। তখন আমাদের জন্য তাহা বিপদের কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে। কেননা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স একটি বড় ইসু্য। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানিয়া চলিবার ক্ষেত্রেও আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। তাহা ছাড়া ইহার সহিত আমাদের দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। দুর্বল স্ক্যানিংয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হইবে, তাহার দায় এড়ানো কঠিন হইবে। অতএব, বন্দরগুলিতে স্ক্যানিং-সংক্রান্ত দৈন্যদশা ও ইহার দুর্বলতা দূর করিতে হইবে। চাহিদা অনুযায়ী নূতন নূতন স্ক্যানার মেশিন সংগ্রহ ও স্থাপনায় কালক্ষেপণ কাম্য নহে। এই সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।
