যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পশ্চিমারা কী করছে? 

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২২, ১৩:২১

ইউক্রেন যে একটি ন্যায়সংগত যুদ্ধ করছে, এ ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্বের খুব কম লোকই সন্দেহ করে। কারণ রাশিয়ার এই আগ্রাসন ছিল সম্পূর্ণ বিনা প্ররোচণায়, বিনা উসকানিতে। ন্যাটো সম্প্রসারণ বা দনবাসে বসবাসরত রাশিয়ানদের সঙ্গে ইউক্রেনের দুর্ব্যবহার সম্পর্কে যে অভিযোগই থাকুক না কেন, কেউ তো রাশিয়াকে আক্রমণ করেনি এবং কেউ সে পরিকল্পনাও করেনি। ভ্লাদিমির পুতিন স্রেফ একটি আগ্রাসন এবং আঞ্চলিক দখলদারিত্বের যুদ্ধ শুরু করেছেন।

সুতরাং ইউক্রেনকে সমর্থন করা একটি সঠিক কাজ। কিন্তু এটা মোটেও পরিষ্কার নয় যে, আমরা ইউক্রেনকে যে ধরনের সমর্থন দিচ্ছি (এবং দিচ্ছি না) তা ইউক্রেনীয়দের জাতিকে সুসংহত রাখার জন্য যথেষ্ট কি না।

এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি ইউক্রেনীয়রা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে পালাবে এবং তাদের বাড়ি, শহর, শিল্প এবং অর্থনীতিতে আরো ধ্বংসলীলা হবে। তবুও আগ্রাসি শক্তিকে পরাজিত করার জন্য ইউক্রেনের যুদ্ধে সমর্থন করা এবং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে যুদ্ধে কেবল অস্ত্র সরবরাহ করার পশ্চিমের যে বর্তমান পদ্ধতি তা কেবল যুদ্ধকেই দীর্ঘায়িত করবে। রাশিয়ার অগ্রগতি মম্হর হতে পারে, তবে এটি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, মনে হয় না বন্ধ হবে। ইউক্রেন থেকে অনেক কম ঠেলে বের করাও কঠিন হবে এবং এর মধ্যে ধ্বংস এবং জঘন্য যুদ্ধাপরাধ অব্যাহত থাকবে।

বর্তমানে এমন কোনো দিন অতিবাহিত হয় না, যেদিন কিছু সিনিয়র পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ঘোষণা না করেন যে ইউক্রেন ‘সফল’ হবে এবং রাশিয়া ‘ব্যর্থ’ হচ্ছে। এই বিবৃতি অবশ্যই মনোবল বাড়ায়। কিন্তু এটা একেবারেই অর্থহীন উক্তি।

বাস্তব বিষয় হলো, যত সময় অতিবাহিত হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলি আরো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং তারপর রাশিয়ানদের হাতে পড়ছে। দুই মাসে, রাশিয়ান নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা কমপক্ষে পাঁচ গুণ বেড়েছে—মূলত দনবাসের বিচ্ছিন্ন অংশগুলি। যদি রাশিয়া এই গতিতে ‘পরাজয়’ ভোগ করতে থাকে, তাহলে আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে ইউক্রেনের সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, ওডেসার মতো শহরগুলি মারিউপোলের মতো হবে এবং আরো হাজার হাজার ইউক্রেনীয় মারা যাবে।

আরো খারাপ কথা হলো, যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং যদি আরো শহর ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে ইউক্রেনীয় যারা অন্য দেশে পালিয়ে গেছে তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে। কারণ তাদের ফিরে আসার কোনো কারণ থাকবে না। তাদের কোনো কর্মক্ষেত্র থাকবে না। মারিউপোলের কত জন নাগরিক ফিরে আসবে? ফলে যদি রাশিয়ার লক্ষ্য ইউক্রেনীয় জাতিকে নির্মূল করা হয়, তাহলে পশ্চিমের প্রকারান্তরে ঠিক সেই লক্ষ্যটি পূরণেই সহায়তা কর যাচ্ছে।

মোদ্দা কথা, যদি ইউক্রেনের জনগণের জীবন আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে পশ্চিমাদের যুদ্ধ থামাতে কিছু করতে হবে এবং তা এখনই! ইউক্রেনীয়দের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উত্সাহিত করা প্রকারান্তরে কেবল তাদের দেশকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।

সমস্যাটি হলো, যুদ্ধ দ্রুত থামানোর দুটি উপায় রয়েছে এবং এর কোনোটিই বেশির ভাগ পশ্চিমা নেতার কাছে গ্রহণীয় নয়।

একটি হলো ন্যাটোর জন্য যুদ্ধে প্রবেশ করা এবং দ্রুত আক্রমণকারী রাশিয়ার বাহিনীকে দুর্বল ও লন্ডভন্ড করার জন্য একটি দ্রুত, ব্যাপক এবং চূড়ান্ত স্ট্রাইক করা। রাশিয়ার পদক্ষেপের বিপরীতে, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে এটি করার সমস্ত অধিকার এখন তাদের আছে। পুতিন যখন সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন, তখন তিনি সিরিয়ার বৈধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুরোধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি খুব সাবধানতার সঙ্গে এ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। পশ্চিম ইউক্রেনে একই কাজ করতে পারে। এখন এর বিরুদ্ধে পুতিনের নিজের এমন কোনো যৌক্তিকতা নেই।

পশ্চিমারা এটা করছে না কারণ এর সঙ্গে জড়িত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি।

অন্য বিকল্প হলো—রাশিয়াকে জোরালো শান্িত আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পুতিনকে রাজি করানো। পশ্চিমা নেতারা পুতিনের মতো একজন কসাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে রাজি নন। কিন্তু তারা সার্বিয়ার স্লোবোদান মিলোসেভিচের সঙ্গে এটি করেছিল, স্রেব্রেনিকায় গণহত্যার মাত্র কয়েক মাস পরে, এবং যার ফলাফল হিসাবে ডেটন চুক্তি হয় এবং ১৯৯৫ সালে বসনিয়া যুদ্ধের অবসান ঘটে।

পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আনতে সবকিছুই আলোচনার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে—যার মধ্যে ইউক্রেনের সীমানা, রাশিয়ার পুরোনো নিরাপত্তা-উদ্বেগ, এমনকি ইউরোপের সেই অংশে অভ্যন্তরীণ সীমানাগুলির ওপর আজকের আন্তর্জাতিক সীমানাগুলিকে ভিত্তি করার যুক্তিও হতে পারে। যেগুলো ইউএসএসআরে, কমিউনিস্ট নেতাদের দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র এবং অঞ্চলগুলিকে কার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্র হতে বাধা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আলোচনার ফলাফল পূর্বনির্ধারিত করার প্রয়োজন নেই। লড়াইয়ের চেয়ে বরং এখন কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিষয়গুলিকে পশ্চিমা নেতাদের এখনই উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। তা করতে গেলে পুতিনকে জোর করে মানচিত্রটি পুনরায় এঁকে নেওয়ার চেষ্টা করার জন্য পুরস্কৃত করবে বলে মনে হয়। সেটা করতে গেলে বরং পুতিন যুদ্ধ করবে। অথবা আরো সঠিকভাবে বললে, রাশিয়াকে পরাজিত করার আশায় ইউক্রেনকে যুদ্ধ করতে দিলে মানচিত্র পরিবর্তিত হবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে পুতিন কখনোই পরাজয় মেনে নেবেন না। তিনি ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধে খুব গভীরভাবে বিনিয়োগ করেছেন, যাতে হাতের পাঁচ কিছু রাখছেন না। পশ্চিমা নেতারা যদি মনে করেন যে ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে, উত্সাহ দিয়ে ইউক্রেনের সামরিক বিজয় নিয়ে আসবেন, তাহলে তারা পুতিনের উদ্দেশ্য এবং সংকল্পকে মারাত্মকভাবে ভুল বুঝছেন। সর্বোপরি ইউক্রেনের স্বার্থে, আমাদের এখনই তাকে থামাতে হবে; কোনো না কোনো উপায়ে। সেটা করতে হবে আমরা যে দেশটাকে রক্ষা করতে চাইছি, সেই দেশটিতে কিছুই অবশিষ্ট না থাকার আগেই।

লেখক: বিবিসির সাবেক মস্কো প্রতিনিধি এবং সাবেক ক্রেমলিন কনসালট্যান্ট দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন