বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্ভোগ-দুর্যোগের শহর নয়, বাসযোগ্য সুন্দর শহর চাই

আপডেট : ১৮ মে ২০২২, ০১:২৪

এই শহর, জাদুর শহর, প্রাণের শহর ঢাকা রে...

এই শহর, জাদুর শহর, প্রাণের শহর আহা রে...

জনপ্রিয় আলোচিত ব্যান্ড ‘চিরকুট’-এর বিখ্যাত শ্রোতাপ্রিয় একটি গান রয়েছে এই শহরকে নিয়ে।

এখন বিশ্বের সবচেয়ে অপরিচ্ছন্ন শহর, সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শহর, বিশ্বের বাসের অযোগ্য শহর কিংবা দুর্ভোগের শহর, যানজটের শহর, ব্যয়বহুল জীবনযাপনের শহর প্রভৃতি তকমায় ভূষিত হয় আমাদের সবার প্রাণের শহর, প্রিয় শহর ঢাকাকে। এর চেয়ে কষ্টের অনুভূতি আর কী হতে পারে?

রাজধানী ঢাকাকে একটি সুন্দর উন্নতমানের নগরী হিসেবে গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র দারুণ সচেষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে মশক নিধনসহ দখলকৃত বিভিন্ন খাল উদ্ধারে দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র মহোদয় নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। যেগুলো ধীরে ধীরে হলেও নগরবাসীর জন্য সুফল বয়ে আনতে শুরু করেছে। উভয়েই নগরবাসীকে জঞ্জাল, সংকট ও সমস্যামুক্ত একটি বাসযোগ্য চমৎকার পরিবেশসমৃদ্ধ নাগরিক জীবন উপহার দিতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের দৌড়ঝাঁপ নগরবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। কিন্তু সমস্যায় জর্জরিত ঢাকার অবস্থা খুব একটা বদলায়নি। ঢাকার যানজট, জলজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে যে আশ্বাস দিয়েছিলেন দুই মেয়র, সেগুলো সমাধানে খুব বেশি অগ্রসর হতে পেরেছেন—এমন দাবি তারা করতে পারবেন না। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিকেই তারা জলজট বা জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং চেষ্টা করেছিলেন কিছু করার জন্য। এক্ষেত্রে তারা তেমন অগ্রসর হতে পারেননি। এটাও সত্যি যে, এ কাজগুলো দীর্ঘমেয়াদি। এ বছরও যদি ভারী বৃষ্টিপাত হয়, জলজট হওয়ার আশঙ্কাটাই থেকে যাবে। ফুটপাত পথচারীবান্ধব করার ঘোষণা দিয়েছিলেন দুই মেয়রই। কিন্তু এখনো ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই শহরে সারি সারি ভবন আর রাস্তাঘাটের বিস্তৃতি ঘটছে, কিছু কিছু এলাকার চাকচিক্য সৌন্দর্য বাড়ছে, তবে সেই তুলনায় বস্তির কোনো উন্নয়ন হয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—দুই সিটি করপোরেশনের খেলার মাঠগুলোর বেহাল অবস্থা খুব সহজেই চোখে পড়ে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মাঠগুলোর নজরদারি করার কেউ নেই। খেলার মাঠে নেই খেলাধুলার পরিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে ধানমন্ডি এলাকায় একটি খেলার মাঠকে নিয়ে দারুণ তোলপাড় হয়েছে। অবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে খেলার মাঠটি আবার শিশুদের খেলাধুলার জন্য ফিরে এসেছে তাদের কাছে। শিশু-কিশোররা খেলার মাঠের অভাবে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। যে কারণে কিশোরদের গ্যাং কালচারের দৌরাত্মে্য চরম নৈরাজ্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সংযুক্ত করে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ প্রথাগত দরপত্র আহ্বানের পরিবর্তে অনলাইনে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে করা হচ্ছে। এটা একটা পজিটিভ দিক সন্দেহ নেই। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি মেয়রের সাহসী পদক্ষেপের ফলে গাবতলী, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গা অবৈধ পার্কিংমুক্ত হয়েছে। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, কয়েক হাজার অবৈধ বিল বোর্ড উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছে, ময়লা আবর্জনা ফেলার হাজার হাজার ডাস্টবিন বসেছে পুরো নগর জুড়ে, সড়কে বসেছে আধুনিক এলইডি বাতি, সিটি করপোরেশন কতৃ‌র্পক্ষের ব্যবস্থাপনায় নগর জুড়ে অনেকগুলো গণশৌচাগার নির্মিত হয়েছে এবং এগুলো ঠিকঠাকমতো পরিচালিত হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য কয়েকটি ভবন নির্মাণের কাজ চলছে, পথে ঘাটে নিরাপদ স্বাস্থ্যসম্মত জীবাণুমুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে বিশেষ ধরনের প্রায় ৫০০টি গাড়ি বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে। এই সাফল্য এবং কৃতিত্বের জন্য দুই মেয়রকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ঢাকা দুই মেয়রের কাজকর্মকে জনগণ সমর্থন জানিয়েছেন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কাজে তারা এখনো পিছিয়ে আছেন। এজন্য সব কাউন্সিলরকে নিয়ে একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা হলে বড় বড় সমস্যাকে আর পাহাড়-পর্বতের মতো মনে হবে না, সহজেই সমাধান করা যাবে। দুই সিটি মেয়র নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে ঢাকা নগরীর বিদ্যমান সমস্যা সংকট অব্যবস্থা অনিয়ম অসুন্দর দূরীকরণে নানা অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তারা ঠিকই উপলব্ধি করেছেন কাজগুলো রাতারাতি করা সম্ভব নয়। এজন্য সময় লাগবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘আমাদের প্রিয় ঢাকা শহর এখন একটি দর্শনহীন, ভিশনহীন ও সমন্বয়হীন দূষিত নগরে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট নগরদর্শন, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ শহর নিয়ে আমাদের সামনে স্পষ্ট কোনো ভিশনও নেই। হিমশিম খাচ্ছে সিটি করপোরেশনগুলো। যত্রতত্র গড়ে উঠছে শপিং সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ বাণিজিক কার্যালয়। আবাসিক এলাকাগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ঝুলন্ত তারের নগরীতে পরিণত হচ্ছে শহরগুলো। মাস্টার প্ল্যানের বাইরে মার্কেটগুলোতে অননুমোদিত দোকানপাট তুলে অরাজকতা তৈরি করছে কিছু অসাধু চক্র। অল্প বৃষ্টিতেই নগরীর রাস্তাঘাট তলিয়ে যাচ্ছে, পানিবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। পানিবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের, নাকি ওয়াসার—তা নিয়ে চলে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। সাধারণত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে পারে না সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে। বিশেষ করে, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়মূলক কাজকর্মে নিয়োজিত এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আমরা সব সময়েই প্রত্যক্ষ করে আসছি। এটাকে উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাজকর্মে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতার অবসান ঘটাতে দুই মেয়েরই তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং দক্ষতার প্রয়োগ করবেন আশা করি। এই নগরীকে স্বপ্নের মতো সুন্দর, বাসযোগ্য এবং আরামদায়ক করতে প্রত্যেক নগরবাসীর নিজস্ব কিছু দায়িত্ব রয়েছে।

লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

ইত্তেফাক/ইউবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পাবেন

পদ্মা সেতু: শেখ হাসিনার সক্ষমতার স্মারক

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সততা ও সাহসিকতার প্রতীক পদ্মা সেতু

সাফল্য-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সত্যিই কি আমরা দেশকে ভালোবাসি?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল কারেন্সি

পিএসসির আধুনিকায়ন

‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’