এত অসহিষ্ণু কেন আমাদের সমাজ?

আপডেট : ০৪ মে ২০২২, ১৭:১১

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি জিতেন কান্িত গুহকে দিনদুপুরে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের ব্রাহ্মণঘাটার গাউছিয়া কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের সময় তার জামাও খুলে নেওয়া হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম জুলু বলেন, ‘চেয়ারম্যান বিএম জসিমের নেতৃত্বে লোকজন এসে মাহফুজুল হকের নাম ধরে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। এ সময় ইন্দ্রজিত্ চৌধুরী ও মো. সাকিবসহ কয়েক যুবক অতর্কিতভাবে হামলা করে জিতেনকে আহত করে। এমনকি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে।’

এ জাতীয় ঘটনা ঘটলেই মানুষ সামাজিক মিডিয়ায় হামলে পড়ে। এটাই এখন আত্মরক্ষার একমাত্র অবলম্বন। রাজনীতি নেই। রাজনৈতিক দল নেই। কোথাও কোনো বাদ-প্রতিবাদ নেই। সে জাতীয় ঘটনা ঘটানোর নায়কেরা এখন মাইক্রোফোনমুখী। দেশের ভেতর ঘটে যাওয়া অনেক অঘটনই শায়েস্তা হয়েছে শুধু ফেসবুক বা এমন মিডিয়ার শক্তিতে। চট্টগ্রামের এই ঘটনাটি আওয়ামী পরিবারের কোন্দল। এ ঘটনা নিয়ে টিভির একটি টক-শোতে যুক্ত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। ভদ্রলোক ঠান্ডা মাথার মানুষ।

এর আগেও আমি তার কথা শুনেছি। তিনি শান্তভাবে কথা বলেন। মাথা গরম করে হইচই করেন না। তিনি এই আলোচনায় যুক্ত হয়েই বললেন এটি একটি সাম্প্রদায়িক ঘটনা। এবং জিতেন গুহ সাম্প্রদায়িকতার শিকার। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই এই কারণে যে তিনি প্রবণতাটি ধরতে পেরেছেন এবং সঠিক কথাটি বলেছেন। কিন্তু যে লোকটি জিতেন গুহকে প্রথম আঘাত করে তার নাম ইন্দ্রজিত্। এই নামটি কোনো মুসলমানের নাম না। ধরে নিচ্ছি এই লোকটিও হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাহলে এখানে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আসে কীভাবে? আহমদ হোসেন হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন হিন্দু নেতা বলেই এভাবে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারার সাহস হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কদিন পরপর একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী বা মাইনরিটি নামের সম্প্রদায়ের ওপর এমন আঘাতের উত্স কোথায়? এটা কি অন্তর্গত বিদ্বেষের বহির্প্রকাশ না পুঞ্জিভূত ক্ষোভের ফল? এর পেছনে কীসের উসকানি কাজ করে? এ কথা মানতেই হবে, আপামর মানুষজনের সামাজিক নিরাপত্তা নেই। যে কিশোর ছেলেটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই কারাগার দেখে এলো সে তো মুসলমান। তার গায়ে হিন্দুর তকমা ছিল না। কিন্তু তাকেও এসব অনিয়ম আর দুরবস্হার শিকার হতে হয়েছে। চট্টগ্রামের ঘটনাটি আরো কিছু কারণে তাত্পর্যপূর্ণ। জিতেন গুহ আওয়ামী নেতা। সঙ্গে পূজা উদ্যাপন পরিষদের ও নেতা এবং যে অনুষ্ঠানে তাকে মেরে রক্তাক্ত করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল, তিনি ছিলেন সে আয়োজনের বিশেষ অতিথি। একটি অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি মানেই তো কোনো বিশিষ্টজন। তাকে আপ্যায়ন করে আনা হয়। এমন অতিথিকে আক্রমণ করা এবং সেটা অতর্কিত হলে প্রতিরোধ করা হলো না কেন? প্রতিরোধ করার মানুষ থাকলে নিশ্চয়ই তাকে মারধরের পর রক্তাক্ত করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা যেত না। এসবই সম্ভব হয়েছে সেখানে।

শেষ কথা হচ্ছে, এ জাতীয় ঘটনা এখন সংক্রামক। যে ভদ্রলোক আক্রান্ত হয়েছেন তার নামেও নানা গুঞ্জন আর কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে। এখন দেশে যে দল বা যে রাজনীতিই করুক না কেন— বাস্তবে ভদ্রলোক ও নিরীহ নামের মানুষজন এর সঙ্গে নেই। কাজেই তিনি যেভাবে সংগঠন ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত— এ কথা বলা যাবে না তিনি ও ধোয়া তুলসিপাতা। কিন্তু বিষয় সেটা না। একজন মানুষের কৃত অপরাধ বা তার দোষের জন্য আইন আছে, বিচার আছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা এমন মারমুখী হওয়াটা আরো বড় অপরাধ।

দেশের সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক আগেই মারা গেছেন, নয়তো ঘুমিয়ে আছেন। তারা থাকলে বলতেন এমন ঘটনার কারণ একটাই সুষ্ঠু বিচার নেই। সাজা নেই। জনসমাজে সুশাসন আছে কি না, কেউ জানেন না। শুধু প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলেই তা পাওয়া সম্ভব। সবার জন্য তা কি সম্ভব? কারো খেয়াল নেই কোনো ভালো বা মন্দ কাজে। টাকা রোজগার, টাকা কামানো, টাকার পাহাড় গড়াই যেন মানুষের একমাত্র কাজ। মানুষ করবেই বা কি? প্রাইভেট হাসপাতালে দু-রাত থাকলেই ১ লাখ টাকার বিল। হোটেলে গেলে ১ লাখ টাকা। বাসে চড়লে হাজার টাকা। মানুষ সব ভুলে টাকার ধান্দায় ব্যস্ত। আর সমাজে জিতেন গুহদের মার খাওয়াই হয়ে উঠছে নিয়তি। সামনে আর কী কী দেখতে হবে কে জানে?

সিডনি থেকে
লেখক: কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন