ইউক্রেনে বেসামরিক লোকদের জীবন বাঁচাতে আশু করণীয়

আপডেট : ০৬ মে ২০২২, ০৩:১৬

ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ মারিউপোল শহর রাশিয়ান সেনাবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখানকার আজভস্টালের বড় বড় ইস্পাত কারখানার ভূগর্ভস্হ কমপাউন্ডগুলোতে কমপক্ষে ১ হাজার শিশু, নারী ও বৃদ্ধ আটকে আছে। প্রায় দুই মাস ধরে তারা সেখান থেকে বের হতে পারছে না। যাতে রুশ সেনাদের গোলাগুলির কবলে না পড়ে, এজন্য তারা সেখানে আত্মগোপন করে আছে। তারা দুই মাস ধরে সেখানে দিনের আলো দেখতে পারেনি। তাদের জীবন রক্ষার জন্য এখন খাবার ও পানীয় নেই বললেই চলে।

বেশ কিছুদিন আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শহরের এই অংশকে ঝড়ের গতিতে দখল এবং এটি অবরোধ করার আদেশ দেন। এ সময় তিনি বলেছিলেন, একটি মাছিও যেন সেখান থেকে উড়ে যেতে না পারে। অর্থাত্, তিনি সেখানকার মানুষকে অনাহারে মেরে ফেলতে চান। তাছাড়া তিনি এই আদেশ দিয়েছিলেন টেলিভিশনে, যাতে আমরা এটি দেখতে পারি এবং এর কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে বাস্তবে আমরা এই ভয়ানক অপরাধের সহযোগী হয়ে যাই।

তবে এখনো সময় আছে, আমরা এর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি এবং এই লোকদের এমন ভয়ানক মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারি। আমেরিকা ও অন্যান্য ন্যাটো দেশ খাদ্য, পানীয় ও ওষুধের মতো মানবিক সাহাঘ্যসামগ্রী নিয়ে এই অঞ্চলে অবিলম্বে একটি এয়ারলিফ্ট চালু করতে পারে—এই লোকদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু আমাদের করা উচিত।

১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে এর একটি নজির দেখা যায়, যখন সোভিয়েতরা পশ্চিম বার্লিন অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, এই অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে তাদের দখলে চলে যায়। এখনকার মারিউপোলের মতো সেই শহরের মানুষও অবরোধের কারণে ছিল ক্ষুধার্ত। কিন্তু আমেরিকা ও ব্রিটেন তাদের না খেয়ে মরতে দেয়নি। ১১ মাস ধরে তাদের বিমানগুলো শহরের মানুষের বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু সরবরাহ করেছিল। এ সময় তাদের সোভিয়েত সৈন্যদের দখলকৃত অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়তে হয়েছিল। নাত্সি জার্মানির বিরুদ্ধে জয়লাভের পর সোভিয়েত সেনাবাহিনী বিজয়ী হয়। তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে। বর্তমান রাশিয়ান সেনাবাহিনীর তুলনায় সব ক্ষেত্রেই তারা ছিল অনেক শক্তিশালী। তবু তারা সেই সময় আমেরিকান প্লেনগুলো স্পর্শ করার সাহস করেনি। এই বিমানগুলো নিয়মিতভাবে বার্লিনের অধিবাসীকে সহায়তা প্রদান করে। এ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত সোভিয়েতদের পিছু হটতে হয়েছিল এবং তারা অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানে মারিউপোলেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। এটা প্রায় নিশ্চিত যে রুশ সেনাবাহিনী আমেরিকার কোনো বিমান বা হেলিকপ্টার স্পর্শ করার সাহস করবে না। এবং ঈশ্বর না করুন, তাদের মধ্যে অন্তত একজনকে যদি গুলি করা হয়, তবে ন্যাটো বাহিনী কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে সমস্ত রাশিয়ান বিমান ও বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করতে সক্ষম হবে।

এমন ঘটনা এটিই প্রথম নয়, এ ধরনের আরো দৃষ্টান্ত রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া যখন তাদের আক্রমণ করেছিল, তখন অন্য দেশের ভূখণ্ডে বিমানগুলোকে গুলি করে ভূপাতিত করাকে কখনোই পূর্ব ও পশ্চিম বিশ্বের মধ্যে যুদ্ধের কাজ বলে মনে করা হয়নি এবং পরে এর জের ধরে কোনো করুণ পরিণতিও ঘটেনি। কোরিয়া যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। এমনকি ভিয়েতনামেও এমনটিই ঘটেছিল। সাম্প্রতিককালে এটি সিরিয়া যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ঘটেছে, যখন তুরস্ক একটি রাশিয়ান জেট বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করেছিল এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কিছুই হয়নি। ইউক্রেনীয় আকাশ রক্ষা করতে অস্বীকার করার মাধ্যমে আমরা আসলে স্বেচ্ছায় আমাদের জন্য কয়েক দশক ধরে স্বীকৃত অধিকার ত্যাগ করেছি। এখানে আবার একইভাবে রাশিয়ার ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটছে।

ইউক্রেনের আকাশ রক্ষা না করার কারণ কী? এর ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, এতে সংঘাত আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এমনকি এতে তৃতীয় বিশ্বের সূত্রপাত হওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের নিষ্ক্রিয়তার এই প্রভাব ঠিক উলটো ফল বয়ে আনছে। আমাদের পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়ায় এবং শুভেচ্ছার অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করায় রাশিয়া ও এর মতো দেশগুলো আরো বেপরোয়া আচরণ করছে। আমাদের ভূমিকা তাদের নৃশংসতায় কোনো বাধা হয়ে উঠছে না। এই দেশগুলো তাদের জন্য অনুমোদিত সীমার মধ্যে যা করতে পারে তা-ই করছে, অর্থাত্ এখানে তারা আমাদের পক্ষ থেকে কোনো গুরুতর প্রতিক্রিয়া আশা করছে না। আমাদের নিষ্ক্রিয়তা ও শত্রুরার ধরন আমাদের কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া আশা করে, তা থেকে বিরত থাকায় বিষয়টি সরাসরি সংঘাত বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ এইরূপ হামলার অনুমোদন দেওয়া হলে তার সীমানা প্রসারিত হবেই, যা অনিবার্যভাবে আরো নৃশংসতা ডেকে আনবে।

স্বেচ্ছায়, প্রকাশ্যে ও পূর্বপ্রস্ত্ততিমূলকভাবে এমন কিছু করতে অস্বীকার করার মাধ্যমে আমরা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছি রাশিয়ার সীমান্ত এলাকা। রাশিয়া আমাদের কাছ থেকে যা আশা করতে পারে, তাতেই আমরা সায় দিয়েছি, যেমন ন্যাটো সৈন্যরা কখনোই ইউক্রেনকে তার ভূখণ্ডে রক্ষা করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছি বা আমাদের বিমান কখনোই ইউক্রেনের ওপর নো ফ্লাই জোন স্হাপন করবে না বলে উল্লেখ করেছি। এইভাবে এই সংঘাত বৃদ্ধিতে আমরা অবদান রেখে চলেছি। আমাদের স্বীকৃত বিশেষত্ব থেকে আমাদের স্বেচ্ছায় পশ্চাদপসরণ রাশিয়াকে তার সীমানা এতটাই প্রসারিত করে দিয়েছে যে, এটি শেষ সীমান্তে পৌঁছে গেছে এবং পুরো বিশ্বকে এখন পারমাণবিক বিপর্যয়ের হুমকি দিচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রতিক্রিয়া হতে পারে এমন, যাতে অবিলম্বে রাশিয়ার অনুমোদিত সীমানা সংকুচিত হয় এবং এটিকে তার পূর্ববর্তী সীমানায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটা কোনো প্রকার প্ররোচনা, আলোচনা ও চুক্তির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি শুধু আমাদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তমূলক, চিন্তাশীল এবং সুনির্দিষ্ট কর্ম দ্বারা অর্জন করা যেতে পারে। আমাদের বিমান বাহিনীর সহায়তায় আজভস্টালে আটকে পড়া লোকদের মানবিক সহায়তা প্রদান করা হতে পারে আমাদের প্রথম অধিকার, ছোট হলেও এই পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা উচিত। এ ধরনের পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে তাদের এই যুদ্ধবিধস্ত অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং মারিউপোল ও অন্যান্য অবরুদ্ধ শহর থেকে বেসামরিক লোকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের বিমান ও বিমান প্রতিরক্ষার সহায়তায় মানবিক করিডরের ব্যবস্হা করা।

লেখক: হুভার ইনস্টিটিউশনের সাবেক ভিজিটিং ফেলো, বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মী

দ্য ওয়াশিংটন টাইমস থেকে অনূদিত 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি