শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১০ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইউক্রেন যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ শেষ পরিণতি

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ০২:০০

গত সপ্তাহে ইউক্রেন যুদ্ধের ধোঁয়াশা কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। গত ৯ মে হচ্ছে এর উল্লেখযোগ্য তারিখ। এদিন হিটলারের জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় উদ্যাপন করা হয়। রাশিয়ার কৌশলগত কোনো পরিবর্তন ছাড়াই দিনটি এসেছিল, আবার চলেও গেছে।

ভ্লাদিমির পুতিন যখন সামরিক কুচকাওয়াজ ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিদর্শন করতে বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ইউক্রেনের যুদ্ধ জয়ের কোনো ঘোষণা ছিল না বা যুদ্ধ সম্প্রসারণেরও কোনো ঘোষণা ছিল না। এতে বোঝা যায়, ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার আগের নীতিই বহাল রয়েছে। সমস্ত রাশিয়া যুদ্ধের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন ফ্রন্টের জন্য যে গণনিয়োগ শুরু করেছিল, তা অব্যাহত রয়েছে। একইভাবে রাশিয়ার পরিকল্পনা দেখে মনে হচ্ছে, ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে তারা মরণপণ লড়াই অব্যাহত রাখবে। যুদ্ধের মাধ্যমে ইউক্রেনের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যটি এখন দখলকৃত ভূখণ্ড ধরে রাখার লক্ষ্য হিসেবে আবিভূ‌র্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই দখলকৃত ভূখণ্ড রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একীভূত হতে পারে।

আমেরিকান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি কৌশলগত প্রমাণের মতো দেখায়। রাশিয়ার লক্ষ্যবস্ত্ত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের কিছু বেপরোয়া দাম্ভিকতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা ক্রমাগতভাবে ইউক্রেনের জন্য আমাদের সমর্থন বাড়িয়েছি, যার মধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ রয়েছে। সম্ভবত আগামী সপ্তাহে সিনেটে এটি পাশ হবে। এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে এটি যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধিকে আরো উসকে দিতে পারে। এই প্রক্সি যুদ্ধ মস্কোকে একটি বৃহত্তর সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে উত্সাহিত করবে এমন ঝুঁকির কথা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টিভিতে ক্রমাগতভাবে প্রচার করা হচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত তা ক্রেমলিনের প্রকৃত পছন্দের মধ্যে নেই। আমাদের অস্ত্র ইউক্রেনে সরবারহ করা হোক, পুতিন নিঃসন্দেহে তা পছন্দ করেন না। তবে তিনি আরো অস্তিত্বের ঝুঁকিতে জুয়া খেলার পরিবর্তে এই শর্তেই (বৃহত্তর সংঘাতের দিকে না গিয়ে) যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে।

যা হোক, আমাদের সাফল্য নতুন কৌশলগত দ্বিধা তৈরি করেছে। পরবর্তী ছয় মাসের যুদ্ধের জন্য দুটি দৃশ্যকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রথম দৃশ্যকল্পটি হলো, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ভূখণ্ডগত দর-কষাকষি কিছুটা বাড়বে এবং যুদ্ধটি ধীরে ধীরে একটি ফ্রজেন কনফ্লিক্ট বা ‘হিমায়িত সংঘাতে’ রূপান্তরিত হবে। নিকট অতীতে সংঘটিত রাশিয়ার অন্যান্য যুদ্ধ থেকেও একই শৈলী পরিলক্ষিত হয়।

এই পরিস্হিতিতে যে কোনো স্থায়ী শান্িত চুক্তির জন্য সম্ভবত ক্রিমিয়া ও ডনবাসের কিছু বিজিত অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করে নিতে হবে, এখানকার স্হল সেতুসহ বেশির ভাগ স্থাপনা এখন রাশিয়ান বাহিনীর দখলে রয়েছে। ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর কারণে রাশিয়া অনেক কিছুই হারিয়েছে। এ দুটি অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মেনে নেওয়া হলে এটা হবে মস্কোর জন্য একটা স্পষ্ট পুরস্কার। কতটা ভূখণ্ড ছাড়তে হবে তা দর-কষাকষির ওপরই নির্ভর করবে। তবে সামরিক সাফল্য সত্ত্বেও এটি ইউক্রেনকে খণ্ডবিখণ্ড ও দুর্বল করে দেবে।

তাই এ ধরনের চুক্তি কিয়েভ, ওয়াশিংটন বা উভয় ক্ষেত্রেই অগ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর বিকল্প পন্থা কী? এর ফলে একটি স্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হবে, এতে একটি স্বল্পমাত্রার যুদ্ধে ফিরে আসার জন্য প্রস্ত্তত হতে হবে। তবে এই পরিস্হিতিও ইউক্রেনকে বিকৃত ও দুর্বল করে দেবে। পশ্চিমা অর্থ ও সামরিক সরঞ্জামের স্রোতের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইউক্রেন পুনর্নির্মাণের কাজে তাদের সক্ষমতা হ্রাস পাবে।

ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনপম্হি ইউনাইটেড ফ্রন্ট কিছুটা ভেঙে পড়েছে। আমরা যেসব সাহাঘ্য পাঠাচ্ছি, তাতে সমালোচনা বাড়ছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট নয় যে, বাইডেন প্রশাসন বা জেলেনস্কির সরকার একটি শীতল দ্বন্দ্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিনিয়োগ করাকে বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করবেন। এর জন্য আমেরিকার দুটি দলের টেকসই সমর্থন প্রয়োজন এবং সম্ভবত শিগ্গিরই ডোনাল্ড ট্রাম্প বা রন ডিসান্টিস প্রশাসনের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

তবে আরেকটি দৃশ্যকল্প আছে, যেখানে এই দ্বিধা হ্রাস পেতে পারে। কারণ এতে ইউক্রেনের পক্ষে অচলাবস্থাটি ভেঙে যায়। এটি এমন এক ভবিষ্যত্ তৈরি করবে, যা ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী দাবি করে আসছে। তাদের দাবি হলো, তাদের পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তা ও হার্ডওয়্যার দেওয়া হোক, যাতে তারা তাদের সীমিত পালটা আক্রমণগুলো বড় আকারে পরিণত করতে সক্ষম হয় এবং রাশিয়ান বাহিনীকে কেবল পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের বাইরে ঠেলে দিতে পারে।

স্পষ্টতই ইউক্রেনের এটিই ভবিষ্যত্, আমেরিকার এটিই চাওয়া উচিত। এছাড়া রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বৃদ্ধির আশঙ্কা এখনকার চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে।

আমরা জানি, রাশিয়ার সামরিক মতবাদ অনুযায়ী, রাশিয়ার পরাজয় ঘনিয়ে এলে প্রতিরক্ষামূলকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কৌশলকে তারা প্রাধান্য দিতে পারে। ইউক্রেনে পুরোপুরি হেরে যাওয়াকে পুতিন ও তার মিত্ররা নিজেদের শাসন-রাজত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে বলেই আমাদের ধরে নেওয়া উচিত। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অপ্রত্যাশিত পরাজয় এবং তাদের আঞ্চলিক চাওয়া-পাওয়া চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার বিষয় দুটিকে একসঙ্গে মেলানো হলে তা ১৯৬২ সালে কিউবার বিপক্ষে আমাদের নৌ অবরোধের মতো বাস্তব বিষয়ের সঙ্গে মিলে যায়, যার মাধ্যমে একটি পারমাণবিক ছায়াযুক্ত সামরিক পরিস্হিতির গন্ধ মেলে।

আমেরিকার ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির তিনজন বৈদেশিক নীতিবিষয়ক চিন্তাবিদ এলব্রিজ কোলবি, রেবেকা হেনরিচ ও জ্যাকব গ্রিগিয়েলের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ার পর থেকে আমি এই দ্বিধাগুলোক উড়িয়ে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রতি আমাদের সমর্থন বৃদ্ধির ভিত্তিতে এই প্যানেল মূলত ঐক্যবদ্ধ ছিল। তবে যুদ্ধের শেষ খেলা এবং পারমাণবিক বিপদের প্রশ্নে দেখতে পাচ্ছি, আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। গ্রিগিয়েল পূর্বাঞ্চল ও কৃষ্ণসাগরের উপকূলরেখা বরাবর ইউক্রেনের পুনরুদ্ধার করা অঞ্চলের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।  কিন্তু তা আরো বেশি বীভত্স হয়েছে। ইউক্রেনের দ্রুত অগ্রগতি যখন রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক হামলার প্রশ্নটি সামনে আনছে, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত তা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হচ্ছে।

ইউক্রেন যদি যুদ্ধে জিতে যায়, তবে তা একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠবে। তবে এই প্রশ্ন এখনো ততটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি আমাদের জন্য। কিন্তু পালটা আক্রমণের জন্য যেহেতু আমরা ইউক্রেনীয়দের একটি মাত্রায় সশস্ত্র করে তুলছি, আমার দৃঢ়ভাবে মনে হয়, সরকারের উচ্চপর্যায়ে কোলবি-হেনরিক্সের একটি সংস্করণ ঘটছে, যা এখনকার একটি প্রাথমিক সমস্যা। তবে এ সমস্যা সারা বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সিনিয়র এডিটর, দ্য আটলান্টিক।

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমরা পারি-আমরাই পারি

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

আসুন, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পদ্মাকাহন: আমাদের স্বপ্ন সেতু

সাফল্য-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রা

একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

বার কাউন্সিলের নেতৃত্ব