সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পদ্মা সেতু: উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক

আপডেট : ১৩ মে ২০২২, ০৯:০৪

বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু ডিসেম্বরে নয়, আগামী জুন মাসেই চালু হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। পদ্মা নদী পৃথিবীর উত্তাল বা খরস্রোতা নদীগুলোর মধ্যে একটি। জলপ্রবাহের দিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের পর এই নদীটি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এত উত্তাল নদীর ওপর আর কোনো সেতু এই পর্যন্ত নির্মিত হয়নি। পদ্মা সেতু দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মার ওপর প্রস্তাবিত একটি বহুমুখী সেতু। উৎতর দিকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া উপকূল এবং দক্ষিণ দিকে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের জাজিরা উপকূল। বহু বছর আমাদের যোগাযোগ ছিল নদীনির্ভর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে সড়ক যোগাযোগের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। যে কোনো সড়ক তৈরি করতে গেলেই ছোটবড় নদী অতিক্রম করতে হতো। অনেক ফেরি চালু ছিল। উত্তরাঞ্চলের মানুষ কখনো ভাবতেই পারেনি সকালে রওনা দিয়ে দুপুরে ঢাকা পৌঁছে যাবে। আবার কাজ শেষ করে সেদিনই ফিরে আসা সম্ভব হবে! ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন করা হয়। সে সময়েই বহু প্রতীক্ষিত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের সুবিধার জন্য স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পদ্মায় পানির প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ১.৪০ লাখ ঘনমিটার এবং এমন উত্তাল নদীর ওপর সেতু নির্মাণ অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেতুটি ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৮.১০ মিটার প্রস্থ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে নদীর উভয় পাড়ের কাজের উদ্বোধন করেন।

প্রকৃতপক্ষে এই সেতুটি চালু হলে সমগ্র দেশের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। যেটা দেশের উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নই জাতীয় উন্নয়নের বৃদ্ধি ঘটায়। আর পরিবহনব্যবস্থা জাতীয় অর্থনীতিকে বিভিন্ন ধাপে উন্নয়নে সহযোগিতা করে। পাশাপাশি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারবে। এসব এলাকায় অবস্থিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগী হয়ে উঠবে। এতে পণ্যের সার্বিক মান বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের ব্যাবসায়িক ক্ষেত্র ও বিস্তৃত হবে। জাতীয় উন্নয়ন মূলত জাতীয় অর্থনীতির ওপরই নির্ভরশীল এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা জাতীয় অর্থনীতি উন্নয়নের প্রভাবক। তদুপরি পদ্মা সেতু যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতিকল্পেই নির্মিত হয়েছে। সুতরাং এটা বলা যায় যে, পদ্মা সেতু জাতীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে। পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং প্রভাব অনেক। পদ্মা সেতুটি নির্মাণের ফলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ দুই থেকে চার ঘণ্টা কমে যাবে। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার, কাঁচামাল সরবরাহ এবং শিল্পায়ন সহজতর করতে সহায়তা করবে। ২১টি জেলায় গড়ে উঠবে ছোটবড় শিল্প। কৃষির ব্যাপক উন্নতি হবে। কৃষকরা পণ্যের দাম ভালো পাবেন এবং ফলে উৎপাদন বাড়বে। দক্ষিণের জেলাসমূহের বার্ষিক জিডিপি ২.০ শতাংশ এবং দেশের সামগ্রিক জিডিপি ১.০ শতাংশের বেশি বাড়াতে সাহাঘ্য করবে। সেতুটি নির্মাণের ফলে দেশের সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর উন্নতি হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়বে। সেতুর দুই পাশে গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও বেসরকারি শিল্প শহর। ফলস্বরূপ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর নতুন উদ্যমে চালু থাকবে। পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার, মাওয়া ও জাজিরায় পুরোনো-নতুন রিসোর্টসহ নতুন-পুরোনো পর্যটনকেন্দ্র দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। এটির মাধ্যমে শুধু যাতায়াতেরই সুবিধা হবে না বরং এটি টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুত্ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। এসব সুবিধা দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবসায়ের উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক। সেতুটি খুলে দেওয়া হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যাবসায়িক অবস্থার ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে, যেটা জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অন্যদিকে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ সহজ হবে। ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটবে। এলাকাভিত্তিক ব্যবসায়ের উন্নতি সব সময় জাতীয় অর্থনীতির উন্নতির কারণ হিসেবে কাজ করে। ফলে জাতীয় উন্নয়নের মান ও উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌবন্দরের একটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থিত। এটি হলো মোংলা বন্দর এবং এটার সংশ্লিষ্ট পরিবহন ব্যবস্থায় পদ্মা সেতু ব্যবহারের বিকল্প নেই। সেতু দ্বারা সৃষ্ট যাতায়াতব্যবস্থার উন্নতি দ্বারা বন্দরটির সম্ভাব্য উপযুক্ত গ্রহণযোগ্যতা ও উপকারিতা বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশ নদীপথে বাণিজ্য করা দেশগুলোর সঙ্গে অধিক ব্যাবসায়িক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারবে। ফলে দেশের সার্বিক বাণিজ্যের উন্নতি সাধিত হবে এবং সেটা জাতীয় উন্নয়নের কার্যকরী প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। নিজস্ব অর্থায়নে এমন একটি সেতু নির্মাণ করতে যাওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে একটি দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী সহজে ও স্বল্পব্যয়ে স্থানান্তর করতে সুবিধা হয়। এর ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, শিল্প ও ব্যবসায়ের প্রসার ঘটে। এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পদ্মা সেতু এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভিত্তি ও সোনালি সোপান হিসেবে কাজ করবে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অহংকারের সেতুর নামকরণ প্রসঙ্গ

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না

ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তিনি বারবার ফিরে আসবেন

সাংবাদিকতার মহাকবির প্রস্থান