শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আমের আঁটি বর্জ্য নয়, সম্পদ

আপডেট : ১৭ মে ২০২২, ১২:০৪

দৈনিক ইত্তেফাকে গত ২৯ এপ্রিল (২০২২) প্রকাশিত হয়েছে ‘মূত্র বর্জ্য না সম্পদ’ শীর্ষক একটি কলাম। এ লেখাটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ লেখায় মূত্রকে বর্জ্য হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে জাপানের কারিগরি সহায়তায় কুমিল্লার কোটবাড়ীতে অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমি, বার্ড আশপাশের কিছু গ্রামে ইকো টয়লেট অবকাঠামো তৈরি করে প্রমাণ করেছে, মূত্র পানির সঙ্গে মিশিয়ে স্পে্র করে খেত-খামারে ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি মলও উৎকৃষ্ট সার হিসেবে ফসল উৎপাদনে ব্যবহূত হচ্ছে।

আমার দৃষ্টি অন্যখানে, সহজলভ্য আমের আঁটি বর্জ্য হিসেবে নয়, আমাদের জন্য তা বড় ধরনের সম্পদ হিসেবে ব্যবহূত হতে পারে। হতে পারে ভোগ্যপণ্য। দেশে বছরে ১৫ লাখ টন আমের খোলসের মধ্যে ৩ লাখ টনের ওপর অর্গানিক পণ্য শাঁস দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অনায়াসে যোগ হতে পারে। অথচ এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিককালে ভোজ্য তেলের বাজারে দেখা যাচ্ছে অস্থিরতা এবং আমদানির ওপর আমরা অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। উপরন্তু এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ আমের আঁটির শাঁস থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদন করে আমদানি প্রবণতা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য চাই গবেষণা, মনমানসিকতার পরিবর্তন, সঠিক ব্যবস্থাপনা, সর্বোপরি সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও অর্থায়ন।

আমের চাষ বর্তমানে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে আমের উৎপাদন ১৫ লাখ টন এবং বিশ্বে আম উৎপাদনে আমাদের অবস্থান সপ্তম। ১৫ লাখ টনের মধ্যে সাড়ে ৩ লাখ টন উৎপাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। একক হিসেবে বেশি আম উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। অবশ্য রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া প্রভৃতি জেলায়ও আমবাগান রয়েছে। বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বদৌলতে দেশের প্রায় সব জেলায় আম চাষের পরিধি বেড়েছে। আশার কথা, গত সাত-আট বছর থেকে বিদেশে সীমিত পরিমাণে হলেও আম রপ্তানি হচ্ছে। কৃষিপণ্য আম দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং ভবিষ্যতে এটি অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্যে পরিগণিত হতে পারে।

আম গবেষকদের মতে, ১৫ লাখ টন আম থেকে প্রায় ৩ লাখ টন আমের আঁটির শাঁস পাওয়া যাবে। বর্তমানে ৯৯ শতাংশ আমের আঁটি বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয় এবং গ্রাম ও শহরের রাস্তার অলিগলিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এক শতাংশেরও কম নার্সারিতে চারা উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। ফলে ৯৯ শতাংশ বর্জ্য হিসেবে না ফেলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। এতকাল এটি উপেক্ষিত থাকলেও এখন এটিকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। গবেষণার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে এবং গবেষণার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ। এ তিনটি প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত সামগ্রী গবেষণায় সাফল্য অর্জন করেছে। তারা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিনা মূল্যে উদ্যোক্তাদের হস্তান্তর করে থাকে। তবে বেসরকারি উদ্যোগেও গবেষণাকর্ম পরিচালিত হতে পারে।

অর্গানিক উপকরণ আমের আঁটি নানাভাবে আমাদের ফুড চেইনে ব্যবহূত হতে পারে। আঁটির শক্ত আবরণের ভেতরের শাঁস নিষ্কাশনে যে পেস্ট পাওয়া যাবে তার পরিমাণ কম করে হলেও ৩ লাখ টনের কাছাকাছি। সেটি অর্গানিক উপাদান আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বেকারিতে বিভিন্ন ধরনের বিস্কিট তৈরিতে এ পেস্ট ব্যবহূত হতে পারে। এমনকি এই অর্গানিক পেস্ট চকোলেট তৈরিতেও কাজে লাগানো যায়। এছাড়া মিষ্টি তৈরিতে এই পেস্ট যথেষ্ট কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় এ পেস্ট ব্যবহার করে বিস্কিট, চকোলেট ও মিষ্টি তৈরি করা হচ্ছে অনায়াসেই। শুনে আশ্চর্য লাগতে পারে যে, তারা বিদেশে এ পেস্ট রপ্তানি করছে এবং এর ভালো চাহিদা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাদের দেশে আমের উৎপাদন অনেক বেশি। আমরাও আমের আঁটি থেকে এসব পণ্য তৈরি করে রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটে কর্মরত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. আবু তালেব বিগত শতাব্দীর শেষে আমের আঁটির শাঁস থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হন। কিন্তু তার অকাল মৃতু্যর কারণে তার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার বলতে গেলে হারিয়ে গেছে। তারপর থেকে আর কোনো গবেষণার খবর আমার জানা নেই।

উল্লেখ্য, পরিত্যক্ত বর্জ্য পশুর হাড় সংগ্রহ করে দেশে বড় আকারে গড়ে উঠেছে জীবনরক্ষাকারী ক্যাপসুলের খোলস তৈরির ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানি। দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো সেই খোলস নিয়ে বিভিন্ন ক্যাপসুল তৈরি করছে, অর্গানিক সামগ্রী ব্যবহারের কারণে বিদেশেও এর চাহিদা রয়েছে এবং রপ্তানি হচ্ছে। আরো এক অপ্রচলিত কৃষিপণ্য চালের কুঁড়া দিয়ে ভোজ্য তেল উৎপাদন করা হচ্ছে এবং এটি বহুল প্রচলিত ভোগ্যপণ্য। দেশে বাজেটের আকার প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। বাজেট ঘাটতির মোকাবিলার জন্য অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে আমের আঁটিকে সম্ভাব্য মূল্যবান পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক 

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমরা পারি-আমরাই পারি

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

আসুন, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পদ্মাকাহন: আমাদের স্বপ্ন সেতু

সাফল্য-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রা

একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

বার কাউন্সিলের নেতৃত্ব