বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কে তার অভাব পূরণ করবে? 

আপডেট : ২০ মে ২০২২, ০৪:২৩

প্রথমে হাসপাতালে এবং পরে যুক্তরাজ্যে আমাদের রাষ্ট্রদূত সাঈদা মুনা তাসনিমের বাসভবনে। কিন্তু কলম যে চলছে না। কয়েক মাস ধরেই জানতাম, তিনি মৃতু্যপথযাত্রী, যে কথা তার চিকিত্সকগণ বলেছেন। কারণ, তার দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ বিকল হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ বৈকল্যের কারণে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্হাপন কিছুই সম্ভব ছিল না। তারা বলেছেন, একটি ইনজেকশন দিয়ে যত দিন বাঁচিয়ে রাখা যায়। কিন্তু তার পরও গাফ্ফার ভাইয়ের মহাপ্রয়াণ মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, বারবার নিজেকেই প্রশ্ন করছি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এই আপসহীন সৈনিক যে শূন্যতা রেখে গেলেন, তা কি অন্য কেউ পূরণ করতে পারবে? যে কলমটি নিয়ে বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে ধর্মীয় মৌলবাদ, ধর্মান্ধ অপশক্তি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবিরাম কলমযুদ্ধ চালাচ্ছিল, আজ সে কলম বন্ধ হয়ে গেল। বহু কথা, বহু স্মৃতিই মনে পড়ছে তার সঙ্গে আমার বহু বছরের সখ্যের কারণে। আমরা একই আদর্শের ধারক। ইত্তেফাক পত্রিকার মহসীন হাবিব সাহেবের অনুরোধ গাফ্ফার ভাইয়ের জন্য দুই লাইন লিখতে হবে—এমনি অনুরোধ এসেছে আরো বেশ কটি পত্রিকা অফিস থেকেও, কারণ গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখাটি গত এপ্রিল মাসে আমার সঙ্গেই হয়েছিল।

২০১২ সালে তার ঢাকায় আগমনের সময় তার সম্মানে আমার সরকারি বাসভবনে (আমি তখন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি) যে অনুষ্ঠান করেছিলাম, সে অনুষ্ঠানে তত্কালীন ইত্তেফাক সম্পাদক জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেবকে বিশেষভাবে নিমন্ত্রণ করতে বলেছিলেন গাফ্ফার ভাই। মঞ্জু সাহেবের সঙ্গে তিনি বেশ কিছুক্ষণ স্মৃতিচারণ করেছিলেন তার স্বনামধন্য পিতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে। বলেছিলেন, মানিক মিঞা সাহেবের কাছ থেকে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন।

আজ যে কথাটি বারবার মনে পড়ছে, সেটি হলো ১৯৭৫ সালে লন্ডনে গাফ্ফার ভাইয়ের হাতে সৃষ্ট ‘বাংলার ডাক’ পত্রিকা। সেটিই ছিল গোটা বিশ্বে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রথম প্রকাশিত পত্রিকা। সে পত্রিকায় আমার এবং আমার প্রয়াত স্ত্রীরও কিছু ভূমিকা ছিল বলে আমি গর্বিত। তার সঙ্গে বহু কাজের এটি ছিল একটি। আমরা একত্রে লন্ডনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বহু অনুষ্ঠান করেছি। সে পত্রিকায়ই গাফ্ফার ভাই লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল খলনায়ক ছিল জিয়াউর রহমান। সে দাবির পক্ষে তখনো তেমন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিল না। কিন্তু গাফ্ফার ভাইয়ের সে দাবি যে কত নির্ভরশীল ছিল, ভবিষ্যতে পাওয়া অসংখ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে আজ তা প্রতিষ্ঠিত। গাফ্ফার ভাই নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ‘বাংলার ডাক’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, জিয়াউর রহমান পশ্চিম বাংলায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাননি, গিয়েছিলেন পাকিস্তানের চর হিসেবে কাজ করার জন্য। সে কথা বলার সাহস তখন অনেকেরই হয়নি। জিয়া যে বঙ্গবন্ধু হত্যার আসল খুনি, সে কথা গাফ্ফার ভাই তার লেখা ‘পলাশি থেকে ধানমন্ডি’ নামক নাটক দিয়েই সকলকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।

গত এপ্রিলে প্রায় তিন বছর পর লন্ডন যেতে পেরেছিলাম বলেই তার সঙ্গে শেষ দেখাটির সুযোগ পেয়েছিলাম। ২২ এপ্রিল হাসপাতালে দেখা হওয়ার পর প্রথমেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’ গানটির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমার ২১শে ফেব্র‚য়ারি গানের স্বরলিপিও কি আগামী পৃথিবী কান পেতে শুনবে?’ জবাবে বলেছিলাম, পৃথিবীর শেষ দিনটি পর্যন্ত তার এই গানের স্বরলিপি প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে ধ্বনিত হবে। এরপর বললেন, ‘তুমি এসে ভালোই করলে, আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই; ডাক্তার বলেছে, আর সামান্য কদিন বেঁচে থাকব।’ তিনি জানতেন তার মৃতু্য ঘনিয়ে এসেছে কিন্তু তখনো তার মূল উদ্বেগের জায়গা বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে। তিনি চিন্তিত ছিলেন দেশে এই তালেবানি, ধর্মান্ধ অপশক্তিকে শেষ করে দেওয়ার পম্হা নিয়ে। বলছিলেন, ‘আমি তো চলে যাচ্ছি, এখন এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে ধ্বংস করার দায়িত্ব বর্তাবে তোমাদের ওপর। তুমি যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসির রায় দিয়েছ, একইভাবে এই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, পাকিস্তানপম্হি, তালেবানি অপশক্তিকে শেষ করে দিতে হবে।’

আরো বলেছেন, এই যুদ্ধে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই, তার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। বলেছেন, আগামী নির্বাচনে যেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা ক্ষমতায় যেতে না পারে, সে বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধপম্হি সব শক্তিকে এক হতে হবে। বলেছেন, জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে, ধর্মব্যবসায়ীদের সঙ্গে যেন কোনো আপস না হয়। লতা সমাদ্দার, হূদয় মণ্ডল, ঝুমন দাস, আমাদিনি পালসহ যেসব হিন্দুর বিরুদ্ধে ধর্মান্ধরা ত্রাস চালিয়েছে, হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছে, তার উচিত শিক্ষা দিতে হবে। বললেন, তার শক্তি থাকলে তিনি একাই লিখে যেতেন। তার কথা, দেশকে ধর্মান্ধশূন্য অবশ্যই করতে হবে। ৩০ এপ্রিল যুক্তরাজ্যে আমাদের রাষ্ট্রদূত সাঈদা মুনা তার বাসভবনে গাফ্ফার ভাইয়ের প্রয়াত তৃতীয় কন্যা বিনোতা চৌধুরীর স্মরণসভা ডেকেছিলেন, যেখানে গাফ্ফার ভাইয়ের উপস্হিতির জন্য হাসপাতাল কতৃ‌র্পক্ষ একটি বিশেষ ভ্যানের ব্যবস্হা করায়, গাফ্ফার ভাই সেখানে যেতে পেরেছিলেন।

রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন বক্তা বিনোতার পিতা গাফ্ফার ভাইকে বিশ্বের সব বাঙালির বাতিঘর, সকলের বিবেক বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি যে তার ‘২১শে ফেব্র‚য়ারি’ গানের জন্য সকল বাঙালির মনে অনাদিকাল বেঁচে থাকবেন, সে কথা বলতে আমি ভুলে যাইনি। তখন গাফ্ফার ভাইয়ের চোখে পানি এসেছিল। সবচেয়ে বেদনার দিক হলো গাফ্ফার ভাইয়ের প্রয়াণের কিছুদিন আগেই তার মেয়ে বিনোতা চলে গেলেন পরপারে। বিনোতার মৃতু্যর শোক গাফ্ফার ভাই কাটাতে পারেননি। ১৯৭৩ সাল থেকেই গাফ্ফার ভাইয়ের স্ত্রী ছিলেন বিকলাঙ্গ, চলতেন হুইল চেয়ারে। ২০১৩ সালে তার মৃতু্য পর্যন্ত গাফ্ফার ভাই-ই তাকে দেখাশোনা করেছেন, তার মেয়েদের সাহাঘ্য নিয়ে। বিনোতার মৃতু্যর পর গাফ্ফার ভাইয়ের চোখের পানি আর বন্ধ হয়নি। রাষ্ট্রদূতের বাড়ি থেকে বিদায়ের সময় গাফ্ফার ভাই কবিগুরুর কবিতার সেই লাইনটি আবৃত্তি করলেন, যা ছিল—‘যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই, যা দেখেছি, যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।’ সে কবিতা শুনে উপস্হিত সবাই বুঝতে পারলেন তার দিন যে ঘনিয়ে এসেছে, তা গাফ্ফার ভাই বুঝতে পারছেন, সবার চোখেই তখন পানি।

শেষ দিনগুলোতে গাফ্ফার ভাই আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তা আর হলো না। সেটি লিখতে পারলে তা হতো বাঙালির জন্য এক অসাধারণ দলিল। যা-ই হোক, যে কথা আজ সবার মুখে মুখে তা হলো—কে গাফ্ফার ভাইয়ের কাজের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে ধ্বংস করে বঙ্গবন্ধুর চেতনা উজ্জীবিত রাখতে পারবে? গাফ্ফার ভাই যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, সে পথ চালিয়ে যাওয়ার মতো কি কেউ রয়েছেন?

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউনসেলর নিয়োগ জরুরি

টাকার ধর্মই হচ্ছে অধিক মুনাফার দিকে ধাবিত হওয়া

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: সম্ভাবনার দুয়ারে বাংলাদেশ

শিক্ষকের গলায় জুতার মালা ও জুতার মাহাত্ম্য

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পাবেন

সিলেটে বন্যা: ত্রাণবিতরণে সমন্বয় জরুরি

ছেলের কাছে চিঠি ও বাক্‌স্বাধীনতা

পদ্মা সেতু: শেখ হাসিনার সক্ষমতার স্মারক