কোনোভাবেই মুখ থেকে বের করা গেলো না কী অভিমানে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের ব্যবস্হপনা পরিচালকের পদ হতে নিজেকে সরিয়ে দিলেন নাসির উদ্দিন চৌধুরী। যার হাতে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব নামের বৃক্ষটা রোপণ হয়েছিল, সেই গাছের শেকড় থেকে সরে গিয়েছেন নাসির উদ্দিন চৌধুরী।
পদত্যাগ করেছেন আরও আগে। কিন্তু তার আচমকা পদত্যাগের কোনো কারণ প্রকাশ করেননি। জানতে চাইলে নাসির উদ্দিন বললেন, ‘ভাই ফুটবল তো আমার পেশা না। পেশায় আমি ইঞ্জিনিয়ার। আমি আমার পেশায় মনোযোগ দিয়েছি। ব্যাবসায়িক কারণে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মকাণ্ডে মনযোগ দিয়েছি।’
সাইফ পাওয়ারটেকের অতিরিক্ত ব্যবস্হাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন নাসির। তরফদারুল আমিনের সঙ্গে তার সম্পর্কটাই ভাই-বন্ধুর মতোই। ঘনিষ্ঠজনের চেয়েও যেন বেশি কিছু। তারা একে অপরের খুবই আপনজন। ফুটবল খেলাটা ভালোবাসতেন বলেই একটা দল গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং নাসিরের হাতে সবকিছু দেওয়া হয়। তরফদারও তখন বলতেন যা কিছু জানতে হয় নাসির ভাই আছে তাকে ফোন করবেন। তিনিই পুরোটা দেখভাল করেন।
নাসির উদ্দিন চৌধুরী কখনো ফুটবল সংগঠক ছিলেন না। কিন্তু ক্লাবটার দায়িত্ব পেয়ে পৃথিবীর ফুটবল নিয়ে তার পড়াশোনা আরও বেড়ে গিয়েছিল। কীভাবে একটা ভালো দল গড়া যায়, তা নিয়ে দিনরাত সময় দিয়েছেন এই মানুষটি। হূদয় থেকে কাজ করেছেন। কখনো হারলে কষ্ট পেয়েছেন, আবার কখনো রেফারির ভুল সিদ্ধন্তে হেরে বুকের রক্তক্ষরণ নিয়ে রাতে বিছানায় গেছেন। নিজেদের ব্যাবসায়িক অর্থ দিয়ে ক্লাবটাকে গড়েছিলেন।
দেশের ফুটবলের জন্য খেলোয়াড় তৈরি করা যায় কি না, সেই ব্রেইনচাইল্ড ছিলেন নাসির। একটা ভালো বুদ্ধি দেওয়ার মতো মানুষও ছিল না। অবহেলিত উপেক্ষিত প্রতিভাবান ফুটবলারদের ধরে এনে ক্যাম্প করেন। মোহামেডান আবাহনীর মতো ফুটবল দলও যেটি করেনি। নাসির হাঁটলেন ভিন্ন পথে, জুনিয়র দল গড়ার কাজে হাত দিয়েছিলেন। অনূর্ধ্ব-১৬ এবং ১৮ বছরের বয়সের খেলোয়াড়দের নিয়ে আবাসিক ক্যাম্প করলেন। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রথা শুরু করেছিলেন। রিকশা চালকের ছেলের হাতে ফুটবল ধরিয়ে দিয়েছিলেন। গায়ে তুলে দিলেন নতুন জামা-কাপড়, পায়ে চকচকে কেডস। জার্সি প্যান্ট গায়ে, পায়ে বুট পরিয়ে অনুশীলন মাঠে ছেড়ে দিলেন। নতুন স্বপ্ন দেখালেন। উঠে আসুক নতুন জেনারেশন। ভালো খাবার, থাকার আধুনিক ব্যবস্হা করলেন। ভালো কোচ এনে দিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। আর দুই হাতে ব্যাবসায়িক অর্থ ঢেলে দিলেন ফুটবলের জন্য।
এ ধরনের মানুষগুলো ফুটবল হাতে নিতে আসেনি, দিতেই এসেছিলেন। কিন্তু আচমকা ফুটবল ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাটা হূদয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয় ফুটবল অঙ্গনে। হাজার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেও নিজের অভিমান, কষ্ট, আক্ষেপ কিংবা হতাশাবন্দী ঘরেই রাখতে চান। থাকতে চান নিজ পেশায় ব্যস্ত।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে শুরু হয়েছিল সাইফ স্পোর্টিংয়ের। নানা কথা শুনতে হয়েছিল তখন। অথচ এই দলটি একটা সময় হয়ে উঠলো প্রতিপক্ষের চক্ষুশূল। জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভুইয়া, অনেক বড় বড় দল পেয়েও সাইফ ছাড়েননি। কারণ, এখানে সত্যিকারের প্রফেশনাল কাঠামোর চর্চা করা হয়, যা গড়ে তুলেছিলেন নাসির উদ্দিন নিজ হাতে। প্রতিটা ম্যাচে নিজে মাঠে থেকেছেন।
ফুটবল দুনিয়া তার দেখা। যেভাবে ফুটবল দুনিয়া চলে সেভাবে বাংলাদেশের ফুটবল তাল মেলায় না। মেলাতে চায় না। নাসির বললেন, ‘পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো দরকার। কারণ, ক্ষণে ক্ষণে পৃথিবী বদলাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবল পারছে না। আক্ষেপ আছে ফুটবলে অনেক টাকার দরকার।’ ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল, সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবকে একটা ফুলবাগানে পরিণত করেছিলেন। সেই বাগানের মালি নিজেই সরে গেলে ফুল কি ফুটবে? সুবাস ছড়াবে? নাসির বললেন, ‘কেন ছড়াবে না। ভালো চলবে।’
