ভিকটিম ব্লেমিং অপরাধকে উসকে দেয় 

আপডেট : ১২ মে ২০২২, ০৮:১৮

ভিকটিম ব্লেমিং। শব্দটি সমাজে সব শ্রেণির কাছে বোধগম্য না হলেও পরোক্ষভাবে কম-বেশি এর চর্চা সমাজের বেশির ভাগ মানুষের দ্বারাই হয়ে থাকে। আমাদের আশপাশে যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে থাকলে অপরাধীকে নয়, বরং যার সঙ্গে অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে তাকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভিক্টিম ব্লেমিং বলতে আমরা এমনটাই বুঝে থাকি। প্রত্যক্ষভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, নারীঘটিত যেকোনো ক্ষেত্রে ভিক্টিম ব্লেইমিংয়ের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। যৌন হয়রানি নারীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আর এই সময়ে বেশির ভাগ নারীকে ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের শিকার হতে হয়।

খবরের কাগজ থেকে শুরু করে নিউজ চ্যানেলগুলোতে অহরহ আমরা নারী হয়রানিকেন্দ্রিক খবর শুনি। তাতেই আমরা বিব্রত বা অবাক হয়ে যাই এটা দেখে যে সমাজে নরীর অবস্থান কোথায়! নারীদের কেন পদে পদে বিপদে পড়তে হয়? কিন্তু আমরা কি জানি, আমাদের দেশের বেশির ভাগ নারী তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতন বা অন্যায়ের কথা প্রকাশ করেন না। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেই আমাদের আশপাশের কতিপয় অতিভদ্র নাগরিক আছে, যারা অপরাধীকে নয়, বরং যার সঙ্গে অপরাধ হয়েছে তার কী কী অপরাধ ছিল তা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। শুধু ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের ভয়ে আমাদের দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী অপরাধকে সামনে আনেন না। কারণ অন্যায়ের চেয়ে লোকে কী বলবে—এই চিন্তাতেই তারা অধিক চিন্তিত হয়ে পড়েন।

আশপাশের কারোর সঙ্গে অন্যায় কিছু হলেই আমরা অতিরিক্ত জাজমেন্টাল হয়ে যাই। যেমন—আরেকটু সতর্ক থাকা উচিত ছিল; তাহলে এমনটা হতো না। কই, আমাদের সঙ্গে তো এমন কিছু ঘটে না! তার সঙ্গে কেন ঘটল? তার এই অবস্থার জন্য তার পরিবারের দায় আছে, হয়তো তারা তাকে ঠিকমতো দেখেশুনে রাখে না। তাই হয়তো এমনটা ঘটেছে ইত্যাদি। প্রথমত ভিক্টিম এমনিতেই তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের জন্য মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তারপর আবার এমন কিছু মন্তব্য তার মনোবল আরো ভেঙে দেয়। এমনকি ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের জেরে অনেকে নিজেকে সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে।

বিংশ শতাব্দীতে এসেও যারা দুর্ঘটনার পর ভিক্টিম ব্লেমিং করে থাকেন, তাদের বড় একটা অংশই অতি সংকীর্ণ মনমানসিকতাসম্পন্ন মানুষ। তাদের চিন্তার জগত্টা বিস্তৃত নয় বলে তারা কখনো নিজেকে ভিকটিমের জায়গায় কল্পনা করতে পারেন না। তারা কোনো একটা ঘটনা বা পরিস্থিতিকে নিজের সংকীর্ণ মনের ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে গিয়ে ও বড় পরিসরে চিন্তা করার ক্ষমতা রাখেন না। শুধু স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিই নন, বরং উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের মাধ্যমে তারা যে অতি সংকীর্ণ মানসিকতা বহন করেন, এর মাধ্যমে তা জানান দেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব মানুষের মুখোশ উন্মোচিত হয়। নারীদের হয়রানিমূলক কিছু ঘটলেই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিক্টিমের চরিত্র নিয়ে নানা ধরনের আজেবাজে মন্তব্য করেন। যে যার মতো করে ভিক্টিম ব্লেমিং করে যাচ্ছেন। ঠিক যেমন হাতে বন্দুক পেলে নিরীহ মানুষের চোখ যেমন প্রাণীর ওপর পড়ে, তেমনি।

শুধু আপনার মতের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির মত মেলে না বলে, কিংবা আপনি কোনো ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না বলে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়কে পাশ কাটিয়ে তারই দোষ খোঁজা ঠিক নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমাজে ভেদাভেদ বাড়ায় এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়, যা দীর্ঘ মেয়াদে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। আর অস্থিতিশীল সমাজে কেউই নিরাপদ নয়, এমনকি আপনিও নন। কারো বিপদে পাশে না দাঁড়াতে পারেন, তবে এমন কিছু করবেন না, যাতে তাকে নতুন কোনো বিপদে পড়তে হয়। অতিরিক্ত জাজমেন্টাল না হয়ে সুষ্ঠু-সুন্দর সমাজ গঠনে আপনিও যেকোনোভাবে ভূমিকা পালন করতে পারেন সেটা ভাবুন। ভিক্টিম ব্লেমিং একটি জাতীয় সমস্যা। কিন্তু আইনে ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের কোনো সমাধান নেই। ভিক্টিম ব্লেমিং বন্ধে আইনে নতুন ধারা যুক্ত করা অতীব জরুরি। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং যেন ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের অন্যতম মাধ্যম না হয়, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সোচ্চার হতে হবে। ভিক্টিম ব্লেমিং এমন একটি অপরাধ, যেটি বলে বা জোর করে শোধরানো সম্ভব নয়। এখানে নৈতিক শিক্ষাই মুখ্য।

তাই এটি আটকাতে আইনের চেয়ে পারিবারিক শিক্ষার প্রভাব অনেকাংশে বেশি। শুধু আক্ষরিক নয়, শিশুদের প্রথম থেকেই নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাই পরিবারের প্রতিটি সদস্যক এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। জাতি যখন গোড়া থেকে মজবুত হয়ে উঠবে, তখন সমাজের অন্ধকার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। নারীদের ক্ষেত্রে ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের কারণে অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অন্যায়ের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করে এ ধরনের অপরাধকে রুখে দিতে হবে। আমরা অনেকে বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, ভিক্টিমকে নানা ধরনের মন্তব্য করে ফেলি। এসব মন্তব্যে ভিক্টিমের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। বিষয়টি অনেকেরই অজানা, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে। এসব বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন