বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিমিতি বচনই শ্রেয়

আপডেট : ১৫ মে ২০২২, ০৬:৫৪

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কিছুটা কমিয়া আসিলেও পুরাপুরি শেষ হয় নাই। কোভিড মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধের তাণ্ডব, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধিঞ্চু বাণিজ্যঘাটতি, উত্পাদন-যোগান-বিপণন ব্যবস্থার ভগ্নদশা বিশ্বব্যাপী মানুষের অবস্থা কাহিল করিয়া তুলিয়াছে। নাভিশ্বাস উঠিতেছে সাধারণ মানুষের। স্বভাবতই এই সকলের আঁচ আসিয়া লাগিতেছে দেশের অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সমগ্র দেশে হইচই ফেলিয়াছে, যদিও এই সকলের পক্ষেবিপক্ষে স্ব স্ব যুক্তি দাঁড় করাইতে দেখা গিয়াছে। দেশব্যাপী ভোজ্য তৈলের মূল্যবৃদ্ধি লইয়া অস্থিরতার মধ্যেই পেঁয়াজ ‘নূতন ইস্যু’ হইয়া উঠিয়াছে। আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাহিদার সমপরিমাণ মজুতহেতু ঘাটতি না পড়িবার কথা থাকিলেও ঝাঁঝ ছড়াইয়া বাজারকে উত্তপ্ত করিতেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্য। সপ্তাহ ব্যবধানে ১৫-২০ টাকা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে ‘কৃষকের নাঘ্য দাম’ পাওয়ার যুক্তি দাঁড় করানো হইলেও ইহাতে কারসাজির গন্ধ খুঁজিতেছেন অনেকে।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত করিয়া তুলিবার ক্ষেত্রে ‘পিঁয়াজ ইস্যু’ এই বারই নূতন নহে। ২০১৯ সালের শেষার্ধে ভারত হইতে পিঁয়াজের আমদানি বন্ধ হইয়া দেশের বাজারে হুহু করিয়া মূল্য বৃদ্ধি পাইয়া নিম্ন-মধ্যবিত্তের হাপিত্যেশ বাড়াইয়া তুলিয়া ছিল। ২৮০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির ফলে বেসামাল পরিস্থিতি মোকাবিলায় আকাশ ও নৌপথে বিভিন্ন দেশ হইতে পিঁয়াজ আনিতে হয় সেই সময়। পিঁয়াজ উত্পাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে থাকিলেও আমদানিতে শীর্ষে রহিয়াছে বাংলাদেশ। প্রতি বত্সর ৩৫ লক্ষ টনের মতো চাহিদার বিপরীতে আমদানি করিবার দরকার পড়ে ৫ লক্ষ টনের আশেপাশে, যাহার ৯০ শতাংশের অধিক আসে পার্শ্ববর্তী ভারত হইতে। দেশের বাজারে পিঁয়াজ উত্তাপ ছড়াইলে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠিয়া আসে ভারত হইতে আমদানি করা-না করাসংক্রান্ত বিষয়। কারণ, ভোজ্য তৈলের মূল্যবৃদ্ধিতে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ জানিতে পারা গেলেও অন্তত পিঁয়াজের প্রশ্নে মোটাদাগে ভারত, মিয়ানমার এবং বড়জোর তুরস্ক ছাড়া আর কাউকে জড়াইবার উপায় নাই।

দেশের কৃষকের স্বার্থে পিঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হইয়াছে বলিয়া বলা হইতেছে। কৃষককে ন্যায্যমূল্যের সুবিধা করিয়া দিতে এই উদ্যোগকে উপেক্ষা করিবার সুযোগ কম। ‘কৃষক বাঁচিলে দেশ বাঁচিবে’ বলা এ যাবত্কালের স্লোগানকে বাস্তবরূপে ফিরাইয়া আনিবার প্রচেষ্টা আশার সঞ্চার ঘটাইবে কৃষকদের মধ্যে। ভালো মূল্য পাইবার আশায় পিঁয়াজ চাষে কৃষকদের আগ্রহের কারণে গত বত্সর উত্পাদন বাড়িয়াছে আট লক্ষ টন। এইরূপ ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে পারিলে সুফল মিলিবে। তবে এবারের অকস্মাত্ মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসাবে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাইয়া দেওয়ার যুক্তি খাঁটিতেছে না এখনই; আমদানি বন্ধ থাকিলেও আগামী তিন মাস পিঁয়াজের ঘাটতি নাই বলিয়া খবর আসিতেছে। এই সকলের মধ্যেই ঘোষণা আসিয়াছে, মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়া প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হইলেও ভারত হইতে পিঁয়াজ আমদানি না করিবার চেষ্টা চলিবে। অতীতের ঘটনা পর্যালোচনায় পাওয়া যাইতেছে, প্রতি বারই মূল্যবৃদ্ধি ঘটিলে প্রথমে কৃষকের ন্যায্যমূল্যের সুযোগ দানের বিষয় টানা হয়। ইহার পর কোনোক্রমেই আমাদানি না করিবার ‘পণ’ উঠে। অথচ চূড়ান্ত ফলাফলে, দেশের বাজারকে উত্তপ্ত করিয়া, জনগণের ভোগান্তি বাড়াইয়া তড়িঘড়ি আমদানিতে বাধ্য হইতে হয়। এই প্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট দেশের নামোল্লেখ করা হইতেছে কেন? যেখানে সস্তা পাওয়া যাইবে সেখান হইতেই আমদানি করিতে হইবে।

বিশ্ববাজারে টালমাটাল অবস্থা। ক্ষণে ক্ষণে নূতন নূতন মোড় লইতেছে বিশ্বব্যবস্থা। বিশ্বের সহিত তাল মিলাইতে পারাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের ঘটনাগুলিকে ভুলিয়া গিয়া দেশের বাজারে হইহই রব ফেলিবার প্রাক্কালেই আমদানি করা-না করার প্রশ্নের উত্তর মিলাইতে ব্যতিব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাইতেছে! অন্য সকল জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি লইয়া বিস্তর আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে আগ বাড়াইয়া এহেন কথাবার্তা বিপত্তি ডাকিয়া আনিতে কতক্ষণ! কথাবার্তায় পরিমিতিবোধের সংস্কৃতি আবশ্যক। উহা আমলে লইতে হইবে। কোন পরিস্থিতিতে কী ঘটিতে চলিতেছে, কে বলিতে পারে। বরং ধর্ম নির্দেশনায় বলা হইয়াছে— ‘আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তোমার আওয়াজ নিচু কর; নিশ্চয় স্বরের মধ্যে গাধার স্বর সর্বাপেক্ষা শ্রুতিকটু-অপ্রীতিকর’।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

লিজেন্ডদের জানিতে হয়—কখন থামিতে হইবে

পার্কগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন

নিজের সীমানা জানিতে হইবে

কার্ড জালিয়াতি ও ব্যাংক গ্রাহকদের উদ্বেগ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অ্যান্টিবোয়োটিকের কার্যকারিতা হারাইতেছে

সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা!

‘কাঁটা তুলে তুলে’ চলা জীবনের অবসান

স্বাধীনতা কি এত সহজ?