বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে এখনো কি কূটনৈতিক তৎপরতা সম্ভব?

আপডেট : ১৫ মে ২০২২, ০৬:৪৭

দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব মিডিয়ার তীব্র ফোকাসের মধ্যে আছে ইউক্রেন যুদ্ধ। এত কিছুর পরও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। গত এপ্রিলের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বন্দি বিনিময় করেছে। কিন্তু এই খবর কোথাও গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়নি। রাশিয়া একজন আমেরিকানকে (প্রাক্তন নাবিক) মুক্তি দিয়েছে। তাকে তারা তিন বছর আগে আটক করেছিল। অন্যদিকে আমেরিকা এক দশক আগে মাদক চোরাচালানের অভিযোগে বন্দি এক রাশিয়ান পাইলটকে মুক্তি দিয়েছে।

এই বন্দি বিনিময়ের ঘটনাটি লক্ষণীয় এবং বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। বিশেষ করে এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার নৃশংস আগ্রাসন স্নায়ুযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সর্বনিম্ন স্তরে নিয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত নয়। বরং সামরিক সম্পৃক্ততা এড়িয়ে ইউক্রেনকে ক্রমবর্ধমান হারে উন্নত অস্ত্র, বুদ্ধিমত্তা ও প্রশিক্ষণ প্রদানসহ যুদ্ধের গতিপথ‌ে প্রভাবিত করার জন্য সম্ভাব্য অনেক কিছুই করছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যাতে ইউক্রেনীয়রা সফলভাবে রাশিয়ান বাহিনীকে প্রতিরোধ ও পরাজিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও ন্যাটোকে শক্তিশালী করতে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

যুদ্ধ আরো কিছু সময়ের জন্য সম্প্রসারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও ইউক্রেনের মৌলিক স্বার্থ যুদ্ধের অবসান এবং আরো মৃত্যু ও ধ্বংস প্রতিরোধ করা, তথাপি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির শান্তির আকাঙ্ক্ষা শর্তাধীন। তিনি রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করতে চান, যাতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান করতে পারে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধের জন্য যেসব রাশিয়ান সেনা দায়ী, তিনি তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চান।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে তার দেশের স্বার্থে এমন একটি ফলাফল অর্জন করতে হবে, যা তার এই ব্যয়বহুল ইউক্রেন যুদ্ধকে ন্যাঘ্যতা দেয়। পাছে তাকে দুর্বল দেখায় এবং নিজ ঘরে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় এমন পরিস্হিতি তার কাম্য নয়। আপাতদৃষ্টিতে এ দুটি অসংলগ্ন অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান কমাতে একটি শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ সংঘাত শুধু কয়েক মাস নয়, আগামী হয়তো কয়েক বছর ধরে চলতে থাকবে এমন আশঙ্কাই বেশি। এটি রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কের নতুন পটভূমি রচনা করবে।

এই দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার সঙ্গে পুরো সম্পর্ককে ইউক্রেনে রাশিয়ার পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে পশ্চিমা বিশ্ব। যদিও এই যুদ্ধের কারণে রাশিয়া অন্যান্য পশ্চিমা স্বার্থকে প্রভাবতি করতে পারে, যেমন— ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষমতাকে সীমিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার সাফল্যকে নস্যাৎ করা, তথাপি পশ্চিমা বিশ্বের এটি হবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যাবে না।

সুসংবাদটি হলো, বন্দি বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এতে পারস্পরিক উপকারী কর্ম সম্পাদনে কোনো বাধা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। উভয় পক্ষকে বিভক্ত করে এমন কোনো উপাদান এখানে নেই। কিন্তু বাছাইকৃত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো রক্ষার জন্য প্রয়োজন হবে পরিশীলিত ও সুশৃঙ্খল কূটনীতি।

সম্পর্ক উন্নয়নের সূচনাকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের প্রয়োজন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। এমনকি এখন ইউক্রেনে তাদের লক্ষ্য সীমিত করতে হবে। এর অন্য অর্থ হলো, মস্কোতে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা ত্যাগ করতে হবে। আমাদের যে রাশিয়া বিদ্যমান আছে, তার সঙ্গেই মোকাবিলা করতে হবে, আমরা যা পছন্দ করব তার সঙ্গে নয়। পুতিনের অবস্থানকে অভ্যন্তরীণভাবেই চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে (অথবা তিনি ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে সরে যেতে পারেন)। তবে তার অপসারণে পশ্চিমাদের কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশ্রয় নেওয়ার দরকার নেই। তার থেকে আরো ভালো কেউ স্হলাভিষিক্ত হবেন এমন কোনো নিশ্চয়তা পশ্চিমের কাছে নেই।

একইভাবে পশ্চিমা সরকারগুলোর বুদ্ধিমানের কাজ হবে রাশিয়ার সিনিয়র কর্মকর্তাদের জন্য যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবু্যনালের আলোচনার পথ বন্ধ করে দেওয়া এবং রাশিয়ার সিনিয়র জেনারেল ও যুদ্ধজাহাজের লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় ইউক্রেনকে সহায়তা করার বিষয়ে গর্ব করা থেকে বিরত থাকা। যুদ্ধ ও তদন্ত একই সঙ্গে চলছে এবং রাশিয়ানরা যাতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে, সে ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা দেখতে হবে। ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।

একইভাবে, যদিও এই যুদ্ধের সূচনা করার ফলে রাশিয়া সম্ভবত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে নিজেকে আরো বাজে অবস্থায় দেখতে পাবে, তথাপি মার্কিন সরকারের উচিত যুদ্ধ বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব লয়েড অস্টিন ইতিমধ্যে মন্তব্য করেছেন, ‘আমেরিকার লক্ষ্য রাশিয়াকে দুর্বল করতে ইউক্রেন যুদ্ধকে ব্যবহার না করা।’ এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইউক্রেনের সার্বভৌম ও স্বাধীন মর্যাদা প্রতিফলিত করে এমন শর্তে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যুদ্ধের অবসান ঘটানো।

ইউক্রেনের যুদ্ধে পশ্চিমাদের উচিত ইউক্রেনের জন্য সমর্থন প্রদান অব্যাহত রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমনে সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলা। যদিও ক্রেমলিনকে বোঝানো উচিত যে এই সংযম প্রদর্শনের অর্থ হলো যাতে কোনো ন্যাটো সদস্য দেশে এই যুদ্ধ সম্প্রসারিত না হয় অথবা গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের সূচনা না হয়। যাতে এ ধরনের স্ব-আরোপিত পশ্চিমা সীমাগুলো উঠে না যায়।

পশ্চিমাদেরও উচিত যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা এবং কীভাবে সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করা যায়, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় আনা। এই যুদ্ধের লক্ষ্য হওয়া উচিত যে ইউক্রেন তার সমস্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ক্রিমিয়াকে মুক্ত করতে হবে বা সমস্ত পূর্ব ডনবাস অঞ্চল মুক্ত করতে হবে এমন প্রচেষ্টাকে সমর্থন না করলেও চলে। কিছু লক্ষ্য এমনও হওয়া উচিত, যার মাধ্যমে কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধি পায় এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়। কিন্তু যতক্ষণ না রাশিয়ার আচরণের পরিবর্তন হচ্ছে, ততক্ষণ নিষেধাজ্ঞাগুলো শুধু বহাল থাকলেই চলবে না, বরং রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থায়নকারী জ্বালানি আমদানিকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে।

কূটনীতি হলো জাতীয় নিরাপত্তার একটি হাতিয়ার, যা কারো প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শনের জন্য ব্যবহূত হয় না। তবে রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক তত্পরতা চালিয়ে যাওয়া উচিত। পশ্চিমা দেশ এবং রাশিয়ার সিনিয়র বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বৈঠকগুলো পুনরায় শুরু করা উচিত, যাতে যুদ্ধ পরিস্হিতি আরো বাজে অবস্থায় উপনীত হয় এমন ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে। সীমিত আকারে হলেও সহযোগিতার সুযোগগুলোর দ্বার উন্মুক্ত রাখা উচিত।

রাশিয়ার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক পুতিন-পরবর্তী যুগে আরো ভালোভাবে আবিভূ‌র্ত হতে পারে, এটা হলে মন্দ হবে না। কিন্তু এটা কূটনৈতিক তত্পরতার প্রতি পশ্চিমাদের আগ্রহকে যেন কোনোভাবেই পরিবর্তন না করে, যাতে মধ্যবর্তী সময়ে সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট স্তর থেকে নিচে নেমে যায়।

লেখক: দ্য কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের পলিসি প্ল্যানিংয়ের সাবেক পরিচালক
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

অশ্রুসিক্ত স্মৃতি তর্পণ 

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নদী খনন না হওয়ার পরিণতি 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সোনালি যুগের রুপালি বাজেট

কিশোর অপরাধপ্রবণতা ও প্রতিকার

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না

ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে তিনি বারবার ফিরে আসবেন