বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পথে আগাইয়া লইতে নিরলস কাজ করিয়াছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। মঙ্গাপীড়িত, দরিদ্র একটি দেশের অর্থনীতিকে টানিয়া তোলা সহজ কথা নহে। সেই কঠিন কাজটি তিনি করিয়াছেন এবং দেশ হইতে মঙ্গা দূরীকরণে অনন্য ভূমিকা রাখিয়াছেন তাহার বাজেটে লওয়া নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে। সহস্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নে সঠিক নীতিকৌশল গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে টিকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) বাস্তবায়নেও তিনি সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণে ব্রতী ছিলেন। তাহার কর্ম উদ্দীপনা, পরিশ্রম ও কাজকে ভালোবাসিবার প্রচণ্ড মোহ ছিল ঈর্ষণীয়। এ কথা স্বীকার করিতে হইবে যে, তাহার মতন নির্লোভ, সজ্জন মানুষ বিরল প্রজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই তাহাকে বুঝিয়াছিলেন বলিয়াই এমন একজন মানুষের হাতে অর্থনীতিকে পরিচালনা করিবার দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন।
বাংলাদেশের বাজেটের আকার বাড়াইয়া কর্মসংস্থানমুখী বাজেট প্রণয়নে তাহার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। অর্থমন্ত্রী হিসাবে ১২টি বাজেট পেশ করিয়াছেন তিনি। ২০০৯ সালে অর্থমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর টানা ১০টি বাজেট দিয়াছেন তিনি। অর্থনীতিকে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃচ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিবার শক্তি অর্জনে লইয়াছেন নানা পদক্ষেপ। সেই কারণেই বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করিয়াছিল। তাহার লওয়া পদক্ষেপের কারণেই মূলত করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ‘শক’ মোকাবিলার শক্তি অর্জন করিয়াছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি। অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসাবে বেসরকারি খাতকে আগাইয়া লইতে তাহার ব্যাপক উদ্যোগ ছিল। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সার্বভৌম বন্ড ছাড়িবার বিপক্ষে অবস্থান করিয়াছিলেন। যেই সার্বভৌম বন্ডের কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে আজ করুণ দশা। স্পষ্টবাদী আবুল মাল আবদুল মুহিত শুধু যে অর্থনীতি লইয়াই কাজকারবার করিতেন, তাহা নহে। তিনি সমাজ ও সংস্কৃতি লইয়াও ভাবিতেন। বই পড়িতেন, লিখিতেন। আলোকিত সিলেট গড়ার স্বপ্ন ছিল তাহার আমৃতু্য।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি জনমত গঠনে কাজ করিয়াছিলেন। স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশটি লইয়া বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের সারথি ছিলেন তিনি। সাধ্যমতন চেষ্টা করিয়াছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়িবার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবার জন্য। তাহার বাজেট বক্তৃতাগুলি ছিল স্পষ্ট। তিনি যেমন ছিলেন স্পষ্টবাদী। যাহা সঠিক মনে হইত, তাহাই তিনি করিতেন। তাহার ভাবনাচিন্তাও ছিল কলুষমুক্ত। সাবেক এই অর্থমন্ত্রী গত শুক্রবার রাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিয়াছেন। পরপারে ভালো থাকিবেন, বিদায়ের ক্ষণে ইহাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
