রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘কাঁটা তুলে তুলে’ চলা জীবনের অবসান

আপডেট : ২০ মে ২০২২, ০২:০৯

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় আছে, ‘যদি প্রতি পদে পদে অদৃষ্টের কাঁটা বিঁধে,/ প্রতি কাঁটা তুলে তুলে কত আর চলি/ না হয় চরণে বিঁধে মরিব গো জ্বলি।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী একজন সাংবাদিক হিসাবে, নিবন্ধকার হিসাবে, একজন গল্পকার-কবি হিসাবে সমগ্র জীবন এই কাঁটা তুলিতে তুলিতে জীবন পার করিয়াছেন। তিনি তাহার সমগ্র জীবন একটি রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করিয়াছেন। সেই আদর্শ হইতে ক্ষণিকের জন্য বিচু্যত হন নাই। দীর্ঘ জীবনে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কখনো অবসর নেন নাই। যুক্তরাষ্ট্রের রম্য নিবন্ধকার এরমা বোমবেক বলিয়াছিলেন, ‘জীবনাবসানের পর আমি যখন ঈশ্বরের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইব, আমি আশা করি তখন আর আমার মধ্যে শেষ মেধাটুকুও থাকিবে না। আমি যাহাতে বলিতে পারি, আমাকে তোমার দেওয়া মেধার সবটুকুই জগতে ব্যয় করিয়া আসিয়াছি।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বেলাতেও এই কথা শতভাগ প্রযোজ্য। গাফ্ফার চৌধুরী ১৯৫০ সালে মাত্র ১৬ বত্সর বয়সেই ছাত্রাবস্হায় সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করিয়া জীবনের শেষ পর্যায়ে লন্ডনে মৃতু্যশঘ্যায় শায়িত থাকিয়া তাহার ক্ষুরধার কলম সচল রাখিয়াছেন। তাহার চিন্তাকে প্রসারিত করিতে সচেষ্ট ছিলেন। নিজে যখন হাতে লিখিবার সামর্থ্য হারাইয়া ফেলিয়াছেন, তখন মুখে মুখে ডিকটেশন দিয়াও তাহার প্রিয় পত্রিকায় নিবন্ধ লিখিয়া পাঠাইয়াছেন। দেশের মানুষকে অভিভাবক হিসাবে দিকনির্দেশনা দিতে চেষ্টা করিয়াছেন।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অস্হিমজ্জায় ছিল দেশপ্রেম। সেই দেশপ্রেমই তাহাকে তাড়িত করিয়াছিল ১৯৫২ সালে তরুণ বয়সেই ভাষাশহিদদের লইয়া ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র‚য়ারি’ গান রচনা করিতে, যাহা বাংলাদেশের জন্ম ও ইতিহাসের সহিত জড়াইয়া আছে। শুধু এই গান লিখিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই, অবিরাম কলমযুদ্ধ করিয়াছেন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করিবার নিমিত্তে। ১৯৬৪ সালে তিনি সাংবাদিকতা ছাড়িয়া মুদ্রণ পেশায় যুক্ত হইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু অচিরেই বুঝিয়া গিয়াছেন, উহা তাহার কর্ম নহে। তিনি ১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলনের পূর্বেই আবার সাংবাদিকতায় ফিরিয়া কলমের মাধ্যমে সোচ্চার হইয়া উঠেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের গোটা সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের পক্ষে তাহার ক্ষুরধার কলমের যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। শুধু রাজনৈতিক বিষয় নহে, গাফ্ফার চৌধুরী সামাজিক ক্ষতগুলি, বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিচালনায় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভুলত্রুটিগুলি চোখে আঙুল দিয়া দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন। যাহারা তাহার কথা শুনিতে চাহিয়াছেন, তাহারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেষ্টা করিয়াছেন নিজেদের সংশোধন করিতে। আর যাহারা উপেক্ষা করিবেন বলিয়া সিদ্ধান্ত লইয়াছেন, তাহারা উপেক্ষাই করিয়াছেন। ইহাতে অবশ্য গাফ্ফার চৌধুরীর কলম থমকাইয়া যায় নাই, অবদমিত হয় নাই। তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে অবস্হান লইয়া তাহার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে যত অভিধায় ভূষিত করা হউক না কেন, তাহার কোনোটাই পর্যাপ্ত নহে। তাহার মেধা অথবা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলিয়াই ক্ষান্ত হওয়ার সুযোগ নাই। লক্ষ করিলেই দেখা যাইবে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক অসাধারণ পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। তাহার কর্ম তিনি একাগ্র চিত্তে, নিবিড় পরিচর্যায় সমগ্র জীবন করিয়া গিয়াছেন। ইহা বলা অতু্যক্তি হইবে না যে, সম্ভবত সংখ্যার বিবেচনায় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীই বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক নিবন্ধ রচনা করিয়াছেন। দেশে-প্রবাসে এমন বাংলাভাষী পাঠক খুঁজিয়া পাওয়া দুষ্কর হইবে, যিনি গাফ্ফার চৌধুরীর নিবন্ধ, কলাম কিংবা গল্প-উপন্যাস পড়েন নাই। নিঃসন্দেহে গাফ্ফার চৌধুরীর মৃতু্যতে দেশ একজন প্রকৃত অভিভাবক হারাইয়াছে। আমরা তাহার মৃতু্যতে গভীরভাবে শোকাহত। আল্লাহ্তালা যেন তাহাকে বেহেশত নসিব করেন—এই প্রার্থনা রইল।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘মতৈক্য’ ছাড়া মুক্তি বহুদূর

‘বুঝিবে সে কীসে, দংশেনি যারে’

কোনো কিছুই ভালো যাইতেছে না!

এই প্রবণতা বন্ধ করা উচিত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আত্মতৃপ্তি লাভ মানে যবনিকা পতন

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল