বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অসুখ-বিসুখ

আপডেট : ১৫ মে ২০২২, ০৬:৩৮

আমাদের এই তেল ও তেলবাজির দেশে আকস্মিকই ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের অনেক জায়গায় সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দাম দিয়েও তেল মিলছে না। তেলের এই সংকট বাদ দিলে বড় কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমাদের এবারের ঈদ-উত্সবপর্ব সমাপন হয়েছে। দীর্ঘদিন পর মোটামুটি করোনামুক্ত পরিবেশে মানুষ ঈদের উত্সবে যোগ দিয়েছে। গ্রামের বাড়ি যাওয়া এবং রাজধানীতে ফেরার বিড়ম্বনাও এবার তুলনামূলকভাবে কম লক্ষ করা গেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় কিছু মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটেছে। এর বাইরে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিপত্তি বা দুর্ঘটনার কথা শোনা যায়নি।

তবে মানুষের অসুখ-বিসুখ বা রোগব্যাধির প্রকোপ যেন কিছুটা বেড়েছে। দূষিত পরিবেশে বাস করে, ভেজাল ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মেশানো খাবার খেয়ে, নানা রকম মানসিক যন্ত্রণা ও দুশ্চিন্তার শিকার হয়ে এবং খেয়ালি আবহাওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অসুখের প্রবণতা বাড়ছে।

‘অসুখ’ শব্দটার মানে অবশ্য আমাদের কাছে আলাদা। ‘অসুখ’ বলতে আমরা বুঝি রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া। আবার ‘অসুখী’ বলতে বুঝি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা। বাংলা ভাষায় রোগ ও অসুখ দুটি আলাদা শব্দ। রোগের মানে হলো অসুস্থতা আর সুখের অভাব হল অসুখ। যদিও অসুখ শব্দটি আমরা ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করি। ‘আমরা রোগ হয়েছে’—এ কথা বলতে গিয়ে বলি, ‘আমার অসুখ হয়েছে’, অর্থাৎ আমি অসুস্থ হয়েছি। কিন্তু অন্য দিকে কেউ যদি কখনো বলে, ‘আমি অসুখী’, তার মানে এই নয় যে তার রোগ হয়েছে, সে রোগী, তার জন্য ডাক্তার ডাকতে হবে বা ওষুধ আনতে হবে।

স্বাস্থ্যই সুখ। তাই শরীর খারাপ হওয়াকে বলে অসুখ। অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—স্বাস্থ্যই সব। বিদ্যা, ঐশ্বর্য, সম্মান, প্রতিপত্তি স্বাস্থ্যের অভাবে এ জীবনে সবকিছুই বিফল হয়ে যায়, কিছুই কাজে লাগে না।

যিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, তার পক্ষে কিছুতেই বোঝা সম্ভব নয় স্বাস্থ্যহীনতার কষ্ট, অসুখের যন্ত্রণা। সুস্বাস্থ্য সবাই কামনা করে, কিন্তু পায় না। অসুখ-বিসুখহীন জীবন এত সহজ নয়। এক অজ্ঞাতনামা ইংরেজ কবি লিখেছিলেন:

আমরা স্বাস্থ্য নষ্ট করি
— সম্পদের সন্ধানে
আমরা উপার্জন করি, সঞ্চয় করি
আমাদের স্বাস্থ্যের বিনিময়ে।
তখন আমাদের অর্জিত সম্পদ আমরা ব্যয় করি
আমাদের স্বাস্থ্য ফিরে পাওয়ার জন্য।

জীবনে রোগব্যাধি, অসুখ হয়নি এমন মানুষ আমাদের সমাজে বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। জীবন থাকলে, বেঁচে থাকলে অসুখ হবেই। এর কোনো মাফ নেই। জীবন মানে শুধু অর্থবিত্ত প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম নয়। অসুখের বিরুদ্ধে সংগ্রামও বটে।

কে কখন কোন অসুখে আক্রান্ত হবে, তা আগেভাগে বলা যায় না। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রোগব্যাধি অনিবার্য হলেও মানুষ অবশ্য সব সময় এসব এড়িয়ে থাকতে চায়। অসুখ যেন না হয়, সেজন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে। তার পরও শেষ রক্ষা হয় না। আততায়ীর মতো আকস্মিকভাবে ঠিকই রোগব্যাধি হানা দেয়। এরপর চলে ডাক্তার, ওষুধ, পথ্য, ভোগান্তি, বিশ্রাম।

কিছু অসুখ আছে গোপনে আততায়ীর মতো হানা দেয় না। অনেক অসুখ আসে ধীরে সুস্থে, নানা উপসর্গের মধ্য দিয়ে, পরিষ্কার জানান দিয়ে। আবার কতগুলোর প্রকাশ ঘটে আকস্মিক, একেবারে ভূমিকম্পের মতো। চেষ্টা করলেও অসুখ এড়ানো যায় না। সতর্কতা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে অনেক অসুখ হয়। আবার সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের পরও অনেক সময় কঠিন অসুখ হয়। আসলে রোগের জীবাণুগুলো এত সূক্ষ্ম যে, তা কখন কীভাবে শরীরে এসে দানা বাঁধবে বলা যায় না। খাদ্যে, পানিতে, বাতাসের মধ্যে যে রোগের জীবাণু ভেসে বেড়ায়, সেগুলো এড়িয়ে চলা মোটেও সহজ কাজ নয়। রোগব্যাধি, অসুখ সব সময়ই ক্ষতিকর এবং বিরক্তিকর। এতে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। অনেক সময় অসুখের কারণে জীবনপ্রদীপ পর্যন্ত নিভে যায়। সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবন তাই প্রত্যেক মানুষের কাছেই পরম আরাধ্য।

তবে অসুখ অবশ্য সব সময় অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। অনেক সময় আমরা ইচ্ছা করেই অসুস্থ হয়ে যাই। এটাকে অবশ্য অসুস্থতার ভান বলাটাই শ্রেয়। প্রাত্যহিকতার অভিশাপ ও জীবনের একঘেয়ে রুটিন থেকে মুক্তি পেতে অনেক সময় আমরা অসুখ কামনা করি। অসুখ মানে হলো ছুটি। সবকিছু মাফ। স্কুলে যেতে হয় না। অফিস কামাই করা যায়। আড্ডা, দাওয়াত, পিকনিক—কোথাও যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে না। আমাদের ছকে বাঁধা জীবনে অসুখই একমাত্র নিদান বা তাল ভঙ্গের উপাদান।

‘আমার অসুখ করেছে’—এ কথা বলেলে সব রকম দায়িত্ব-কর্তব্য থেকেই মুক্তি পাওয়া যায়। রেহাই পাওয়া যায় যাবতীয় শৃঙ্খল ও শৃঙ্খলা থেকে। কারণ অসুস্থ মানুষের পক্ষে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। শৈশব ও কৈশোরে লেখাপড়ায় ফাঁকি দিতে আমরা অসুস্থতার অজুহাত বেশি দিই। মাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্তানের এ ধরনের অসুখ সামলাতে হয়।

তবে আমাদের দেশের মানুষ হচ্ছে ভীষণ রকম চালাক ও মতলববাজ। স্বার্থ ও সুবিধার জন্য আমরা পাগল, শিশু যা খুশি তাই হতে পারি এবং হয়ে যাই। দায়িত্ব এড়াতে, কর্তব্যে ফাঁকি দিতে আমরা কেবলই ছল খুঁজি। অসুখ তাই আমাদের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। আমরা স্কুল ফাঁকি দিই অসুখের কথা বলে। অফিস কামাই দিয়ে আমোদ-ফুর্তি করি। এরপর অফিসে গিয়ে বলি অসুখের কথা। এ ব্যাপারে ডাক্তারের সার্টিফিকেট জোগাড় করাও আমাদের জন্য কষ্টকর হয় না।

অসুখ কিন্তু আমাদের জীবনে চরম সর্বনাশ ও আতঙ্কের নাম। করোনার কথাই চিন্তা করুন। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গত দুই বছরে পৃথিবীতে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো হচ্ছে। অসুখ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় রকমই হতে পারে। আমরা বর্তমানে জাতিগতভাবেই গভীর অসুখে আক্রান্ত। এই অসুখের নিদান দেওয়ার মতো ভালো চিকিত্সক আপাতত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও মাঝে মাঝে অসুখের চর্চা হয়। বিপদে পড়লে আমাদের কর্তাব্যক্তিরা অনেক সময় ‘স্বাস্থ্যগত’ কারণে পদত্যাগ করেন; নৈতিক বা আদর্শগত কারণে কেউ কখনো পদত্যাগ করেন না। অসুখ এক্ষেত্রে সম্মান বাঁচানোর হাতিয়ারও বটে!

আমাদের জীবনে অসুখের কোনো শেষ নেই। অনেকেই বিচিত্র সব অসুখে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে আছেন। আমাদের আমলা-ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের অসুখ হলে তাদের চিকিত্সা দেশে হয় না। তারা সর্দি-কাশি হলেও বিদেশে যান চেকআপ করতে বা ডাক্তার দেখাতে। দেশের চিকিত্সা এবং দেশি চিকিত্সক তাদের রোগ ভালো করার দাওয়াই দিতে পারেন না। তারা তেমনটি চানও না। বিদেশে চিকিত্সা করানোটা অনেকের কাছে স্ট্যাটাস সিম্বল।

তার পরও কিন্তু রোগব্যাধির হাত থেকে ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও রেহাই পান না। অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নানা রকম অসুখ নিয়েই দিন যাপন করছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে কানের সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রয়েছে হাঁটুতে সমস্যা। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার মরহুম এম এ আজিজ সাহেব এক অদ্ভুত ও বিচিত্র রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন তিনি দিনের বেলা হাসপাতালে এবং রাতে বাসায় কাটাতেন। তার প্রকৃত অসুখটা কী ছিল, সেটা অবশ্য কারো পক্ষেই জানা সম্ভব হয়নি। বড় মানুষদের বড় বড় রোগব্যাধি নিয়ে আলোচনা না করাটাই সংগত। এতে বিপদের ঝুঁকি আছে।

অসুখ, রোগব্যাধি প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বহুল পরিচিত সেই গল্প। এক ব্যক্তির গরু হারিয়েছে। সারা দিন ধরে বনে-বাদাড়ে, মাঠেঘাটে, ঝোপে-জঙ্গলে গরু খুঁজেছে। তার হাঁটুর ছাল উঠে গেছে। গোড়ালি কেটে গেছে, সারা শরীর বুনো কাঁটায় রক্তাক্ত। সে এলো ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার সাহেব তাকে দেখলেন, দেখে দুটো ট্যাবলেট দিলেন খাবারের পর খেতে।

পরদিন সাতসকালে সেই রোগী এসে হাজির, সে রীতিমতো উত্তেজিত, ডাক্তার সাহেব আপনি সাক্ষাৎ ফেরেশতা, আপনার ওষুধের কী গুণ! এরকম প্রশংসা শুনে ডাক্তার সাহেব যথেষ্টই বিচলিত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন ব্যাপারটা কী, ব্যথা-বেদনা সব সেরে গেছে? রোগী যা বললেন তা এক তাজ্জব বৃত্তান্ত: কাল রাতে শোয়ার আগে আপনার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সেই ক্যাপসুল দুটো খেয়েছি, অমনি শুনি আমার ঘরের পেছনে হাম্বা হাম্বা ডাক। ছুটে গিয়ে দেখি আমার হারানো গরুটা ফিরে এসেছে। এরপর আর কি গায়ে ব্যথা থাকে? সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা সেরে গেছে।

তার ওষুধের এই অত্যাশ্চার্য গুণ দেখে সেই ডাক্তার সাহেব কতটা খুশি হয়েছিলেন, সেটা অবশ্য বলা কঠিন। আমরা জাতীয়ভাবেই নানা ধরনের ব্যাধিতে ভুগছি। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য শোচনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। দুর্নীতি, বেকারত্ব, গণতন্ত্রহীনতা, দূষণ, দখল, দাপট আমাদের জীবনের যাবতীয় সুখ কেড়ে নিতে বসেছে। প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশে কি এমন একজন ডাক্তারও নেই, যিনি কোনো এক ধন্বন্তরি ওষুধে আমাদের ‘ব্যথা-বেদনা-অতৃপ্তি’সহ যাবতীয় ‘অসুখ’ ভালো করে দিতে পারেন?

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে করণীয়

আসন্ন বাজেট ও কতিপয় বিবেচনার বিষয়

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

অশ্রুসিক্ত স্মৃতি তর্পণ 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার