মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষাব্যবস্থাকে বাণিজ্যমুক্ত করতেই হবে

আপডেট : ১৪ মে ২০২২, ০৫:১০

নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এই লক্ষ্যমাত্রা অজ‌ে‌র্নর অন্যতম বাহন হচ্ছে আমাদের বর্তমান সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী। বর্তমানে আমরা পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন আর ভোগবাদি অর্থনীতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত এমন একটি সমাজে বসবাস করছি যেখানে সবকিছু বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে শিক্ষা এখন আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক পণ্য। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পিএইচডি পর্যন্ত চলছে এই ব্যবসা।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকার কতৃক নির্ধারিত পাঠ্যতালিকার বাইরে অতিরিক্ত বই পাঠ্যতালিকাভুক্ত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ডোনেশনের বিনিময়ে ছাত্রছাত্রীদের এই বই কিনতে বাধ্য করে। শিক্ষা বাণিজ্যের আরেক ভয়াবহ রূপ হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যে কেউ যখন তখন যেখানে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর নীতিমালা দরকার। মেধার বিকাশ ঘটানো এবং মেধাবী জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্হা প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু সেই মহৎ উদ্দেশ্যের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এদেশের গাইড ব্যবসায়ীরা।

অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী গাইডনির্ভর। যাবতীয় নীতিমালা ভঙ্গ করে গাইড ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। এরাই ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে মেধাহীন পঙ্গু জাতিতে পরিণত করছে। কারণ সৃজনশীল আর নোট-গাইড একসঙ্গে চলতে পারে না। উচ্চশিক্ষা নিয়ে ব্যবসায়ীদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। দেশে এখন অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৭। এর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে ৯৮টি। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী সাড়ে তিন লাখের মতো। যদিও তাদের অর্ধেকই ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ৯৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। অনুমোদনের বাইরেও বিভিন্ন নামে প্রোগ্রাম খুলে ভর্তি নেওয়া, আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি ভর্তি নেওয়া, সনদ বাণিজ্য, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্হায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্য না থাকা, স্হায়ী শিক্ষক না থাকা, গবেষণাগার এবং ল্যাব না থাকার মতো বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।

ইউজিসির তথ্যমতে, ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট আসন সংখ্যা মাত্র ৬০ হাজার। ফলে যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না তাদের বৃহত্ একটি অংশ বাধ্য হয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন তাদের জিম্মি করে নানান অজুহাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর জাতিকে হতাশ করেছে। যদিও অধিকাংশ অভিযোগ ভিসিকেন্দ্রিক। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণা জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কোনো অবস্হাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ অনিয়ম আর দুর্নীতির সঙ্গে জড়াতে পারেন না। বাঙালিদের আবার সবকিছু বিদেশি পছন্দ, তাই বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে এদেশে শাখা খুলে বিদেশি সনদ বিক্রি চলছে; যদিও ইউজিসি তাদের কোনো অনুমোদনই দেয়নি। তারা পিএইচডি ডিগ্রি পর্যন্ত বিক্রি করছে! শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা হচ্ছে যথাযথ নীতিমালা না থাকায়। আমাদের শিক্ষার্থীরাই আমাদের সম্পদ। এদেরকে বাণিজ্যমুক্ত প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলেই আমাদের কাঙ্গিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

এদেরকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বিশ্ব নাগরিক হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী হিসেবে এদেরকে গড়ে তুলতে চাইলে যে কোনো মূল্যে শিক্ষার্থীদের কোনো ব্যবসায়ীর বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। তার জন্য প্রয়োজন একটি কঠোর নীতিমালা। শিক্ষানীতিমালা এমন হতে হবে যেন আমাদের শিক্ষাব্যবস্হার কোনো অংশ নিয়ে কেউ কোনো ধরনের বাণিজ্য করতে না পারে। উপাধ্যক্ষ (শিক্ষা), পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাভার, ঢাকা

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন