শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

উলটা বুঝিলি রে!

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১১:৪১

পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা আকাদেমি’ এ বছর থেকে একটি বিশেষ পুরস্কার চালু করল। পুরস্কারটি সবিশেষ অভিনব। প্রতি তিন বছর অন্তর এই পুরস্কারটি এমন একজন কৃতী মানুষকে দেওয়া হবে, যিনি সাহিত্য বাদে জীবনের অন্য ক্ষেত্রে তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি রাজনীতিবিদ হতে পারেন, খেলোয়াড় হতে পারেন, বিজ্ঞানী বা ডাক্তার হতে পারেন, ইঞ্জিনিয়ার বা উকিল হতে পারেন বা আর কেউ হতে পারেন। একজন অভিনেতাও হতে পারেন। বিশেষ খ্যাত পক্ষীবিশারদ, কুস্তিগীর বা একজন সন্তুরবাদকও হতে পারেন। সেই সঙ্গে তিনি যদি সাহিত্য অনুরক্ত হয়ে সাহিত্যসাধনা করে চলেন, তাহলে তার এই সেকেন্ড ‘প্যাশন’কে এই বিশেষ পুরস্কারটির দ্বারা সম্মানিত করা হবে। মাঝেমধ্যে লেখাটেখা করেছেন, এরকম নয়; সাহিত্যের সাধনাটি যেন শখ করে দুদিন করেছেন, এমনটি কিছুতেই না হয়— ফের বলছি, সাহিত্যের এই সাধনায় তাকে নিরলস হতে হবে। এই ভাবনাটি যার মাথায় জন্মেছে তার নাম ব্রাত্য বসু। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এবং বাংলা আকাদেমির সভাপতি। তিনি নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, সিনেমা পরিচালক, নাটক-থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেতা; তিনি ঔপন্যাসিক, কবি এবং সারবান সাহিত্যের স্রষ্টা। তার মতো বহুমুখী প্রতিভা এ যুগে বিরল। শিল্পের এই বহুমুখিতার কারণেই এই ধরনের একটি অভিনব পুরস্কারের কথা তার মাথায় এসেছে বলেই আমি মনে করি।

কিন্তু মমতা? ছাত্ররাজনীতি দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল— আজ তিনি সৃজনশীল রাজনীতিতে বিশ্বসম্মানের অধিকারী। রাজনীতি তার অন্তর্গত রক্তের মধ্যে খেলা করে— সেই মমতাই আজীবন কবিতা লিখে আসছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যােপাধ্যায়কে এই পুরস্কারিট অর্পণ করেছে বাংলা আকাদেমি— তিনিই এই পুরস্কারের প্রথম প্রাপক। এই সিদ্ধান্তে আকাদেমির ভুল কোথায়?

মজার ব্যাপার এই যে, মমতা বন্দ্যােপাধ্যায়ের জীবনের সকল প্রাপ্তি ও সাফল্যকেই সন্দেহের চোখে দেখেছেন বাংলার কিছু মানুষ— বিশেষ করে বামপন্থিদের একাংশ। বরাবর তারা মমতাকে হেয় করেছেন। নানানভাবে অপদস্থ করেছেন। বামদের উগ্র অত্যাচারের চিহ্ন মমতা তার সর্বাঙ্গে বহন করেছেন আজও। আন্দোলনরত মমতাকে চুলের ঝুঁটি ধরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে বাম আমলের রাজশক্তি। তিনি প্রত্যেক দিন অন্তত ১৫ কিলোমিটার পথ হাঁটেন— কারণ তার অত্যাচারক্লিষ্ট দেহটিকে সচল রাখার এটিই স্বাস্থ্যকর উপায়। এসব কথা পথ হাঁটতে হাঁটতে সহপথিক আমাকেই শুনিয়েছেন মমতা।

সেই বামদেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ মমতার এই পুরস্কার পাওয়াতে সবচেয়ে অপ্রসন্ন হয়েছে এবং তিনি কবি হিসেবে কত যে অযোগ্য তারই প্রচারে কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে চলেছে। মনে রাখতে হবে সব বামপন্থিই এই অবিবেচক প্রচারে শামিল হননি।

কিন্তু আমাদের এ কথা ভেবে খারাপ লাগছে যে আমরা আকাদেমির নির্বাচক কমিটির সদস্যরা তাকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করার যে ভিত্তিটি তুলে ধরেছি তার যথার্থ বুঝে নিতে নিতান্ত ভুল করেছেন। এ হয়তো আমাদেরই অক্ষমতা।

আর পাঁচটি সাহিত্য পুরস্কারের সঙ্গে এই বিশেষ পুরস্কারটির মাপকাঠিরই কিছু পার্থক্য আছে— অন্য ক্ষেত্রের কৃতী মানুষটি কবিতা বা সাহিত্য রচনায় কতদূর উত্কর্ষ দেখাতে সমর্থ হয়েছেন সেটাই শুধু বিবেচ্য— এ পুরস্কার তেমন নয়। মমতার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি একজন রাজনীবিদ ও অপরাজেয় নেত্রীর কি কোনো কবিমন আছে; তিনি কি ছন্দ-রচনায় দক্ষ? তার রাজনৈতিক মূল্যবোধ আর তার কবিতা কি কোথাও একই সুরে ঐকতান রচনার চেষ্টা করেছে?

‘কবিতাবিতান’ কাব্য সংগ্রহের জন্য মমতা বন্দ্যােপাধ্যায়কে এই সম্মান দেওয়া হলো। বইটির ভূমিকায় লেখিকা যা লিখেছেন তার দুটি লাইন এখানে তুলে দিচ্ছি; মমতা জানিয়েছেন, ‘চিরকালই প্রকৃতি আমার প্রিয়। একদিকে প্রকৃতি অন্যদিকে প্রতিবাদী আন্দোলনের আন্দোলিত চেহারা মাঝে মাঝে উঠে এসেছে বিভিন্ন কবিতার মাধ্যমে।’

একদিক থেকে দেখতে গেলে আমার বিচারে মমতা তার কবিতার মধ্য দিয়ে আত্মচরিতের খণ্ড খণ্ড ছবি এঁকেছেন; তার এক ধরনের স্মৃতিকথাও বটে এই বই। সব কবিতা সমান নয়, দুর্বল লেখাও আছে। কিন্তু উত্কৃষ্ট কবিতাও কিছু মিলবে। সেখানে মমতা পুরোপুরি সফল কবিও বটে। যেমন ‘একা’ নামের কবিতাটি; মতবাদের দাসত্ব না করে কেউ যদি প্রকৃত গুণগ্রাহী মন নিয়ে কবিতাটি পড়েন, তাহলে বুঝবেন, এ কবিতা সত্যিকারের সুন্দর ও আসল জীবনবোধের কবিতা—এখানে মমতাকে আশ্চর্য চিত্রকল্পে উত্তীর্ণ জীবনসত্তায় পাওয়া যায়।

চাঁদের যে কোলতারা যাকে আমরা সন্ধ্যাতারা বা সাঁঝতারা বলে জানি, সেটাই রাত্রি শেষে পুব আকাশে শুকতারা হয়ে জাগে, সেটাই বস্ত্তত শুক্র গ্রহ, আমার সাহিত্যে এটাই জহুরা নক্ষত্র। লোকপ্রবচনে চন্দ্রমার ক্রোড়তারকা। তাকেই মমতার মনে হয়েছে ক্যাসাবিয়াঙ্কা; একাই চাঁদের পাহারাদার; একনিষ্ঠ প্রহরী, এক আশ্চর্য সৈনিক—যা মমতার চোখে ধ্র‚বতারারও অধিক। মমতা পুরোপুরি রবীন্দ্র-নজরুল প্রভাবিত কবি; কিছু প্রভাবে রয়েছে সুকুমার রায় ও অন্নদাশঙ্কর রায়ের খেয়ালি রসের পদ্য রচনায় বা আবোল তাবোল লেখায়।

কিন্তু ‘একা’ কবিতাটি তারকা-চিত্রকল্পে গভীর ও মমতার আদর্শ ভাবনার প্রতীক কবিতা। কবিতাটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য অনুভূতির। ঐ তারাটি সাহিত্যে অনেক গল্প বয়ে এনেছে— যারা ও’ হেনরি পড়েছেন তারা ঐ তারকাটিকে ‘মিথিক্যাল স্টার’ (লোক তারকা) হিসেবেই জানেন। ও’ হেনরির গল্প গিফট অব দ্য মেজাইতে পারস্যের অগ্নি উপাসকরা ঐ তারকাকে উদিত হতে দেখেছিলেন বেথেলহেমের আকাশের দিগন্তে, যা যিশুর জন্মের সংকেত ঘোষণা করছিল— সেই তারকার ইশারা মেনেই যিশুর জন্য উপহার নিয়ে মরু-সরণি অতিক্রম করেছিলেন তারা। কবি তুষার রায় তার একটি কবিতার বইয়ের নাম রেখেছিলেন ঐ তারকার চিত্রকল্পের; নামটি ছিল ‘মরুভূমির আকাশে তারা’— কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন ‘সুচেতনা তুমি দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে— বিকেলের নক্ষত্রই জহুরা নক্ষত্র, যা এক মরু-গণিকার গল্পে মহিমান্বিত হয়েছে— ঐ রূপাজীবা তৃষ্ণার্ত এক সারমেয়-শাবককে জল দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন বলে সেই পুণ্যবলে মৃতু্যর পর নক্ষত্র হয়ে মরুর আকাশে ভাস্বর হয়ে ওঠেন—এটিই জহুরা নক্ষত্র ধর্মের কাহিনি। মমতা সেই নক্ষত্রকেই ক্যাসাবিয়াঙ্কার আত্মত্যাগের গল্পের সঙ্গে জুড়ে নিয়ে তার কবিতার আকাশে গড়ে তুলেছেন। তার রাজনৈতিক আদশের্র মধ্যে তিনি নিষ্ঠাবান একজন কাউকে খুঁজে চলেছেন বা হয়তো এটা তার নিজেকেই খুঁজে নেওয়ার প্রেরিত সংবেদন। ধ্রুবতারা যদি না-ই থাকে, তবু একা লড়বার প্রেরণাও তো অমানিশীথে ফুটে রয়েছে। দেখবার চোখ থাকলেই হলো।

মমতার কবিতার শেষের ম্ভবকটি আমরা উদ্ধৃত করব। তার আগে ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘ক্যাসাবিয়াঙ্কা’ নামের কবিতাটির মধ্যে বালক ক্যাসাবিয়াঙ্কার বীরোচিত আত্মত্যাগের ঘটনার কথা মনে করব। যুদ্ধজাহাজের ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ১৩ বছরের বালক, আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছে জাহাজটি, জ্বলন্ত ডেকের ওপর একা দাঁড়িয়ে রয়েছে সে, কারণ তার বাবা তাকে এখানেই ‘ডিউটি’ দিয়েছেন। বালকের পক্ষে বাবার আজ্ঞা না পেলে এখন থেকে সরে যাওয়া চলবে না— বালক ক্যাসাবিয়াঙ্কা চিত্কার করে বাবার কাছে থেকে আত্মরক্ষার অনুমতি চাইছে। পাচ্ছে না। কারণ বাবা বেঁচে নেই। জাহাজের নিচের তলায় মারা গেছেন।

তারপর ক্যাসাবিয়াঙ্কার কী হলো আমরা জানি। তার মৃতু্য যে পিতৃ অনুগত এক সৈনিকের মৃতু্য, তাও আমরা জানি। এই বালক তার জাতির কাছে বীরের সম্মান পেয়েছিল।

মমতা তার কবিতাটির নাম দিয়েছেন ‘একা’ ইংরেজি কবিতাটির প্রথম লাইনটি হলো—

The boy stood on the burning deck,
Whence all but he had fled.

রণক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাওয়ার ছেলে সে নয়। একা তো একাই লড়ে প্রাণ দেবে। এই মহত্ একাকিত্বই মমতার শক্তি। আমরা বাংলা আকাদেমির পুরস্কার নির্বাচকমণ্ডলী—মমতার এই একক প্রত্যয়কে সম্মানিত করেছি।

কবিতাটির শেষ স্তবকটি এ রকম

‘আবার তাকালাম চাঁদের দিকে

ভাবলাম তাকাবো ধ্রুবতারার দিকে

পেলাম না তার দেখা।

একাই একশো চাঁদের পাহারাদার

এক নির্ভীক সৈনিক একা ক্যাসাবিয়াঙ্কা

একটি মাত্র তারা।’

ধ্রুবতারা নেই। কিন্তু ঐ একটি শহিদ তারকা তো রয়েছে। মমতার নিছক বক্তব্যপ্রধান কবিতা ভালো না হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতি চিত্রে মমতা প্রকৃত কবিমনের অধিকারী। তবে মনস্তত্ত্বমূলক একটি কবিতার কথা আমি বলতে পারি, যেখানে মমতা ছন্দের দক্ষতায় ও তত্ত্বভাবনায় অত্যন্ত সকল। কবিতাটির নাম ‘দ্বিচারিতা’।

একভাবে দেখলে দ্বিচারিতাই মানুষ। মানবমনের অতলে তার আনাগোনার শেষ নেই। ছন্দ খেয়াল রেখে কবিতাটি পড়তে হবে। শেষে এ কথাই বলি, বরাবরই মমতাকে ভুল বোঝোটাই যেন বাঙালির দস্তুর। তার একটি ননসেন্স ভার্স বা খেয়ালি কবিতাকে দুর্বল রচনার চরম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় হলো। যারা এসব করলেন তারা মমতার সার্থক খেয়ালি রসের কবিতা পড়েননি।

লেখক: পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমরা পারি-আমরাই পারি

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

আসুন, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পদ্মাকাহন: আমাদের স্বপ্ন সেতু

সাফল্য-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রা

একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

বার কাউন্সিলের নেতৃত্ব