বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কিছু দেশ কেন রাশিয়ার নিন্দা করতে অনিচ্ছুক

আপডেট : ১৩ মে ২০২২, ০৪:১৪

ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধকে খালি চোখে দেখলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ব্যক্ত দৃষ্টিভঙ্গি তথা ‘গণতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের মধ্যে প্রতিযোগিতা’ হিসেবে মনে হবে। বস্ত্তত, স্বৈরাচারী রাশিয়া গণতান্ত্রিক ইউক্রেনের ওপর যে বিরতিহীন বর্বর আক্রমণ চালাচ্ছে তা পশ্চিমা গণতন্ত্রের দ্বারা দৃঢ়ভাবে সমর্থিত হচ্ছে। তবে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলে যাবে, এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক।

এটা সত্য যে, বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশই ইউক্রেনকে সমর্থন করার জন্য সারিবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতন্ত্রের দেশ ভারত এখন পর্যন্ত রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করেনি। এমনকি মস্কোর বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।

শুধু ভারত নয়, এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্র ইন্দোনেশিয়াও রাশিয়ার বিষয়ে তার অবস্হানে অনড় রয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের বৃহত্তম সফল গণতন্ত্র দক্ষিণ আফ্রিকাও রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণ করতে অস্বীকার করেছে। উপরন্তু মস্কোর আক্রমণকে উস্কে দেওয়ার জন্য ন্যাটো সম্প্রসারণকে দায়ী করেছে দেশটি। লাতিন আমেরিকার দুই বৃহত্তম গণতন্ত্র- ব্রাজিল এবং মেক্সিকো জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে রাশিয়াকে অপসারণের প্রশ্নে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করে ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে। আরব বিশ্বের একমাত্র কার্যকর গণতন্ত্রের দেশ ইরাক রাশিয়ার বিপক্ষে নিন্দা প্রস্তাবে বিরত থেকে প্রকারন্তরে রাশিয়ার পক্ষাবলম্বন করেছে। এভাবে বিশ্বের বেশ কিছু গণতন্ত্রিক রাষ্ট্র এই ‘মহান আদর্শিক’ সংগ্রামে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলার পরিবর্তে মুখে কুলুপ এটে বসে আছে।

একদিক থেকে এটিকে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে আদর্শবাদকে তুচ্ছ করার সাধারণ ঘটনা বলে মনে হতে পারে। কেননা, মস্কোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে এ সমস্ত দেশের অনেকেরই অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তার বেশিরভাগ উন্নত অস্ত্র পায়। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ব্রাজিলের রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মহান ‘আদর্শিক ধর্মযুদ্ধ’ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্বলতাকে সামনে আনছে। এসব দেশের বেশিরভাগেরই চীনের সাথে দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা তাদের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য স্বৈরাচার রাষ্ট্রের সাথেও ঘনিষ্ঠ মিত্রতা বজায় রেখে চলছে।

বিশ্বের এ কাঠামোবদ্ধ বিভাজনকে নির্দেশ করার একটি অপেক্ষাকৃত ভাল উপায় হল, দেশগুলো একটি ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদেশ’কে অনুসরণ ও বিশ্বাস করে চলে। ইতোমধ্যে রাশিয়া নিজেকে বিশ্বের শীর্ষস্হানীয় ‘রগ স্টেট (মানবাধিকার ও শান্তি বিনষ্টকারী দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র)’ হিসেবে প্রকাশ করেছে। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সীমানা পরিবর্তনের অভিপ্রায়ে রাশিয়া যে ‘পাওয়ার পলিটিক্স (ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি)’ শুরু করেছে তা থুকিডাইডিসের চিরন্তন উক্তিকেই সমর্থন করে- ‘শক্তিশালীরা যা চায় তাই করে আর দুর্বলরা যা ভোগ করে তা তাদেরই করতে হয়’।

পশ্চিমারা যদি এরূপ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্বকে সমবেত করতে চেষ্টা করে, তবে দেখতে পাওয়া যাবে- এর পক্ষেও বহু মিত্র রয়েছে। যেমন- প্রাক্তন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড মিলিব্যান্ড আমাকে বলেছিলেন, গণতন্ত্র বনাম স্বৈরাচারের প্রশ্নে ‘একক ভিত্তিক’ বিভাজনের চেয়ে ‘নিয়মভিত্তিক’ আদেশের ভিত্তিতে বিভাজন অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরের মতো একটি দেশ, যেখানে এখনও পূর্ণাঙ্গ উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মূল্যবোধের প্রতি দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। রাশিয়ান আগ্রাসনের শুরুতেই দেশটি তার ইতিহাসে ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের নিরবতা ভেঙে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়; যদিও রাশিয়ার ভেটোর কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ তা বলবৎ করতে পারেনি। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র চালু থাকার পরেও তারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আবেদনে সাড়া দিয়ে একটি ‘উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্হা’ সমুন্নত রাখাতে বদ্ধপরিকর হতে পারে।

ভারত বা ইন্দোনেশিয়া রাশিয়ার আগ্রাসনের ব্যাপারে মৌন ভূমিকা পালন করলে নতুন পরিস্হিতিতে পরিণতি সম্পর্কে কঠিন করে ভাবতে হতে পারে। যদি দেশগুলো সামরিক অনুপ্রবেশ এবং তাদের প্রতিবেশীদের ভূমি দখলের ব্যাপারে মুখ ঘুরিয়ে থাকে, তাহলে নিজেদের বেলাতেও সীমান্ত বিতর্ক নিয়ে শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্হান নিতে পারবে না। যেমন- কেনিয়ার রাষ্ট্রদূত দখঅরদারির ঠিক পূর্বে যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, আক্রমণের পরিবর্তে আফ্রিকান দেশগুলো তাদের ঔপনিবেশিক সীমানাগুলোকে যথাযথভাবে গ্রহণ করার নীতি বেছে নিয়েছে, কারণ তারা বুঝতে পেরেছে- সাংস্কৃতিক বা জাতিগত সীমানা পুনরায় আঁকার চেষ্টা করলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে, অশান্তি বাড়বে।

এই ধরনের কাঠামো চীনের ওপরও অনেক বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্হা সুবিধা পেতে পারে। এই উন্মুক্ত কাঠামো চীনকে শান্তিপূর্ণভাবে এশিয়ায় একটি স্হিতিশীল, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করেছে। যদিও বেইজিং প্রায়শই বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জোর দিয়ে কথা বলেছে, তবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে রাশিয়ার পাশেই রয়ে গেছে। এটি চীনের ‘ভন্ডামি’ এবং এই দিকটিই ‘হাইলাইট’ করে প্রচার করা উচিত।

এই কৌশলটি কার্যকর করার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘নিয়মাতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্হা’ গড়ে তুলতে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বাঁধাও আছে। কেননা, মার্কিন কর্মকাণ্ড বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে প্রায়ই ‘পশ্চিমা ভন্ডামি’র অভিযোগ তোলা হয়। এত কিছুর পরও বাইডেন প্রশাসন এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে যদিও যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। তাছাড়া চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ না হয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সমুদ্র চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে।

ওয়াশিংটন যদি সত্যিই বিশ্বব্যাপী একটি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্হা দাঁড় করাতে চায়, তবে সেক্ষেত্রে তারা যা প্রচার করে তা অনুসরণের চর্চা করতে হবে।

লেখক: সিএনএন-এর জিপিএস হোস্ট এবং ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

অশ্রুসিক্ত স্মৃতি তর্পণ 

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না

ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তিনি বারবার ফিরে আসবেন