বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সালমা যেন কোটি মায়ের কণ্ঠধ্বনি!

আপডেট : ০৮ মে ২০২২, ০৩:২০

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার/কেহ নাহি দিবে অধিকার/হে বিধাতা? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মনু মহারাজ তার ‘মনুসংহিতা’ শাস্ত্রগ্রন্থে এমন বিধান লিখে রেখেছিলেন যে, ‘মেয়ে মানুষেরা কখনো স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে না; তারা বাল্যকালে পিতার অধীনে থাকবে, যৌবনে স্বামীর অধীনে ও বার্ধক্যে পুত্রের।’ প্রাচীন সেই সমাজবিধাতা মনু মহারাজের কথা বর্তমানে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কবিগুরুর ‘অধিকার নাহি দিবে’র প্রশ্নের উত্তরও এখন খুঁজে পাওয়া গেছে। ঈশ্বর প্রদত্ত বটম লাইনিং মা-ই এর উত্তর। নারী জাতের মা-ই এনেছে অধিকার। ভেঙেছে মনু মহারাজের বিধান লিপি।

সকাল ৯টা। একটা রুটি এক পেয়ালা তরকারি, শসা, পেঁয়াজ ও একটা ডিম সামনে নিয়ে ডায়বেটিক রুটিনের নাশতা খাচ্ছিলাম। ফোন বেজে উঠল। তাকিয়ে দেখলাম সালমা, মুজিবনগর। প্রায় এক বছর ওর সঙ্গে কথা হয় না। ঈদের আগে দু-তিন বার ফোন করলাম। ওর স্বামী রাজু ব্যস্ততার মধ্যে বলে, বাড়ি গিয়ে ওকে দিব। রাজুও জানে, আমি সালমার সঙ্গেই কথা বলি। বেশ কয়েক দিন ফিরতি ফোন না পেয়ে খারাপই লাগছিল। তাই ফোন দেখে ধরেই কই, তুমি তো আমার কথা ভুলে গিয়েছ? না স্যার, আপনার করোনা-স্ট্রোক-হাসপাতাল-আইসিইউ ইত্যাদির কথা শোনা থেকে এক বছর যোগাযোগ তো সরাসরি করিনি। এখন কেমন আছেন? হ্যাঁ, সেজন্যই তো তোমাদের দোয়ায় ও আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে আছি। জানেন, আমি কী করেছি, গরিবদেরকে চাল দিয়েছি, দানখয়রাত, দোয়া পড়াইছি। স্যার, ঘরের ছাদ দিয়েছি।

আবেগের সঙ্গে আমিও প্রশ্ন করলাম, কি পিলারের ওপরে? হ্যাঁ স্যার, পিলার-ওয়ালের ওপর ছাদ দিয়েছি। আমার ঘরের যে টিন ছিল, তা আমার বাপ-মার ঘরে দিয়েছি। ২০টি গরু-মহিষ রাখার পাকা গোয়ালঘর করেছি, একটা মহিষ বিক্রি করেছি। এখনো দুটি গরু গোয়ালে আছে। দম নিয়ে বলে, নগদ টাকা দিলে কিছুই হতো না। ছেলেটা ক্লাস সিক্সে পড়ে। মেয়েটা ক্লাস টুতে পড়ে। আপনাকে কেমনে ভুলি। আপনি তো আমাদের নিঃশ্বাসের মধ্যেই আছেন। উচ্ছ্বাসে একটানা বলেই যাচ্ছে। থামাতে চেষ্টা করলাম এই বলে যে, ঠিক আছে। তোমার, ছেলেমেয়ের শরীরস্বাস্থ্য কেমন আছে? রাজু কী করে? হেসে হেসে বলল, ওরা ভালো আছে। সাহেব গরু বেচাকেনার ব্যবসা করে। স্যার, আয়ুব চেয়ারম্যান এই নিয়ে তিন বার চেয়ারম্যান হলেন। মন্ত্রী স্যার (জনাব ফরহাদ হোসেন), উপজেলা মহিলা কর্মকর্তা আমার খোঁজখবর নেন। আপনি আমাদের ডাকেন। সব মাকে ডাকেন। আমরা নিজের টাকায় সবাই আসব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করব। মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত সব মাকে স্বপ্ন প্যাকেজ আওতায় আনার জন্য আবেদন করব। দোয়া করব, আল্লাহ তাকে আরো দীর্ঘজীবী করবেন।

সালমা আরো বলে যাচ্ছে আর যাচ্ছে, আমাকে কথা বলার সুযোগ দিতে চায় না। আবেগে খুশিতে মুক্তির আস্বাদন পেয়ে স্বপ্ন মা সালমা যেন বিশ্ব মা দিবসকে ভাগাভাগি করে নিতে চায়। এ ফাঁকে আমি জানালাম, অভিনন্দন জানাই মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে মাতৃত্বকালীন ভাতা ৮০০ টাকার থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করায়। সাতটি শর্তসহ প্রায় ১০ লাখ মা প্রতি বছর এ ভাতা পায়। সরকারের পাইলট স্বপ্ন প্যাকেজপ্রাপ্ত ৭০০ মায়ের মধ্যে সালমা অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ সরকারের জন্মভূমি মুজিবনগর—সালমা যেন কোটি মায়ের কণ্ঠধ্বনি। মুক্তির উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। মুক্তির পুরোধা মুজিবনগরের মুক্ত সালমা, জাতির পিতার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ার নন্দিতা মণ্ডল, সোয়াবিন জেলা লক্ষ্মীপুরের ফাতেমা, নদীভাঙা দৌলতখাসহ পাইলট ১০ উপজেলার মিনারারা এখন মনু মহারাজের বিধিলিপি ভেঙে চুরমার করে স্থানীয় সরকারের অংশী হয়ে অধিকার আদায়ের দরজায় পৌঁছে গেছে। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়: চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল...ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত, আমরা আনিব রাঙা প্রভাত...।

২০০৫ সালে বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষ্যে গরিব মাদের মাতৃত্বকালীন ভাতা যাত্রা। ২০০৭-০৮ সালে সরকারিকরণ। ২০০৯ জেন্ডারভিত্তিক ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কর্মসূচি স্পেনের মহামান্য রানি সোফিয়ার সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ১ হাজার মাকে নিয়ে স্প্যানিশ সংস্থা AECID-এর সহযোগিতায় ডর্প বাস্তবায়ন করেছে। ২০১৪, স্বপ্ন মা শেখ হাসিনার সরকার সর্বদিকে অবয়ব বাড়িয়ে বাজেটে ৭০০ মা নিয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক— যেমন: বাংলাদেশের জন্মস্থান মুজিবনগর, জাতির পিতার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়া, মাননীয় স্পিকারের পৈতৃক ভূমি চাটখিল, উপকূলীয় নদীভাঙা দৌলত খাঁ, মঙ্গা এলাকা উলিপুর, চা-শ্রমিক এলাকা শ্রীমঙ্গল, স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর স্বেচ্ছাশ্রম—উত্পাদন ও উন্নয়ন স্বপ্নের প্রথম ডাকের চরগ্রাম রামগতিসহ ১০ উপজেলায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পাইলট কার্যক্রম পরিচালনা করে। ডর্প-এর বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

স্বপ্ন প্যাকেজ সফলতা: সরকারও জিতুন, মা সরকারও জিতুন:
১. স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্ড পাইলট আকারে চালু হলো।
২. শিক্ষা ও বিনোদন কার্ড পাইলট আকারে চালু হলো।
৩. বসতঘর, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের নিশ্চয়তা।
৪. কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির নিশ্চয়তা।
৫. পরিবেশ, সঞ্চয় ও উন্নয়ন ঋণের নিশ্চয়তা।
৬. পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ (কোনো পরিবারে দুই সন্তানের বেশি নাই)।
৭. সব মা সন্তানকে বুকের দুধ পান করিয়েছে।
৮. গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ নিশ্চিত হয়।
৯. জন্ম ও বিবাহনিবন্ধন নিশ্চিত হয়। 
১০. মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত হয়।
১১. মা ও শিশুমৃত্যু হ্রাস পায়।
১২. সমাজে মায়েদের মর্যাদা বাড়ে।
১৩. পারিবারিক সিদ্ধান্তে মা-ও অংশীদারত্ব পায়।
১৪. কোনো প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়নি।
১৫. নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে।
১৬. শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামীর কাছে গর্ভবতী মায়ের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আরো অনেক। সর্বোপরি দারিদ্র্যমুক্ত একটি পরিবার তথা দেশ বিনির্মাণ হলো।

প্রয়োজন: মাতৃত্বকালীন ভাতাকেন্দ্রিক স্বপ্ন প্যাকেজ ধাপে ধাপে সারা দেশে চালু করা।
১. মা প্রতি এককালীন বরাদ্দ দেড় লাখ টাকা। (২০০৯ সালে ছিল, One Mother One Lac Taka).
২. মাতৃত্বকালীন ভাতা তিন বছরের স্থলে পাঁচ বছর করা, যাতে শিশুরা সরকারের তথ্যভান্ডার-ভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভর্তি হবে। ঝরে পড়া বা স্কুলে যায় না এমন থাকবে না।
৩. ভাতার পরিমাণ মাসে ১ হাজার টাকার স্থলে পোশাকশ্রমিক নিম্নতম মজুরি হারে ৮ হাজার টাকা করা।
৪. দীর্ঘ ২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদে ১ কোটি মাকে টার্গেটে এনে বাজেট বরাদ্দ করে SDG'র গরিবি হটানোর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো। আমরা একটা ফুটফুটে শিশু চাই, প্রসববেদনা নিতে চাই না। তা হয় না।
৫. দুর্যোগ ও ঝুঁকি সুরক্ষা করা।

যেখানে কেউ:
১. স্বাস্থ্য পুষ্টিহীন থাকবে না।
২. শিক্ষাহীন থাকবে না।
৩. ঘরহীন থাকবে না।
৪ কর্মসংস্থানহীন থাকবে না।
৫. পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর থাকবে না, সঞ্চয়হীন থাকবে না। আল্লাহ সহায় হউন।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, ডর্প

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

অশ্রুসিক্ত স্মৃতি তর্পণ 

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না

ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তিনি বারবার ফিরে আসবেন