টিপি বেওয়া। থাকেন শ্মশানে। চোখে দেখেন না। কানেও শোনেন না। স্বামী-সন্তান, পিতা-মাতা—কেউ নেই তার। বড়ই অভাগিনি। বয়স ৭০ হলেও ভাতার তালিকায় নাম ওঠেনি। নেই ঘরবাড়ি। ভিক্ষা করেন লাঠিতে ভর করে। চোখে দেখেন না বলেই রাত-দিন তার কাছে সমান। ফলে বাতির আলোরও প্রয়োজন পড়ে না।
সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপের রামনগর গ্রামের মৃত লালচান দফাদারের মেয়ে টিপি বেওয়া। তার বিয়ে হয়েছিল সায়েস্তার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আইয়ুব যদুর সঙ্গে। একমাত্র পুত্রসন্তান মারা যাওয়ার পর টিপিকে ছেড়ে যান স্বামী। টিপি চলে আসেন মা-বাবার সংসারে। কালা জ্বরে দুই চোখই অন্ধ হওয়ার পাশাপাশি শ্রবণশক্তিও হারিয়ে ফেলেন। পিতা-মাতা সর্বস্ব খুইয়েও টিপিকে ভালো করতে পারেননি। পিতা-মাতা মারা যাওয়ার পর এক আত্মীয় বাড়িতে কিছু দিন টিপির আশ্রয় হলেও বেশি দিন ঠাঁই হয়নি।
চলে আসেন বাবা-মায়ের গ্রাম রামনগরে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় সারা দিন ভিক্ষা করে দিন শেষে আশ্রয় নেন ঐ গ্রামের চন্দ্র মোহন সাহা শ্মশানে। এই শ্মশানের মঠেই তার বসবাস। এলাকার অশীতিপর বৃদ্ধ গোপাল চন্দ্র সাহা মাস্টার বলেন, চন্দ্র মোহন সাহা তাদের শরিক। তার মঠে টিপিকে আশ্রয় তিনি দিয়েছেন। কে হিন্দু কে মুসলিম—এটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে মানুষ। একদিন সবারই মরতে হবে। তাই মানবিক কারণেই টিপিকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। খিদে পেলে টিপি তাদের বাড়িতে এলে তার পুত্রবধূরা সাহয্য করেন। ছেলেরা ওষুধপত্রও দিয়ে থাকেন।
চন্দ্র মোহন সাহার শতবর্ষী মঠটি মেরামতের অভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। মঠের চার পাশে পুরাতন গাছ, বাঁশঝাড়, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, দিনের বেলায়ও অন্ধকার। রাতে জোনাকি পোকার মিটি আলো ছাড়া কোনো আলো নেই। যেখানে মানুষ যেতে ভয় পায়। সেই শ্মশানের মঠেই টিপির একাকী বসবাস। মঠের মেঝেতেই ঘুমান তিনি। নেই কোনো খাট বা চৌকি কিংবা বিছানা-বালিশ। হাঁটু ভেঙে ঘুমাতে হয়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ টিপি এখন আর ভিক্ষা করতে পারেন না।
যে যা দেয় তাই দিয়ে চলে যায়। অনাহারেও থাকতে হয়। গভীর রাতকে দিন মনে করে অনেক সময় রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন ভিক্ষা করতে। জয়মন্টপ ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদৎ হোসেন জানান, টিপির আইডি কার্ড নেই বলে ভাতার কার্ড দিতে পারিনি। তবে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়।
