মহাভারতে কথিত আছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া দুর্ধর্ষ বীর অজুর্ন যুদ্ধ করিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগিতেছিলেন। সেই সময় অর্জুনের রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণ তাহাকে শুনাইলেন অভূতপূর্ব কিছু বাণী। তিনি অর্জুনকে বলিলেন, যুদ্ধ করিতে অজুর্নের এইরূপ দ্বিধা করিবার কোনো কারণ নাই। কারণ, এই যুদ্ধে অর্জুন নিমিত্ত মাত্র, যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই শ্রীকৃষ্ণ সকলকে মারিয়া রাখিয়াছেন এবং অর্জুনদের বিজয় পূর্ব হইতেই সুনির্দিষ্ট করা আছে। এই যুদ্ধ অন্যায়কে (অধর্ম) দূর করিয়া ন্যায় (ধর্ম) প্রতিষ্ঠার জন্য। বিদ্বজ্জনেরা এই ক্ষেত্রে বলিতে থাকেন— দেবতারা কোনো বিজয় পূর্বনির্ধারিত করিয়া থাকেন অধর্ম দূর করিয়া সেইখানে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য। কিন্তু এখন বিশ্ব জুড়িয়া যেই সকল যুদ্ধ হইতেছে, তাহা কীসের জন্য?
মানুষ যখন সভ্য হইয়া উঠে নাই, তখনো আধিপত্য বিস্তারের জন্য কাদা-ছোড়াছুড়ি করিয়াছে। প্রস্তরযুগ হইতে শুরু করিয়া আধুনিক এই তথাকথিত সভ্য সময় পর্যন্ত মানুষ লক্ষাধিক বড় বড় যুদ্ধ করিয়াছে। এই জন্য অনেক ইতিহাসবেত্তা বলিয়া থাকেন, মানবজাতির ইতিহাস মূলত যুদ্ধের ইতিহাস। সুতরাং প্রশ্ন যদি করা হয়, যুদ্ধ কেন হয়—তাহার চাইতে বড় কথা হইল— যুদ্ধ বাদ দিলে মানবজাতির ইতিহাসের পাতা সাদা থাকিয়া যাইবে। কিন্তু সেই সাদা পাতা থাকিলেও আমাদের কোনো দুঃখ থাকিত না। সাদা পাতা ভরাইতে যুদ্ধের যে প্রতিযোগিতা এখনো দেখা যায়— তাহা আমাদের মনে এই প্রশ্ন তৈরি করিয়া দেয় যে, আমরা তো সৃষ্টির সেরা জীব, আমাদের কি এমন নৃশংসতা মানায়? ইতিহাসের পাঠ লইলে আমরা দেখিতে পাই, দেশে দেশে স্বৈরাচার আসিয়াছে, তাহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রতিরোধ গড়িয়া উঠিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে তাহাদের পতন হইয়াছে, আবার কোথায় কোথায় তাহারা দশকের পর দশক ধরিয়া টিকিয়া থাকিয়াছে।
অসভ্য হইতে সভ্য হওয়া পর্যন্ত মানবজাতি প্রতিটি মানুষের জীবনরক্ষা তথা উপকার করিবার জন্যই তো অধিক মনোযোগী হইতে পারিত। কিন্তু উপকারের পরিবর্তে কেন মানুষ নিজেদের ক্ষমতা দেখাইতে এত অধিক অস্থির? অথচ অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকে সবচাইতে বড় পাপ বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে। ইতিহাসের নিকট কোনো অপরাধের ক্ষমা নাই। কারণ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ওপর আরেকটি দেশ কোনোভাবেই আক্রমণ চালাইতে পারে না। পৃথিবী তো নিয়মশূন্য হইয়া যায় নাই। কিন্তু ইহারা যেন কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। ক্ষমতা মদমত্তে মানুষের মনস্তত্ত্ব জটিল হইয়া যায়। এই জন্য বলা হয়— যুদ্ধ মূলত আয়োজিত হয় মানুষের মনে। এই মুহূর্তে বিশ্ব জনমতের তোয়াক্কা না করিয়া যেইভাবে একটি দেশে নিরপরাধ নারী-শিশুসহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হইতেছে— তাহা মানবসভ্যতার জন্য লজ্জাজনক। আমরা তো এখন আর আদিম যুগে বসবাস করিতেছি না, কিন্তু আমাদের কার্যকলাপ যেন আদিম যুগের চাইতেও লজ্জাজনক। বিশ্বব্যাপী এত নিন্দা, ঘৃণাও যুদ্ধবাজদের বিবেককে জাগাইতেই পারে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রমে হামলা চালাইতে তাহাদের হূদয় কাঁপে না। শিশুদের দেশহীন করিতে, শরণার্থী করিতে তাহারা লজ্জিত হন না। সুতরাং ইতিহাসের পাঠ হইতে আমরা ইহা স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারি— এখন যাহারা যুদ্ধাপরাধ করিতেছেন, যাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার জন্য হাজার হাজার নিরীহ প্রাণ বলি হইতেছে, তাহাদেরও একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হইবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর যেই ভয়ংকর ক্ষতি হইতেছে, তাহাতে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একটি কথা প্রায়শই বলিয়া থাকেন—আমাদের একটাই পৃথিবী। বসবাসের জন্য আমাদের প্লানেট বি নাই (বিকল্প গ্রহ নাই), তেমনি পৃথিবীকে রক্ষায় প্লান-বি বলিয়া কোনো বিকল্প নাই। অর্থাৎ পৃথিবীকে রক্ষা করিতেই হইবে। এখন বিশ্ব যেই হেতু বিশ্বগ্রামে পরিণত হইয়াছে এবং একটি গ্রামে কোনো ঘটনা ঘটিলে তাহার প্রভাব পড়ে সম্পূর্ণ গ্রাম জুড়িয়া, তেমনি বিশ্বের কোথায় যুদ্ধবিগ্রহ হইলে তাহার অভিঘাত বিশ্বের সকল স্থানেই পড়ে। আর তাহাতে অস্থির হইয়া উঠে এই বিশ্ব। সুতরাং বিশ্বকে রক্ষার জন্য সকল ধরনের যুদ্ধবিগ্রহের বিপক্ষে সম্মিলিত অবস্থার জরুরি।
