শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দানবীর রায়বাহাদুর রণদা প্রসাদ সাহার অপহরণ দিবসে

আপডেট : ০৭ মে ২০২২, ০৬:৩১

আজ ৭ই মে। শহিদ দানবীর রায় বাহাদুর রণদা প্রসাদ সাহা (আর পি সাহা) ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র শহিদ ভবানী প্রসাদ সাহার ৫২তম অপহরণ দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার কতৃ‌র্ক কুমুদিনীর প্রধান কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জ থেকে রাত সাড়ে এগারটায় অপহৃত হন। 

তাঁদের সঙ্গে আরো অপহৃত হন আর পি সাহার বন্ধু গৌর সাহা, দারোয়ান মোয়াজেম, কর্মচারী রাখাল ও মতলব। তাঁরা কেউ আর ফিরে আসেননি। সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা সম্পর্কে রোমা রোঁলা বলেছিলেন ‘এই মৃতু্য তাঁর প্রাপ্য ছিল না। মানুষ ও মানবতার ত্রাণের জন্য যাঁর আবির্ভাব, এমন নৃশংসভাবে তাঁর তিরোধান ঘটানো একমাত্র মনুষ্য নামের অনুপযুক্ত বর্বরদের পক্ষে সম্ভব।’ 

আর পি সাহা সম্পর্কে ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা, ভাষাসৈনিক ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন, ‘ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃতু্য যিশুর যেমন প্রাপ্য ছিল না, তেমনি আর পি সাহা সম্পর্কেও বলতে হয়, বর্বর পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা অপহূত হয়ে এই মৃতু্য তাঁর প্রাপ্য ছিল না। তাঁকে যারা হত্যা করেছে তারা পৃথিবীর আদিমতম হিংস্র জন্তুদের চেয়েও ঘৃণ্য প্রাণী।’ 

এখানে উল্লেখ্য যে, আর পি সাহা ও পুত্র ভবানী প্রসাদকে ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল তত্কালীন আর্মির হেড কোয়ার্টার ঢাকার লাটভবনে আটক করা হয়। ৫ই মে তাঁরা ছাড়া পান। আমার ধারণা, আর পি সাহা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তিনি পাকিস্তানের শত্রু নন। কারণ পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা এবং আইয়ুব খান তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। ইস্কান্দার মির্জার নামে পাকিস্তানের পেশায়ারে ইস্কান্দার মির্জা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ইস্কান্দার মির্জা তাঁকে পাকিস্তানের ‘হাতেম তাই’ নামে ভূষিত করেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ খেতাব ‘হেলালে পাকিস্তান’-এ ভূষিত করেন। 

আইয়ুব খানের মায়ের নামেও পাকিস্তানের হাজেরা জেলায় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন আর পি সাহা। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম টার্গেট ছিল এ দেশের সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, তাই আমরা দেখি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ অর্থাত্ অপারেশন সার্চ লাইটের প্রথম রাতেই হানাদার বাহিনী হত্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন দার্শনিক অধ্যাপক ড. জি সি দেব, ইংরেজির অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যসহ জগন্নাথ হলের ৩৬ জন ছাত্রকে। 

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ ভাষাসৈনিক, সমাজসেবক ও আইনজীবী ধীরেন্দ্র্রনাথ দত্ত এবং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলীপ দত্তকে, ৪ঠা এপ্রিল প্রখ্যাত আয়ূর্বেদ শাস্ত্রবিশারদ এবং শিক্ষাবিদ অধ্যাপক যোগেশ চন্দ্র ঘোষকে এবং ১২ই এপ্রিল চট্টগ্রামের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজসেবক নূতন চন্দ্র সিংহকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আর পি সাহা যে হানাদার বাহিনীর পরবর্তী টাগের্ট, এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। তাই অনেক হিতৈষী ও শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে দেশ ত্যাগের পরামর্শ দেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক আর পি সাহা কুমুদিনী পরিবারের সবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মাতৃভূমি ছেড়ে যাননি। 

১৯৭১ সালের ৩রা এপ্রিল মেজর আইয়ুবের নেতৃত্বে পাকবাহিনী ঘাঁটি গাড়ে মির্জাপুরে। সেইসঙ্গে গড়ে তোলে তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর বাহিনী। তারা মির্জাপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এ সময় মওলানা ওয়াদুদ ছিল শান্তিবাহিনীর প্রধান আর দুই ছেলে ছিল তার সহযোগী। আর পি সাহা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী কমপ্লেক্স ছিল তাদের কুনজরে। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই আর পি সাহার সঙ্গে মওলানা ওয়াদুদের আদর্শগত দ্বন্দ্ব ছিল। সবসময়ই আর পি সাহার জনহিতকর কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত। রণদা প্রসাদ সাহা দেশদ্রোহী, ভারতীয় দালাল এই অপপ্রচারে সবসময় সোচ্চার ছিল। অথচ সর্বোচ্চ প্রশাসন সন্দেহবশত পরিদর্শনে এসেও কোনো প্রমাণ পায়নি, বরং তাঁর কাজে সন্তুষ্টি হয়ে প্রশংসা করে সহযোগিতা করে গেছে। ঘনিয়ে এলো কুমুদিনী পরিবারের সেই বেদনাদায়ক দিন—৭ই মে। 

ঐদিন ঠিক দুপুর দেড়টায় পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের সঙ্গে নিয়ে মির্জাপুরের নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন এবং গণহত্যা চালায়। ঐদিন মির্জাপুরে ৫৯ জন শহিদ হন। তারা খোঁজে আর পি সাহাকে। জেনে যায় ঐদিন আর পি সাহা ও পুত্র ভবানী প্রসাদ মির্জাপুর থেকে কুমুদিনীর প্রধান কার্যালয়, নারায়ণগঞ্জে এসেছেন। আনুমানিক রাত সাড়ে এগারোটায় আর পি সাহা, পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাসহ আরো চারজন অপহূত হন। তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ৭ই মে মির্জাপুরে প্রতিবছর গণহত্যা দিবস পালন করা হয়। 

দেরিতে হলেও বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আর পি সাহা ও তার পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহার হত্যার বিচার করেছেন। বিচারে রাজাকার ওয়াদুদের কনিষ্ঠ পুত্র মাহবুবুর রহমানের ফাঁসি হয়। তবে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগেই জেলখানায় মৃতু্য হয় তার। প্রধান আসামী মওলানা ওয়াদুদকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তিবাহিনী হত্যা করে। আরেক আসামি মওলানা ওয়াদুদের জ্যেষ্ঠপুত্রের বিচারকাজ পরিচালনার আগেই স্বাভাবিক মৃতু্য হয়। বাংলাদেশ সরকার আর পি সাহাকে শহিদ বুদ্ধিজীবীর মর্যাদাদান করে। 

১৯৭৭ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার রণদা প্রসাদ সাহাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে ১৯৮২ সালে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ শহিদ সিরিজে রণদা প্রসাদ সাহা স্মরণে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। আর পি সাহাকে ১৯৯৭ সালে মরোণোত্তর ইব্রাহিম স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় এবং ২০০৭ সালে সমাজসেবায় মরোণোত্তর অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় তাঁকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার মন্বন্তরে আর পি সাহা বিপন্ন মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। তাই দিল্লির গভর্নর তাঁকে রায়বাহাদুর খেতাব প্রদান করেন। 

১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার গভর্নরের আবেদনে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশ রেডক্রসকে ২,৫০০০০ রুপি সাহাঘ্য প্রদান করেন তিনি। আর পি সাহা স্হাপিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান— ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী হাসপাতাল, কুমুদিনী মহিলা কলেজ, মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ, মাগুরার সোহরাওয়ার্দী কলেজ, যশোরের কারমাইকেল কলেজ, বরিশালে শহীদ আলতাব হোসেন মেমোরিয়াল স্কুল। 

বর্তমান ব্যবস্হাপনা পরিচালক আর পি সাহার সুযোগ্য পৌত্র বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী রাজীব প্রসাদ সাহা কুমুদিনীর ব্যাপক সম্প্রসারণ করেন। কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রফট, কুমুদিনী ট্রেড ট্রেনিং স্কুল, কুমুদিনী ফার্মাসিডিক্যাল, কুমুদিনী মহিলা মেডিক্যাল কলেজ এবং এর ডেন্টাল ইউনিট, রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমুদিনী নার্সিং কলেজ, কুমুদিনী মেডিক্যাল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, কুমুদিনী পোস্ট গ্রাজুয়েট নার্সিং ইনস্টিটিউট, কুমুদিনী আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল সাইন্স এবং ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কুমুদিনী আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল কুমুদিনী পরিবারের নতুন সংযোজন। মৃতু্য দানবীর রায়বাহাদুর রণদা প্রসাদ সাহাকে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং তাঁর মহান অক্ষয় কৃতি তাঁকে দান করেছে অমরত্ব। কুমুদিনীর মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্ত কাল। 

লেখক: উপাচার্য, রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যাল 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

অশ্রুসিক্ত স্মৃতি তর্পণ 

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না

ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তিনি বারবার ফিরে আসবেন