বাজেট আসছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৯ জুন, ২০২২ বিকাল বেলা জাতীয় সংসদে ঘোষিত হবে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এটি হবে বাংলাদেশের ৫১তম পূর্ণাঙ্গ বাজেট এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের তৃতীয় বাজেট।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণীত হয়েছিল ১৯৭২-১৯৭৩ অর্থবছরে। সেই বছরের বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে পারে ৬ লাখ ৭৫ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে আয় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের (২০২১-২০২২) বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধজনিত কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। খুব শিগ্গিরই এই মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা নেই। দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) বলছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। সংস্থাটি বলছে, পরিসংখ্যান ব্যুরো মূল্যস্ফীতির যে তথ্য দিচ্ছে তা সঠিক নয়। বাস্তব অবস্থা আরো ভয়াবহ।
সানেম তাদের মূল্যায়নে বলেছে, বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে তা সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিভাত হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষের ব্যয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের পেছনে যায় বলে তাদের পক্ষে বিকল্প ব্যবস্থায় খাদ্য খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। সংস্থাটি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, শহরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
বিবিএসের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, শহর দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের ব্যয়ের ৪৫ দশমিক ১৭ শতাংশ খাদ্য খাতে ব্যয় করে। আর গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের ব্যয়ের ৫৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ খাদ্য খাতে ব্যয় করে। সানেমের প্রাক্কলনে ফেব্রুয়ারি মাসে শহর ও গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য মূল্যস্ফীতি পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ ও ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। জানুয়ারি মাসে শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ ও ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১ দশমিক ১১ শতাংশ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে আশাব্যঞ্জকভাবে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থানমূলক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনুত্পাদনশীল খাত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশি অবদান রাখলে তা একটি দেশের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির উদ্যোগে বরিশাল অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বক্তারা বলেন, ‘সুবিধার জিডিপি দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘব হবে না।’ প্রবৃদ্ধির সুফল যদি ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টিত না হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি সমাজে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। উৎপাদনশীল সেক্টরের মাধ্যমে যদি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি অনেকটাই জনকল্যাণমূলক হতে পারে। অনুত্পাদনশীল খাত থেকে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় তা কখনোই ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে না। আর ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে দারিদ্র্য বিমোচন হয় না। অনুত্পাদনশীল খাতের মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। আবার দুবৃর্ত্তায়নের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। কিন্তু সেটা কি আমাদের কাম্য হতে পারে? আগামী অর্থবছরের জন্য দারিদ্র্য বিমোচন হবে বাজেটের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, যারা করোনার কারণে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে, তাদের আবারও আগের স্থানে তুলে নিয়ে আসাটা খুব সহজ কাজ হবে না।
একটি বেসরকারি সংস্থার মতে, করোনার কারণে গত দুই বছরে বাংলাদেশের অন্তত ৩ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। অনেকেই কর্মচ্যুত হয়েছে। চাকরিক্ষেত্রে বেতন-ভাতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। এখন তা প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা থাকলেও তা কোনোভাবেই অর্জিত হবে না। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ছিল অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে। এখন তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ অনেক দিন ধরেই স্থবির হয়ে আছে। গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপির ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। এটা বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বিনিয়োগ। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের কার্যকর পরিবেশ নেই। ফলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। মুদ্রানীতিতে কয়েক বছর ধরে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিধার্রণ করা হচ্ছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। ২০১৭ সালে মোট ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। সে বছর ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১৮ সালে মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০১৯ সালে মোট ৯৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২০ সালে মোট ৮৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ২০২১ সালে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এই হচ্ছে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের অবস্থা। ব্যক্তি খাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ না হওয়ার কারণে দেশে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃজন হচ্ছে না।
আগামী বাজেটের পরই বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই অবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণ একটি বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আর বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। মাননীয় আদালত ইতিপূর্বে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সরকার কি তা করতে পারবে? আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ কি অবারিত থাকবে? অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। নির্ধারিত সময় শেষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকের ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বার্তা থাকবে কি? সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব আইনি সংস্কার সাধন করা হয়েছে, তা এই খাতের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর ব্যাপারটি কীভাবে ম্যানেজ করা হবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। বাজেটে ব্যাংকিং সেক্টর, শেয়ারবাজারের বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স আরো কমানো যেতে পারে।
তবে সার্বিক বিচারে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সেক্টরের জন্য ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এমনভাবে বাজেট প্রণীত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বোত্তম জনকল্যাণ সাধন করতে পারে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
