শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আবরণ সরাও, একাদশ ভাষাশহিদের ইতিহাস দেখো

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ০৯:১০

সে এক দুর্বিষহ, মর্মস্পর্শী স্মৃতির গ্রীষ্ম। বর্ষা সমাগত, বৃষ্টি নেই। আকাশে গুড়ুম, গুড়ুম, বাতাসে পোড়া দেহের গন্ধ। এরই মধ্যে, পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু আর তার মন্ত্রিসভার সদস্য হুমায়ুন কবীরের অবিরাম চেষ্টায় মহাভারত রবীন্দ্রশতবর্ষ উদ্যাপনে ব্যস্ত। পূর্ববঙ্গেও কবিগুরুর স্মরণে প্রতিস্পর্ধী উৎসাহ আর তেজোদীপ্ত সমারোহের প্রবল হাওয়া। রাস্তায় নেমেছে যুক্তিময় মনীষা। রবীন্দ্রগানে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রুখতে, উৎকট অনুশাসন ভাঙতে। তাদের সাফল্যে, তাদের দুঃসাহসী ঐক্যে বঙ্গভুবন মোহিত। উজ্জীবিত। কিন্তু সীমান্েতর এপারে, দক্ষিণ আসামে ভাষিক সংখ্যালঘুকে, তাদের মাতৃভাষাকে গৃহচু্যত করতে বেপথে চালিত জনশক্তির একাংশ এককাট্টা। মুখ্যমন্ত্রী চালিহার ভুল সিদ্ধান্েত, প্রলুব্ধ হয়ে প্রথমে জাতিদাঙ্গা, ঘরে ঘরে অগ্নিসংযোগ, পরে গায়ের জোরে অসমিয়া চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে পরিবেশ উত্তেজিত, ধোঁয়াচ্ছন্ন। বৃহত্তর আসাম আলোড়িত।

ভাষা রক্ষার অঙ্গীকারে ৬২ সালের মে-জুন জুলাই জুড়ে দক্ষিণ আসামের গ্রাম শহর মুষ্টিবদ্ধ। ৬১ সালের ১৯ মে, শিলচর স্টেশন চত্বরে প্ররোচনাহীন সত্যাগ্রহীদের ওপর গুলি চালাল পুলিশ। লাশের পর লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ঘটনাস্হলে, গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে শহিদ হলেন ১১। পরে আরো তিন জন। তাদেরই একজন কমলা ভট্টাচার্য, মাতৃভাষার লড়াইয়ে বিশ্বের প্রথম নারী শহিদ।

নিহতদের বড় অংশ এক দশক, কিংবা এরও কিছুদিন আগে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থী। যারা পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী আর দেশ ছেড়ে আসামে এসেও ভাষা রক্ষার প্রহরী হয়ে প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, পরিবারের একমাত্র রোজগেরেকে হারিয়ে পঙ্গুপ্রায় যাপনকে বেঁচে থাকার অঙ্গ ভাবতে যাদের বাধ্য হতে হয়েছে। যাদের উত্তরাধিকারীদের অবদমিত ত্যাগের বিরাম নেই আজও। অনেকটা নিষ্প্রভ, দ্বিখণ্ডিত হলেও তাদের ত্যাগ আর অন্তর্জ্বালার শেষ কোথায়? বিদ্বেষের, ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীহত্যার রক্তাক্ত স্রোত এখনো অব্যাহত। ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত, বলবান রাজনীতির আগ্রাসি গুলিতে কেবল দক্ষিণ আসামের তিন জেলার মৃতু্যর সংখ্যা ১৪। বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলেও জাতিদাঙ্গায় বহুপক্ষীয় বাঙালির বলিও অসংখ্য। সমীক্ষা হয়নি, সম্ভবত এ সংখ্যা ৩ হাজার।

প্রশ্ন উঠতে পারে, নিহতের সব সংখ্যাকে, আত্মবিসর্জনকে, হিংসার অসংখ্য নিধনকে অতিক্রম করে মহান উনিশের স্মৃতি অমরতার পথ দিয়ে এখনো কেন হাঁটছে? তার প্রাণশক্তির, তার গৌরবময় ইতিহাসের উৎস কী? ২১শের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার? ভাষার মহিমাকে ধারণ করে আত্মাহুতির দ্বিতীয় অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বলেই কি? না আসামে ক্ষমতার ভাষাকে আরো বলবান, আরো আগ্রাসি, ক্ষমতাশীলের রাজনৈতিক অঙ্কের সমর্থক করে তুলতে, বাংলা সংস্কৃতি থেকে বাংলা ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করে বাঙালির ভাবাবেগকে খণ্ডিত, দ্বিখণ্ডিত করে সাম্প্রদায়িকতার বৃক্ষরোপণকে ছড়িয়ে দিতে কতিপয় ভাগ্যবানের সৌভাগ্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে এক দল মরিয়া। এ কারণেই কি অমর উনিশের মুখে আবরণ চড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এ কারণেই বারবার আচমকা আমাদের শিহরন বেড়ে যায়, আমাদের জাগৃতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

১৯ মে এলেই আমরা মেতে উঠি কোলাহলে। ১৯ মের স্মরণে সজল উচ্চারণে অসম, ত্রিপুরা খণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গের ভাষাচৈতন্য উৎসবের ধ্বনি জাগায়। তারপরেই স্তব্ধতা আর নিষ্প্রভ ভাবাবেগ। ভাষার ওপর বহিরাঘাত, তাত্ক্ষণিক আত্মাঘাত যত্কিঞ্চিত্ প্রতিবাদ ছড়িয়েই বরণ করে নিই আমরা। রুগ্ণ জাতির লক্ষণ। অবশ্যই অসুয়া চিহ্ন। বঙ্গভুবনে যেসব বাঙালি ৫২-র ভাষা আন্দোলন নিয়ে গর্বিত, স্মৃতিদীপ্ত, তাদের সতর্ক-অসতর্ক নীরবতার চেহারাও আশ্চর্য। বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানী, ইতিহাসবেত্তা, ইতিহাস বোধের নিখুঁত প্রহরী— সবার উদাসীনতা, উনিশের ঘটনা নিয়ে জানার সীমাবদ্ধতা প্রশ্নহীন নয়। দুই বাংলার ইতিহাসে এত বেদনাদায়ক, দিকদর্শী ত্যাগ কেন যথাযথ মূল্যায়ন আর সজল উচ্চারণের বাইরে থেকে যাচ্ছে? বিশ্বমানব হয়ে ওঠার অভিপ্রায় নিয়ে বাংলাদেশ কায়মনে বাঙালি হতে চাইছে। পশ্চিমবঙ্গও বিশ্ববঙ্গীয় ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিতে সমানভাবে উন্মুখ। ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু উনিশের ইতিহাসের শূন্যতা কেন বাড়িয়ে তুলছে মননের দূরত্ব? একুশের ভাষা আন্দোলন নিয়ে এই বাংলাও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একইভাবে বড্ড বেশি নীরব ছিল। ’৫২-র রক্তাক্ত অভু্যত্থান, শহিদ স্তম্ভের স্থাপনা এবং ভাষা আন্দোলন, গণ-আন্দোলনের ঐক্য আর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে, আত্মনিয়ন্ত্রিত, স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মিত না হলে একুশের এ মর্যাদা অর্জন কি সম্ভব হতো? ইতিহাস জারি করেছে নির্দেশ, জনতা সে নির্দেশকে মান্যতা দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার সহযোগীদের নেতৃত্বে স্বতন্ত্র বাংলাদেশ নির্মাণ করেছে।

বহুমাত্রিক হুমায়ুন আজাদ মহান একুশকে বাঙালির ইতিহাসে মহোত্তম ঘটনা বলেছেন। নিভু‌র্ল, সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত। ’৫২-র একুশ মানেই বাংলাদেশের জবরদস্ত ভিত। কথাটা আংশিক সত্য। সত্যের আরেক দিক, কবি আব্দুল হাকিমের চেতনার জাগরণ থেকে গাফ্ফার চৌধুরীর অশ্রুসিক্ত অনুভব পর্যন্ত, ভাষা আর ঐতিহ্যের ভাবনায় বাঙালি মুসলিমের যে সংশয়, যে দ্বিধা, যে লাগাতার আঘাত আর প্রত্যাঘাতের আবহ বিরাজ করত, তারই প্রথম নিরস্ত্র, সুচিন্িতত বিস্ফোরণের পটভূমি তৈরি হয় বায়ান্নর একুশে। রক্তরঞ্জিত, আত্মবিসর্জন ছাড়া বিকল্প উপায় ছিল না।

রক্তহীন, অহিংস অভু্যত্থানে বাঙালির আস্থা নেই। স্বাধীনতার সংগ্রাম, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, ভাষা রক্ষার সংগ্রামের মতো যে কোনো দিকনির্মাতা স্থাপনায় সশস্ত্র, সংগ্রামমুখর, সংহারপ্রিয় হয়ে ওঠা তার জাতীয় অভ্যাস। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে ’৭১-এ বাংলাদেশের উত্থান পর্ব, উত্থানের পরেও যোদ্ধা, কোলাহলময় বাঙালির এ বৈশিষ্ট্য এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। অসংগত। বরাক উপত্যকার ১৯শের সংগ্রামও, নিঃসন্দেহে তার লৌকিক, তার সংগ্রামরত বহুত্ববাদী যাপন আর স্লোগানহীন ঐক্যের, চিরায়ত সত্তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। একে নিঃশেষ করে দেওয়া, পরিকল্পিতভাবে খতম করার রাস্তা নেই। সে অশেষ, পরমায়ু নিয়ে সম্পন্ন। অতএব উনিশকে নব রঙে রাঙাতে হবে। তার ইতিহাস লিখতে হবে। খুঁজতে হবে তার সমৃদ্ধ পরিপ্রেক্ষিত।

বরাক দেশভাগ আর সাংস্কৃতিক বিভাজনের মর্মান্িতক শিকার। ইতিহাসে উপেক্ষিত। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, মানচিত্রে হতভাগ্য। একবার নয়, বারবার সে ভাগ হয়েছে। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক পর্ব অব্দি। আগের ভৌগোলিক পরিসীমায় তার প্রত্যাবর্তন দুষ্কর। তার পুঞ্জীভূত অভিমানকে, তার করুণ মুখাবয়বকে, আত্মকেন্দ্রিক মুষ্টিমেয় স্বার্থপরের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সাংস্কৃতিক আর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দাবিকে শিরোধার্য ভাবতে হবে। আবার লিখতে হবে তার ইতিহাস, তার জনপদের আস্তিক বৃত্তান্ত। যেহেতু বাংলাদেশের সীমান্েত তার অবস্থান এবং একই ভাষা সংস্কৃতির সহোদর, সমগোত্রীয় সমযাত্রী— এ কারণে অবিভক্ত সিলেটের পাশাপাশি বরাকের বৃত্তান্তকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বরাকে বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস অবশ্য পাঠ্য। একই ঐতিহ্যের ধারক বাংলাদেশে বিভক্ত সুরমা ও বরাক উপত্যকার ইতিহাসপাঠ ব্রাত্য হবে কেন? একই ঐতিহ্যের বাহক এবং ২১শের ভাষা আন্দোলনে উদ্দীপ্ত, সচকিত বলেই ১৯শের বিসর্জনের ইতিকথা বলা প্রয়োজন। তাকে নিয়ে উত্সব প্রয়োজন। প্রয়োজন তার জিজ্ঞাসামুখর সামাজিক চর্চা। নইলে আমাদের অপূর্ণতা, রুগ্ণতা বাড়বে। বাড়বে উসকানিপ্রবণ কবন্ধের অনুপ্রবেশ। আর তখনই ভারতীয় গণতন্ত্রের উদার সুষমার ত্রিভাষিক সূত্রকে অবজ্ঞা করে যুক্তিহীন, ক্ষমতামত্ত আগাছারা আরো বেশি ডালপালা ছড়াতে অতি উত্সাহী হয়ে উঠবে। এতে ওদেরও মুনাফার চেয়ে লোকসান বেশি। ভাষার প্রশ্নে ‘কল্যাণমুখর গণতন্ত্রের’ অভিনেতাদের নীতির সুস্পষ্টভ প্রয়োগ অপরিহার্য। কী তাদের অভিপ্রায়? পাকিস্তানের মতো একভাষিকতার আধিপত্য? না বহুভাষিক ভারতের বহুযুগীয় ঐক্য আর পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যাবহারিক সাফল্য? এক দেশ, এক ভাষা এক ধর্ম আধুনিক মানুষের ভাবনাচিন্তাকে, তার দেশপ্রেমকে, বস্তুনিষ্ঠ—নিরপেক্ষতাকে খুশি রাখতে পারে না। তার প্রাণ চায় যা, চোখ চায় তা। না হলে মরে সে লজ্জা আর আত্মপীড়নে। এই ভারত, এই উপমহাদেশ, প্রতিবেশী বাংলাদেশও এরকম একপেশে, সাংস্কৃতিশুষ্ক ভূখণ্ড আমাদের ঐতিহ্য চায়নি। চাইতে পারে না। বৃহতের এক প্রেমেরই সে সন্তুষ্ট। আত্মতৃপ্ত।

লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক। সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মানুষকে অনাহারে রেখে গাড়ির আহার!

বাজারে টিসিবি: দরকার মনিটরিং স্কোয়াড

বিশৃঙ্খলার যুগে মুক্তবাণিজ্যের ঝুঁকি

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ ও একটি অনন্য উদ্যোগ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

একজন মহিউদ্দিন আহমেদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউনসেলর নিয়োগ জরুরি

টাকার ধর্মই হচ্ছে অধিক মুনাফার দিকে ধাবিত হওয়া

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: সম্ভাবনার দুয়ারে বাংলাদেশ