তৃতীয় বিশ্বে অনিশ্চয়তার শেষ থাকে না। তবে এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও একধরনের আপাতস্হিতিশীলতা রহিয়াছে। সেই স্হিতিশীলতা অনেকটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে বসবাস করিবার মতো। আগ্নেয়গিরি হইতে এককালে ভয়াবহ অগ্ন্যূৎপাত হইয়াছিল। উহার লাভা স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছিল চারিপাশ। অতঃপর উহা দিনে দিনে শীতল হইয়াছে, জ্বালামুখে একধরনের বাহ্যিক স্হিতিশীলতাও দেখা গিয়াছে। ঐখানে যাহারা বসবাস করিতেছেন, তাহারা জানেন উহা একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। যে কোনো সময় উহা পুনরায় জীবন্ত হইয়া উঠিতে পারে। তখন উহার উত্তপ্ত ভয়াবহ লাভা স্রোতের তোড়ে ভাসিয়া যাইতে পারে সাজানো সকল কিছু; কিন্তু ইংরেজি প্রবাদের মতো যখন অবস্হা হয় ‘সিটিং ওন এ লাইভ ভলকানো’, তখন এই তকদিরকে মানিয়া লইয়াই ঐখানে বসবাস করিতে হয়। সান্ত্বনার মতো মনে হইতে পারে, এখনই হয়তো সেইখানে অগ্ন্যূৎপাত হইবে না; কিন্তু ইহাও নির্মম সত্য, যে কোনো সময় সুপ্ত আগ্নেয়গিরি জীবন্ত হইয়া উঠিতে পারে। উহাই আগ্নেয়গিরির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
তবে ইহার মধ্যে আরো কিছু ব্যাপার রহিয়াছে। যদি এইরকম হয় যে, ঐ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে বসিয়া একটি অপকর্মকারী গোষ্ঠী দিনরাত খোঁচাখুঁচি করিতেছে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ! সেই ক্ষেত্রে যেই পর্দা বা আবরণ শীতল হইয়া ঐ জ্বালামুখটিকে বন্ধ রাখিয়াছে, আগ্নেয়গিরিকে জীবন্ত হইতে বাধা দিতেছে, সেই পর্দা বা আবরণ নষ্ট হইয়া যাইতে পারে। তাহাতে ত্বরান্বিত হইতে পারে আগ্নেয়গিরির নূতন করিয়া জাগিয়া উঠিবার সময়। স্পষ্টতই, যাহারা এইভাবে জ্বালামুখের উপর খোঁচাখুঁচি করেন, তাহাদের থামানো না গেলে দুর্ঘটনা ঘটিবেই। দুর্ঘটনা না ঘটাই অস্বাভাবিক; কিন্তু যিনি জ্বালামুখের পাহারাদার, যিনি উন্নতির কারিগর—তিনি কেন তাহার চারিপাশে এই সকল অপকীর্তিকারীদের প্রতিহত করেন না? নিশ্চয়ই তিনি চাহেন না নূতন করিয়া আগুন উদগীরণ হউক, লাভা স্রোতে ভাসিয়া যাউক সাজানো সংসার; কিন্তু যাহারা খোঁচাখুঁচি করিতেছেন, সকল ক্ষেত্রে উত্তাপ দেখাইতেছেন, হেন অপকীর্তি নাই তাহারা করিতেছেন না—তাহাদের ক্ষমতার উত্স তো উন্নতির কারিগর স্বয়ং। ইহাই সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডি। উন্নতির কারিগর যেন নিঃসীমভাবে অসহায়! তিনি যেন এক নিঃসঙ্গ শেরপা! কেহ তাহাকে ধারণ করেন না, কেহ তাহাকে রক্ষার জন্য থাকিবেন না!
আমরা হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু বিশাল মহিরুহ দেখিতে পাই যাহার চারিদিকে আগাছায় ভরা। সেই সকল আগাছা বাড়িয়া উঠিয়াছে ঐ মহিরুহকেই আশ্রয় করিয়া এবং প্রতিনিয়ত তাহার রস-পুষ্টি শুষিয়া লইয়া আগাছাগুলি ঝাড়বংশে বাড়িয়া উঠিয়াছে। একসময় দেখা যায় ঐ মহিরুহকে আগাছাগুলি চারিদিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। মহিরুহর চাইতে তখন আগাছারই দাপট অধিক হইয়া উঠে। মহিরুহ তখন অসহায়! সময় থাকিতে আগাছা নিমূর্ল করা না হইলে মহিরুহই একসময় নিঃশেষ হইয়া যাইবে—ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। অথচ মহিরুহই অরণ্যের শ্রীবৃদ্ধির কারিগর—তাহার কোনো খুঁত নাই, দোষ নাই। এই সকল আগাছা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির জন্য সবচাইতে বড় সমস্যা। ইহারা সর্বগ্রাসী। ঢুকিয়া পড়ে সকল কিছুর মধ্যে। এবং স্বাভাবিক ও সাধারণ বৃক্ষগুলি এই আগাছার কার্যকলাপ ও সীমা লঙ্ঘনের বাড়াবাড়িতে যাহার পর নাই বিরক্ত। এবং আগাছাগুলি যেহেতু মহিরুহের শক্তিতে বলীয়ান, সেই কারণে সকলের রাগ ও ক্ষোভ পর্যবসিত হয় ঐ মহিরুহের উপরই।
কথায় আছে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। সময় থাকিতে ব্যবস্হা না লইলে যাহা হইবার তাহাই হইবে। লালন ফকির যেমন বলিয়াছেন—‘সময় গেলে সাধন হবে না’। জগতের নিয়মে সকলেই একদিন চলিয়া যাইতে হইবে বটে; কিন্তু কেহ যদি ইতিহাসের নিকট প্রশ্নচিহ্ন রাখিয়া যান—অনেক ভালো ভালো কাজ করা সত্ত্বেও—তাহা হইলে তাহা হইবে অত্যন্ত দুঃখজনক। সময় থাকিতে ইহা অনুধাবন করা জরুরি।
