শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১০ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বর্তমান সংস্করণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অনিরাপদ!

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১১:০৩

মেশিন লার্নিং, বিগডেটা এবং সম্ভাব্যতা নিরূপণকারী প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) সিস্টেমের ব্যবহারকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। প্রধানত, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফৌজদারি আদালতে প্রবেশন, জামিন, সাজার মেয়াদ নির্ধারণ ও অপরাধপ্রবণতা নিরূপণে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রযুক্তির বিস্ময়কর আবিষ্কার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম আদালতে ব্যবহার করে কতিপয় বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার এরূপ যান্ত্রিক ব্যবস্হাকে অপরাধীর ঝুঁকি অ্যালগরিদম মূল্যায়ন বলা হয়ে থাকে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এ প্রযুক্তি আদালতে ব্যবহারের পেছনে একটি বড় যুক্তি হলো— এটি মানুষের বিচার, যুক্তি ও সিদ্ধান্তের সহজাত পক্ষপাত এবং গোপন বৈষম্য দূর করে ফৌজদারি আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। কেননা, যেহেতু কম্পিউটার মানুষ নয়, কম্পিউটার বা মেশিনের সেই সমস্যা নেই, যা মানুষের আছে। তবে, প্রযুক্তি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ— এই বিতর্ক পুরোনো হলেও আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিমণ্ডলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

অনেক ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও আদালতে ব্যবহার্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। দেশের অধস্তন আদালতের এক বিচারকও তার গবেষণায় এমনটিই দাবি করেছেন। রাজশাহীর সহকারী জজ মো. আব্দুল মালেক ফৌজদারি আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে আইন ও বিচার, প্রযুক্তিনীতি ও নৈতিকতার সংমিশ্রণে এক আন্ত-বিষয়ক গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করেছেন, যা ইতিমধ্যে স্বনামধন্য Springer Nature-এর ‘AI & Ethics’ নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অপরাধীকে প্যারোলে বা প্রবেশনে মুক্তি দেওয়া যাবে কি না, আসামি জামিনে মুক্তি পেলে সে সমাজে ফিরে আবার অপরাধ করার আশঙ্কা আছে কি না, অথবা জামিনে মুক্ত আসামি নিয়মিত আদালতে শুনানিকালে হাজির হবে কি না, এবং প্রমাণিত অপরাধের দণ্ডের মেয়াদ কত হবে, এমন সব প্রশ্নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত ‘রিস্ক আসেসমেন্ট অ্যালগরিদম’ আদালতকে স্বয়ংক্রিয় সংকেত প্রদান করে থাকে। এরূপ অ্যালগরিদমের স্বয়ংক্রিয় সংকেত কীভাবে মানুষ্য বিচারককে নানাভাবে প্রযুক্তিগত পক্ষপাত ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে প্রভাবিত করে, এ গবেষণায় এমন সব বিষয় নিবিড়ভাবে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এ গবেষণা প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে যে, আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদপুষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত এমন অভিনব যন্ত্রগুলোতে অগণিত ‘ডেটা’ ইনপুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়; এগুলো অতীত সমাজে বিদ্যমান পক্ষপাত ও বৈষম্যমূলক ডেটা, যা অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধমূলক ইতিহাস, বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক ও পারিবারিক সম্পর্ক, জীবনযাত্রার মান ও শিক্ষা, ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে থাকে। এরূপ কলুষিত ডেটা ব্যবহারের ফলাফল সম্পর্কে বিচারক আব্দুল মালেক দাবি করেন যে, যেহেতু এমন ডেটা বা তথ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমে ব্যবহার করা হয়, সেহেতু এ সিস্টেমটি অনিবার্যভাবে ডেটা-প্রতিফলিত পক্ষপাত ও বৈষম্যমূলক আচারণ করবে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে এ ধরনের কিছু সিস্টেমে ১৮০টিরও বেশি বিভিন্ন প্রকারের পক্ষপাত চিহ্নিত করেছেন। ফৌজদারি বিচারব্যবস্হার প্রাসঙ্গিকতায় প্রযুক্তিগত পক্ষপাত, নমুনা পক্ষপাত, প্রতিনিধিত্ব পক্ষপাত, অটোমেশন পক্ষপাত, নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত, ডেটাসেট পক্ষপাত, অ্যাসোসিয়েশন পক্ষপাত এবং মিথস্ক্রিয়ার পক্ষপাতের মতো নানাবিধ পক্ষপাতসমূহ ও তার প্রভাব নিয়ে অন্বেষণ এবং পরীক্ষা করা হয়েছে এ গবেষণাপত্রে। এছাড়াও বিষয়ববস্তু আলোচনায়, আমেরিকার বিখ্যাত লুমিস কেস (২০১৬) ও আদালতের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এই গবেষক মনে করেন যে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্হায় এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ওপর বিচারকদের নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে যান্ত্রিক পক্ষপাতিত্ব, শ্রেণিবৈষম্য এবং গণকারাবাসের মতো অবাঞ্ছিত ফলাফল বয়ে আনতে পারে। ফলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মূল্যায়ন যন্ত্র বিপুল পরিমাণ ডেটা নিমেষে বিশ্লেষণ করে মানুষের চেয়ে অধিক নিরপেক্ষ, নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ, ও পক্ষপাতহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে মর্মে বিভিন্ন মহলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তিনি তার প্রতিউত্তর প্রদান করেছেন তার গবেষণায়। পাশাপাশি, আদালতের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উন্নত-প্রযুক্তি ব্যবহারের দরুন সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য উপায় যুক্তিসহ উপস্হাপন করেছেন এই বিচারক গবেষক। এ গবেষণা মতে, অন্ধভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার না করে বরং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, ব্যাখ্যাযোগ্যতা, পদ্ধতিগত ন্যায়পরায়ণতা, প্রতিষ্ঠিত বিচারিক নীতি-নৈতিকতা এবং আইনি মূল্যবোধের আলোকে নতুন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি আবিষ্কার করার দিকে মনোযোগ দেওয়া সমীচীন।

বাংলাদেশি কোনো অধস্তন আদালতের বিচারক হিসেবে এমন জটিল ও আন্ত-বিষয়ক গবেষণা সম্পন্ন করা এবং তা বিশ্বমানের একটি জার্নালে প্রকাশ করা সত্যিই যেমন অনেক চ্যালেঞ্জিং, তেমনি অনেক আনন্দেরও বটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিচারাঙ্গণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও তার প্রভাব বিষয়ক এই গবেষণা শুধু বাংলাদেশ নয়, হাল বিশ্বে চলমান এআই প্রযুক্তি নিয়ে নানামুখী বিতর্কের এক অনবদ্য অংশ। সুতরাং, বাংলাদেশ সহ ফৌজদারি আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে আগ্রহী সকল দেশের জন্য এ গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। অধিকন্তু, এ ধরনের প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যবহার ও গবেষণাসহ বিচার প্রশাসনের নীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে আসবে বলে আমি মনে করি।

লেখক: এলএলএম (আইটি ল’ অ্যান্ড পলিসি) ও লিগ্যালটেক গবেষক, ইউকে

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমরা পারি-আমরাই পারি

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

আসুন, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পদ্মাকাহন: আমাদের স্বপ্ন সেতু

সাফল্য-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রা

একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

বার কাউন্সিলের নেতৃত্ব