শনিবার, ২১ মে ২০২২, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ‘স্টেপ ইন’ বাড়ি নিয়ে কিছু কথা

আপডেট : ১১ মে ২০২২, ১০:০৯

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত, তখন ঢাকা শহরের একটি বাড়ি আমাদের কাছে যে কোনো তীর্থক্ষেত্রের সমান মর্যাদাসম্পন্ন এবং দুর্নিবার আকর্ষণীয় মনে হতো। বাড়িটির নাম ‘স্টেপ ইন’।

টিপু সুলতান রোড (যার সাবেক নাম মদন মোহন বসাক লেন)-এর শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই বাড়িটির মালিক ছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি প্রখ্যাত জননেতা জনাব আবদুল জলিল। বাড়িটির নামকরণের মধ্য দিয়ে মালিকের স্নিগ্ধ রুচিশীল চরিত্র ও আজন্মলালিত অতিথিপরায়ণ মানসিকতার চমত্কার ছবি প্রতিফলিত হয়। তার প্রয়াণে এই তীর্থভূমিকে স্মরণীয় করে রাখতে তার স্ত্রী বেগম জায়নাব আকতার বাড়ির নামে নাম রেখে ‘স্টেপ ইন’ স্মারক গ্রন্থখানি রচনা করেছেন।

সাতচল্লিশে ভারত বিভাগের সময়কাল থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত এ দেশের প্রায় সব আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিরোধীদলীয় রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ‘স্টেপ ইন’ বাড়িটির ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং মালিকের আপসহীন জীবনাল্লেখ্য বইটির মূল উপজীব্য। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অনাচার, অত্যাচার ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে যারা প্রথম প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ঝড় তুলেছিলেন এবং কীভাবে তুলেছিলেন—সে কথা বিশ্বস্ততার সঙ্গে এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। আরো তুলে ধরা হয়েছে সেই দিনগুলিতে কীভাবে এখানে আশ্রয় পেয়েছেন সে যুগের বিদ্রোহী বীর সেনানীরা।

বিশেষ করে, বামপম্হি প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের কাছে এই বাড়ি এবং বাড়িটির মালিক-দম্পতি ছিলেন পরম ভরসাস্হল। তাই আমরা দেখতে পাই, অচিরেই মুসলিম লীগ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে বাড়িটি। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ বিরাট এক নোট লিখে বাড়িটি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া যখন প্রায় পাকাপোক্ত করে ফেলেন, তখন ভাগ্যক্রমে তিনি বদলি হয়ে যান এবং তত্স্হলে নিয়াজ মোহাম্মদ খান দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন। তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ গুণগ্রাহী ও অনুরক্ত। বইখানির অনেক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সে যুগের দিকপাল নেতৃবৃন্দ খোকা রায়, অনিল মুখার্জী, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ বাড়িটিতে মিলিত হতেন এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন।

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঢাকায় এলে সাধারণত এই বাড়িতেই থাকতেন এবং পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী লীগের কমিটি মিটিংগুলি করতেন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে যখন তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করলেন তখন ‘স্টেপ ইন’ ছিল সেই নবযাত্রার Launching Pad। এমনকি ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের সমস্ত পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিও রচিত হয় এখান থেকেই।

তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, প্রচণ্ড প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সব অনুরোধ উপেক্ষা করে ‘স্টেপ ইন’-এর কর্তা জনাব এম এ জলিল নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন এবং মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ন্যাপ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেই থেকে ন্যাপের মহানগর কমিটির সভাপতি ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক তিনি। এরপর বারবার ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ‘স্টেপ ইন’-এ অনুষ্ঠিত হয়েছে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ অনেক সভা এবং গৃহীত হয়েছে যুগান্তকারী অনেক সিদ্ধান্ত। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ষাটের দশকের মধ্যভাগে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির অভ্যন্তরে নীতিগত প্রশ্নে আবার বিভেদের বিষয়টি। ততদিনে বিশ্বপরিসরে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে শুরু হয়ে গেছে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও মেরুকরণের (Polarization) প্রচণ্ড লড়াই।

আফ্রোএশিয়া, লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে জাতীয় মুক্তির পক্ষে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া পাশে এসে দাঁড়াবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করে এ দেশগুলিতে অ-ধনতান্ত্রিক বিকাশের (Non-Capitalst Develpoment)-এর পথ ধরে বিশ্ব পুঁজিবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদকে ঘায়েল করবে—তা নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দুই মোড়ল চীন ও রাশিয়া দুই মেরুতে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। চীন প্রথমোক্ত চিন্তাধারার অনুসারী, রাশিয়া দ্বিতীয় চিন্তাধারার। মওলানা ভাসানী নিজে কমিউনিস্ট না হয়েও তার আজীবনের সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে প্রথমোক্ত ধারার নৈতিক মিল খুঁজে পান।

ফলত ন্যাপের দৈনন্দিন কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়তে থাকে। অবশেষে ন্যাপ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে একটি বিকল্প সংগঠন দাঁড়ায়। এই বিভক্তির প্রক্রিয়ায় ‘স্টেপ ইন’-এর মালিক তার সবটুকু শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে মওলানা ভাসানীর পাশে দাঁড়ান। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, গ্রন্থখানির কোথায়ও এই বিপর্যয়ের বিষয়ে তেমন উল্লেখ নেই। হয়তো অনবধানতাবশত অথবা গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিষয়টি বাদ গিয়ে থাকবে। এর পরের জাতীয় রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ ও সমকালীন পরিস্থিতি নিয়ে গ্রন্থাকার সুনিপুণভাবে মওলানা ভাসানী, ন্যাপ ও ‘স্টেপ ইন’-এর ভূমিকা বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার প্রাকপ্রস্তুতি, সত্তরের জাতীয় নির্বাচন, ৬-দফা ও ১১-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও শেখ মুজিবের বন্দিদশা, ক্যান্টনমেন্টের প্রাচীর ভেঙে তাকে মুক্ত করে আনার লক্ষ্যে মওলানা ভাসানীর হুংকার, ১৯৬৯ সালের ৬ ডিসেম্বর তার নেতৃত্বে লাখো জনতার লাটভবন ঘেরাও, অবশেষে মুজিবের মুক্তি ও গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইসু্যতে ন্যাপ ও মওলানা ভাসানী সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ‘স্টেপ ইন’-এর গোপন ও প্রকাশ্য সভাগুলি থেকে। এই ‘স্টেপ ইন’ থেকেই বেরিয়ে সোজা পল্টন ময়দানে আসেন মওলানা ভাসানী একাত্তরের ৯ মার্চ বিকেলে। সেখান থেকে বাংলাদেশের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলেন তিনি। এর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে রেসকোর্সের ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান তার বিখ্যাত ভাষণ প্রদান করেন। স্বভাবতই ভাসানীর ঘোষণায় দর্শকশ্রোতারা দারুণভাবে উদ্বেলিত হয়। গ্রন্থকার তার বিবরণ দিয়ে লিখেছেন: ভাসানীকে নিয়ে যখন নেতারা ‘স্টেপ ইন’-এ ফিরে এলেন তখন মওলানা সাহেবসহ সবাই খালি পা, পাঞ্জাবি ছেঁড়া, কাদায় মাখামাখি। কী হয়েছে পল্টনে? শুনলাম জনতা বক্তৃতা শেষে উত্তেজনায় মঞ্চে উঠে লাফিয়েছে। ভাসানীসহ উপস্থিত সব নেতাকে মাথায় তুলে উল্লাসে নেচেছে। ভাসানী বলেছেন, আমরা স্বাধীন, তাই এই উল্লাস।

গ্রন্থকার আরো লিখেছেন: এরপরের ১০ দিন আমার বাড়িতে জনস্রোত। দেশের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি কেউ আসতে বাকি ছিল না। এদের মধ্যে ছিলেন ভাষা মতিন, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, পীর মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমান, বাফার কর্ণধার নুরুল হুদা, শাহ মোয়াজ্জেম, ফজলে লোহানী, ফয়েজ আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন, আবদুস সামাদ আজাদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, ড. আখলাকুর রহমান, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র লারমা প্রমুখ। এছাড়াও প্রতিদিনই আসত অসংখ্য বিদেশি সাংবাদিক। এদের সঙ্গে সব আলাপচারিতায় দোভাষীর ভূমিকা পালন করত আমার মেয়ে। একদিন অকস্মাত্ আবির্ভাব ঘটল চীনা দূতাবাসের এক কর্মকর্তার। তিনি জানালেন, গণচীনের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কথা বলতে চান। (সে আলোচনা বৈঠক যদিও হয়েছিল, কিন্তু ফলাফল প্রত্যাশার অনুকূলে কিছুই হয়নি)।

পরের অধ্যায়গুলিতে একাত্তরের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধকালীন যে মর্মস্পর্শী বর্ণনা গ্রন্থকার তুলে ধরেছেন তার কোনো তুলনা হয় না। পরিশেষে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, তা হলো, গ্রন্থকারের একমাত্র সন্তান অধ্যাপিকা নিলুফার সুলতানার কথা। এ সম্পর্কে তিনি নিজে বিশদ কোনো বর্ণনা না দিলেও গ্রন্থখানির প্রকাশনার ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত এই কন্যার অসীম যত্ন, শ্রম ও প্যাশন যে কোনো পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

লেখক: প্রবীণ রাজনীতিবিদ

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না

ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তিনি বারবার ফিরে আসবেন

সাংবাদিকতার মহাকবির প্রস্থান

কে তার অভাব পূরণ করবে? 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আবরণ সরাও, একাদশ ভাষাশহিদের ইতিহাস দেখো

আমের আঁটি বর্জ্য নয়, সম্পদ

আশা-আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর হয়ে এসেছিলেন তিনি

উলটা বুঝিলি রে!