সম্প্রতি রাশিয়া ঘনঘন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিতেছে পরমাণু হামলার। ইউক্রেন-রুশ যুদ্ধের ভিতর তৃতীয় কোনো দেশ অংশ লইলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হইবার ভয় দেখাইয়াছে রাশিয়া। যদি সত্যি-সত্যিই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তাহা হইলে তাহা হইবে পূর্বের দুইটি বিশ্বযুদ্ধের চাইতে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। কারণ এই বিশ্বযুদ্ধে শুরু হইতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা।
ইউক্রেনের জন্য এই সময়ের যুদ্ধটি একটি ট্র্যাজেডি। কারণ, প্রায় তিন দশক পূর্বে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন হইতে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া দেশ ইউক্রেন ছিল বিশ্বের ‘তৃতীয় বৃহত্তম’ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ইউক্রেনকে অতিদ্রুত পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করিতে উদ্যোগ লইয়াছিল বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রত্রয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া। ইউক্রেনের নিরাপত্তা এই দেশত্রয় দেখিবে—এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালে বুদাপেস্ট স্মারক নামে নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি সই করে ইউক্রেন। ১১টি স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমান ও ৬০০টি আকাশ হইতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার হাতে তুলিয়া দেয় ইউক্রেন। ১৯৯৬ সালেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলি হইতে সকল ধরনের পারমাণবিক সক্ষমতা সরাইয়া ফেলে ইউক্রেন। ১৯৯৭ সালে বাকি ক্ষেপণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য নির্মিত সাইলো ও লঞ্চ সাইট (যেইখান হইতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়) ধ্বংস করিতে রাজি হয় ইউক্রেন। এই কার্যক্রমের জন্য দেশটি ৪ কোটি ৭০ লক্ষ ডলার অনুদানও পায়। ২০০১ সালের মধ্যে এই সকল কিছু তাহারা সরাইয়া ফেলে। ২০০২ সালে ইউক্রেন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্তার প্রতিরোধক ‘হেগ’ আচরণবিধিতে স্বাক্ষর করে। আর এইভাবেই তাহারা নিজেদের ক্রমশ পরমাণু অস্ত্রশূন্য করিয়া ফেলে। পারমাণবিক বোমা তৈরিতে আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ওপেনহেইমার ও আন্দ্রেই শাখারভসহ যেই সকল বিজ্ঞানীর ভূমিকা অপরিহার্য ছিল—তাহারা পরমাণু অস্ত্রের বিভীষিকার কথা ভাবিয়া এই অস্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিলেন। বিশ্বে এখন যে পরিমাণ পরমাণু বোমা রহিয়াছে তাহা দিয়া ৩৩ বার পৃথিবীকে ধ্বংস করা যাইবে! তাহা হইলে কেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করিতে মরিয়া থাকে যে কোনো দেশ?
ইহা বুঝিতে কাহারো রকেট সায়েন্টিস্ট হইবার প্রয়োজন পড়ে না যে, স্বাধীনতার পর সোভিয়েত আমলে পাওয়া হাজারো পারমাণবিক অস্ত্রের ছিটেফোঁটাও যদি ইউক্রেনের হাতে এখন থাকিয়া যাইত, তাহা হইলে রাশিয়া এইভাবে হামলা চালাইবার সাহস পাইত না। পরমাণু অস্ত্রের কিছু একটা থাকিলেও তাহা হইয়া উঠিত ইউক্রেনের ‘হাতের পাঁচ’। কিন্তু সেই ‘হাতের পাঁচ’ শূন্য করিয়া তাহারা নিঃস্ব হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ টানিয়া বলা যায়, এই দেশটিকে যতই হুমকি অবরোধ দেওয়া হউক না কেন, কোনো সামরিক অভিযান চালাইতে বিশ্বের কোনো দেশ সাহস পায় না। কারণ, তাহাদের রহিয়াছে পরমাণু অস্ত্র। দেখা যাইতেছে, কেহ যদি একটিবার পরমাণু শক্তিধর হইয়া উঠিতে পারে, তাহা হইলে বাকি বিশ্ব তাহাকে সমঝাইয়া চলিতে বাধ্য হয়। তখন তাহাকে আর বহিঃশত্রু লইয়া ঘুম হারাম করিতে হয় না। এই জন্যই আমরা দেখিয়াছি, প্রতিবেশী একটি দেশের সহিত শক্তির ভারসাম্য রক্ষার্থে অপর একটি দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলিয়াছিলেন, প্রয়োজনে ঘাস খাইয়া থাকিবে তাহার দেশ, তবুও পরমাণু শক্তি অর্জন করিতেই হইবে। এবং তাহারা সেই শক্তি অর্জন করিয়াও ছাড়িয়াছে।
বাস্তব সাপেক্ষে, পরমাণু অস্ত্র এমন এক তুরুপের তাস, যাহার অর্জন যতখানি যুদ্ধের প্রয়োজনে, তাহা অপেক্ষা অধিক প্রয়োজন যুদ্ধ আটকাইবার জন্য। সুতরাং ইউক্রেনের জন্য ইহা এখন অনুতাপের যে তাহারাও এককালে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ ছিল। কিন্তু এখন তাহারা নখদন্তহীন। অনেকে মনে করেন, হয়তো দূর ভবিষ্যতে এমন দিন আসিবে যখন পরমাণু শক্তিধর হইতে ইউরেনিয়ামের ফিউশন-কৌশল আয়ত্ত করিতে পারিবে প্রত্যেকটি জনপদ। বিশ্বে এখন যতসংখ্যক পরমাণু বোমা রহিয়াছে তাহাতে ৩৩ বার পৃথিবীকে ধ্বংস করা যাইবে। সেই সংখ্যা না হয় ভবিষ্যতে ৬৬ বার বা আরো কয়েক গুণ হইবে, কিন্তু কেহ তখন কাহাকেও আর চোখ রাঙাইতে পারিবে না। অনেকের মতে, কেবল এইভাবেই তৈরি হওয়া সম্ভব বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য।
