মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

স্বাধীনতা কি এত সহজ?

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ০৯:২৫
স্বাধীনতার স্বাদ কে না চাহে! অনেকের মতে, স্বাধীনতা হইল এক আশ্চর্য পুতুল| এই পুতুলের নড়াচড়াকে আলো-আঁধারিতে স্বেচ্ছাকৃত বলিয়া মনে হয়| কিন্তু বাস্তবে সেই পুতুলের প্রত্যেকটি নড়াচড়া তৈরি হয় অন্তরালে বসে থাকা কোনো ব্যক্তির হাতে বাঁধা সুতার টানে| এইখানে সুতা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি প্রতীকী অর্থে|
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরিয়া বিশ্বের অসংখ্য দেশ স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে| কিন্তু সেই সকল দেশের মধ্যে কতগুলি দেশ প্রকৃত সার্থক রাষ্ট্র হইয়া উঠিয়াছে-তাহা হাতে গুনিয়া বলা যায়| যেই পাখি দীর্ঘদিন ধরিয়া কিংবা জন্ম হইতেই খাঁচাবন্দি, তাহাকে খাঁচামুক্ত করিয়া দিলেই সে নীল আকাশে ডানা মেলিয়া সহজে উড়িতে পারে না| বরং মহানন্দে উড়িতে গিয়া ভোকাট্টা ঘুড্ডির মতো গোত্তা খাইয়া পড়িয়া যাইতে পারে|
সুতরাং খাঁচামুক্ত বা স্বাধীন হইবার তাত্ক্ষণিক আনন্দের পরিবর্তে নিজেকে উড়িতে পারিবার উপযুক্ত হিসাবে গড়িয়া তোলাটাই তখন সবচাইতে জরুরি| ঠিকমতো উড়িতে না পারিলে তখন নানান বড় শিকারি পশুর শিকারে পরিণত হইতে হয়| নূতন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী কর্তৃক অর্থনৈতিক সাহায্য, ত্রাণ ইত্যাদি পাইবার মাধ্যমে নানান জালে জড়াইয়া পড়িবার ঘটনা| আবার সেই জাল ব্যতীত অগ্রসর হওয়াও সম্ভব নহে, কারণ শুরুতে তো নিজেদের ভান্ডার শূন্যই থাকে| তাহার পর কত ধরনের চড়াই-উতরাই| উহা এক ভয়াবহ সংগ্রাম|

এই ব্যাপারটি গবেষণা করিয়াছে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ফান্ড ফর পিস এবং ফরেন পলিসি, যাহারা যথাক্রমে ২০০৫ সালে প্রথম ব্যর্থ রাষ্ট্রের সূচক (ফেইল্ড স্টেট ইনডেক্স) প্রস্তুত ও প্রকাশ করা শুরু করিয়াছিল| তাহারা অবশ্য পরবর্তী সময়ে কোনো রাষ্ট্রকে ফেইলড বা ব্যর্থ অভিধা হইতে সরিয়া আসে| ব্যর্থ রাষ্ট্রের পরিবর্তে তাহারা বলিতে চাহে ‘ফ্রাজাইল’ বা ‘ভঙ্গুর’ রাষ্ট্র| এই ভঙ্গুর রাষ্ট্রের সংখ্যা নিতান্তই কম নহে|

ঐ সংস্হার মতে, আফগানিস্তান, ইরাক, সোমালিয়া, নাইজেরিয়াসহ মূলত মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকার এবং মধ্য এশিয়ার কতিপয় দেশ ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত| তাহা ছাড়াও ১৯৭০-৮০-এর দশকের লেবানন, কঙ্গো, কলম্বিয়া প্রভৃতি দেশগুলিও ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত| সুতরাং স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই একটি জনপদ ক্রমশ উপরে উঠিবে, তাহা নহে| ইহা এক কঠিন, বন্ধুর এবং কষ্টকর যাত্রাপথ|

রাষ্ট্রের মতো অন্য সকল ক্ষেত্রেও ‘স্বাধীনতা’ পাইলে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব-উহার গভীরতা কতখানি| এই সময় বিশ্ব গণমাধ্যমে এক ধরনের ডেভেলপিং জার্নালিজমের ধারা গড়িয়া উঠিয়াছে| ব্যতিক্রম বাদ দিলে, বিষয়টি আপাতভাবে নিন্দা বা সমালোচনামূলক হইলেও উহা প্রকৃতপক্ষে গঠনমূলক|

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন নোবেল পুরস্কার পাইবার পূর্বে ভয়াবহ সব নিন্দার মুখোমুখি হইয়াছিলেন| তখন তিনি অসম্ভব রসবোধের সহিত লিখিয়াছিলেন- ‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,/ যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো|’ ইহার পর তিনি ইহাও লিখিয়াছেন-‘বিশ্বজনে নিঃস্ব করে পবিত্রতা আনে,/সাধক জনে নিস্তারিতে তার মতো কে জানে?’ এই জন্য তিনি নিন্দুকের দীর্ঘায়ু কামনা করিয়া বলিয়াছেন- ‘নিন্দুকে সে বেঁচে থাকুক বিশ্ব হিতের তরে;/ আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে|’

সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, যে কোনো ক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনা বন্ধ হইয়া গেলে তাহা ভালো কথা নহে| তৃতীয় বিশ্বে একজন মানুষ আরেক জনকে বিচার করে এই হিসাবে যে, উক্ত ব্যক্তি তাহার কতখানি ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে| এই জন্য যাহারা পদ-পদবিতে থাকেন, অন্যরা তাহাদের সমীহ করেন| কারণ, ঐ পদ-পদবিধারীর ১০ হাতে কত ধরনের অস্ত্র রহিয়াছে এবং কোনটা দিয়া সে অন্যকে ঘায়েল করিবে, তাহা কেন জানে না এবং জানে না বলিয়া সমীহ করে|

তৃতীয় বিশ্বের প্রবণতা হইল- আগের জামানা খারাপ ছিল কিংবা পরাধীন সময় খারাপ ছিল- ইহা বারংবার বলা| কিন্তু এই জামানাও যে কতখানি ভালো হওয়া দরকার, এই বিষয়টি তাহারা এড়াইয়া যায়| গবেষণায় দেখা গিয়াছে, একটি দেশ খুব তাড়াতাড়ি অধিকতর ভঙ্গুর কিংবা পুরোপুরি সহিংস হইয়া উঠিতে পারে, কিন্তু অধিকতর স্থিতিশীলতা আনিতে হইলে কমপক্ষে একটি ‘প্রজন্ম’ পার হইয়া যায়| এই বাস্তবতা আমাদের মনে রাখিতে হবে|

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল

স্বপ্ন ভাঙিয়া যায় বাস্তবতার করাঘাতে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নার্স নিয়োগ ও সেবাব্রত

গণপরিবহনের দুই রকম চিত্র কেন?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই রক্ষাকবচ

কিছু শিক্ষার মূল্য অনেক অনেক বেশি