পুতিনের কর্মকাণ্ডের কারণে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম শুরু হয়েছে

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২২, ০১:২৬

ইতিহাস খাদের কিনারে টলটলায়মান, এটি কোনো দিকে যাবে, কেউ জানে না। সম্ভবত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের শেষ এবং সবচেয়ে ভয়ংকর রাশিয়ান সাম্রাজ্যের পতন হবে।

অথবা এটি সব ধাক্কাকে সামলে নেবে এবং ১৭ শতকের পর থেকে ক্রমবর্ধমান এই সম্রাজ্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। আপনি এর বিপক্ষে বাজি ধরলে শেষমেশ বোকাও বনে যেতে পারেন। যারা এরকম বাজি ধরেছিল, ইউরেশিয়ার কবরস্থানগুলি সেসব মানুষে পরিপূর্ণ।

এবং তা সত্ত্বেও ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের শ্বাসরুদ্ধকর বীরত্ব এবং পুতিনবাদী উন্মাদ, আত্মবিভ্রম শাসনব্যবস্থা সিরিয়া থেকে মধ্য এশিয়া এবং জর্জিয়া থেকে মোলদোভা পর্যন্ত বিস্তৃত রাশিয়া বিরোধীদের সেই প্রশ্নটি ভাবাতে বাধ্য করছে—যদি সত্যিই তা হয়? কী হবে যদি সাম্রাজ্যের পতন হয়? কী হবে যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এবং ক্রীতদাস করে রাখা কাঠামোগুলি যদি রাশিয়ার সমরাস্ত্র বহরের কচকচ করে চলা ট্রাকের মতো উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়?

আমাদের সময়ের সংগ্রামে মহান উপনিবেশবিরোধী যেসব মানুষ অংশ নিয়েছিল তাদের সঙ্গে কথা বললে শোনা যায়, বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি থেকে তারা সরে যাচ্ছেন। সারা বিশ্বের বামপন্থিরা যদি সেটা উপলব্ধি করতে পারত! শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে জেল সাজা, এরপর উপলব্ধি করা, গণ-অভ্যুত্থান কখনোই যথেষ্ট হয়নি।

অহিংস কৌশলগুলি শুধু সেসব শাসনের বিরুদ্ধে কাজ করে, যেগুলি ততটাও নিপীড়ক নয় যে, তাদের পরিবর্তন করা কখনো সম্ভব হবে না।

যখন ঝুঁকি বাড়ে তখন জীবনও পরিবর্তিত হয়। তিমুর মিটস্কিভিচের গল্পটি ২০ শতকের উপনিবেশবিরোধী প্রতিবাদেরই প্রতিধ্বনি করে। সময়টা ২০২০ সাল, তিমুর ছিলেন মিনস্কের একজন সাধারণ কিশোর। সেই সময় বেলারুশের স্বৈরশাসক আলেকজান্ডার লুকাশেংকো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কারচুপি করেছিলেন; ১৯৯৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি তার শাসনের বিরুদ্ধে আসা প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে চূর্ণবিচূর্ণ করেন। বিরোধী প্রার্থী সভিয়াতলানা সিখানৌস্কায়ার সমর্থকরা বেলারুশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছিল।

গণ-অভ্যুত্থানের অন্য একটি দিক হলো, অহিংস কৌশলগুলি তখনই শাসকের বিরুদ্ধে কাজ করে, যেখানে প্রতিবাদকারীরা শাসনব্যবস্থাকে যতটা নিপীড়ক মনে করে, ঠিক ততটা নিপীড়ক হয়না। সেই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাদের সব অপরাধ এবং কুসংস্কারের জন্য, ১৯৪০-এর দশকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃপক্ষকে মহাত্মা গান্ধী এবং ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন সরকারকে মার্টিন লুথার কিংয়ের কথা শুনতে হয়। লুকাশেংকো তার বিরোধীদের কথা শোনেননি। তিনি তাদের ভয় দেখিয়েছেন। মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করার সময় তাকে নেতিবাচক প্রচারণা নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের’ প্রতিক্রিয়া নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন হননি, যখন ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা দেন, বেলারুশের স্বাধীনতার সামান্য যা-কিছু অবশিষ্ট রয়েছে সেটি বাদ দিয়ে হলেও সেখানকার ক্ষমতার মসনদে স্বৈরশাসককেই বহাল রাখবেন। বেলারুশ দেশটি আবার রাশিয়ার উপনিবেশে পরিণত হয়, যেটি ১৭৯৫ সালে রাশিয়ার সাম্রাজ্যের অধীনে আসার পর থেকে প্রায় অবিচ্ছিন্নই ছিল। ১৭ বছর বয়সি মিটস্কিভিচ বিক্ষোভে যোগ দেন। পুলিশ তাকে এমনভাবে মারধর করে যে, ডাক্তাররা তাকে কোমায় নিয়ে যেতে বাধ্য হন। তিনি যখন মুক্তি পান, আর আগেই ৯টি অনাথ শিশু রেখে তার মা মারা যান। শান্তিপূর্ণ অভ্যুত্থান শুধু লজ্জা বোধ করার ক্ষমতাসম্পন্ন শাসনের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং বেলারুশ এবং রাশিয়ার শাসকদের সেই লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই।

২০১৪ সালের আগে বেলারুশ ইউক্রেনের মতোই একটি দেশ ছিল, যা নিয়ে পশ্চিমারা খুব কমই ভাবত। আজ বেলারুশের নাম যতটুকুও যা উচ্চারিত হচ্ছে, সেটি কিয়েভে ব্যর্থ আক্রমণের জন্য রাশিয়ার ঘাঁটি হিসাবে। ১৯৯০-এর দশকে, উদার গণতন্ত্রের বিজয় এতটাই অনিবার্য বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, আমরা বেলারুশকে ‘ইউরোপের শেষ একনায়কত্ব’ বলে অভিহিত করেছি। কী অদ্ভুতভাবে আমরা ভূষিত করলাম! এটি এখনো সোভিয়েত-শৈলীর নিয়ম আঁকড়ে আছে, নিঃসন্দেহে এটি এমন একটি ভুল, যা মুক্তবাজার এবং মুক্তসমাজের আদর্শগুলো বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস অবশ্যই সংশোধন করবে।

অরাজকতার উত্কৃষ্ট উদাহরণ হওয়া সত্ত্বেও বেলারুশ ভবিষ্যতের জন্য একটি মডেল ছিল। যদিও বেলারুশ রাশিয়ার একটি ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র, অথচ রাশিয়া নিজেই বৃহৎ পরিসরে বেলারুশ হয়ে ওঠে। কারণ পুতিন ২০০০ সালের দিকে রাশিয়ার নাগরিকদের যে সীমিত স্বাধীনতার সুযোগ দিয়েছিলেন, সেটি কেড়ে নেন এবং লুকাশেংকোর স্বৈরাচারী শাসনকে নিকৃষ্টভাবে অনুসরণ করেন।

বেলারুশের নির্বাসিত বিরোধীদের কাছে, ইউক্রেনের যুদ্ধ তাদের যুদ্ধ এবং ইউক্রেনের বিজয় রাশিয়ার শোষিত এবং নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল জুড়ে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করবে। ইউক্রেনীয় যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে, যদি আরো স্পষ্টতার প্রয়োজন হয়, কীভাবে রাশিয়ান জাতীয়তাবাদীরা পূর্ব স্লাভদের অযৌক্তিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। রাশিয়ার সরকারি মিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে যে, ইউক্রেনীয়রা এবং আরো বিস্তৃতভাবে বেলারুশিয়ানরা সত্যিই রাশিয়ান ছিল। যদি তারা রাশিয়ান পরিচয় প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে যে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ইতিহাস রয়েছে, যা রাশিয়ান সাম্রাজ্যের আগে বিদ্যমান ছিল, রাশিয়ানরা কেবল প্রমাণ করতে চায় যে, তারা ‘নাত্সি’। মানুষের জীবনের কোনো উঁচুনিচু ভেদাভেদ নেই। রাশিয়ানরা মনে করত, তাদের দায়িত্ব ছিল সেসব মানুষ হত্যা করা বা শ্রমশিবিরে পাঠানো; তাদের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের কেড়ে নেওয়া এবং তাদের দেশ এবং তাদের সংস্কৃতিকে চূর্ণ করা।

গত সপ্তাহে আমি যখন পোল্যান্ডে নির্বাসিত সিখানৌস্কায়ার সিনিয়র উপদেষ্টা ফ্রাংক ভায়াকোরকার সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন যে, বিপ্লবই এখন একমাত্র কার্যকর বিকল্প। তার বলার ভাষা ছিল মীমাংসার জন্য আলোচনায় বসা রাজনীতিবিদের পরিবর্তে নেপথ্য যুদ্ধের একজন অফিসারের মতো। লুকাশেংকোর শাসন ছিল ‘সহযোগী রাষ্ট্র’ শাসনব্যবস্থা। রাশিয়ার সৈন্য ও অস্ত্র ইউক্রেনে পৌঁছানো বন্ধ করতে বেলারুশের রেললাইন ধ্বংসকারী কর্মীরা ছিল প্রতিরোধ সেলের সংগ্রামী।

ভায়াকোরকা বলেন, এমনকি সোভিয়েত যুগেও মস্কো বেলারুশ এবং ইউক্রেনীয় জাতির অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পুতিন ‘ফ্যাসিবাদের একটি নতুন রূপ’ নিয়ে এসেছিলেন, যা তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছিল। বেলারুশের বিরোধীরা গোপন পদক্ষেপ নিয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। তাদের তত্পরতা সেনাবাহিনীকে লুকাশেংকো এবং পুতিনের অধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। অন্যান্য দেশের মতো বেলারুশের আশাও নির্ভর করে ইউক্রেনের বিজয়ের ওপর, যা ‘রাশিয়ান প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ’ দিতে পারে।

যদিও আমরা ফিন ডি সিকলের সময় থেকে আশাবাদী হওয়ার চাইতেও অনেক বেশি শিখেছি। আমরা আশা করি, পাশবিক শক্তি এখন আরো প্রভাবশালী হবে। রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী নিঃসন্দেহে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য। কিন্তু আপনি এই সাম্রাজ্যকে জয়ী হতে দেখতে পাচ্ছেন, যেমনটি সব সময় জিতেছে, যারা সৈনিকদের জীবনের কথা চিন্তা না করে যুদ্ধে নিক্ষেপ করে এবং বেসামরিক নাগরিকদের আতঙ্কিত করে। এ কারণে, পশ্চিমা গোয়েন্দারা এত দ্রুত ইউক্রেনের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করছে না বরং এটি একটি কঠিন, নাকাল যুদ্ধ, যার ফলাফল অনিশ্চিত।

এসব কারণে যদি আশাবাদী নই, তবু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন। ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের আংশিক পতনের মতো ২০২০-এর দশকেও নিষ্পত্তিমূলক পরাজয়ের ঘটনা ঘটে? যদি পুরো পচে যাওয়া কাঠামো ধসে পড়ে?

ডাক্তাররা মিটস্কিভিচকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেন। তিনি এখন স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের বেলারুশিয়ান ডিভিশনের ইউক্রেনে যুদ্ধ করছেন। তিনি হাজার হাজার বেলারুশিয়ানের মধ্যে একজন, যারা স্বেচ্ছায় কাস্ত্তস কালিনোস্কি ব্যাটালিয়নে যোগদান করেছিলেন, যেটির নামকরণ করা হয়েছিল ১৮৬৩ সালে রাশিয়ান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক নেতার নামানুসারে। ব্যাটালিয়নটি ইরপিনের চারপাশে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করছে। একদিন, এর সদস্যরা অত্যন্ত কার্যকরী সামরিক দক্ষতা নিয়ে বেলারুশে ফিরে আসবে। তাদের নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকবে।

লেখক: কলামিস্ট

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর—এইচ এম নাজমুল আলম

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন