বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সাংবাদিকতার মহাকবির প্রস্থান

আপডেট : ২০ মে ২০২২, ০৪:৪৫

গাফ্ফার ভাইকে (আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী) নব্বইয়ের দশকে একদিন সচিত্র সন্ধানী অফিসে জিজ্ঞাসা করি, গাফ্ফার ভাই আপনি এত সরাসরি কীভাবে লেখেন? আমরা তো লিখতে গেলে অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখি। ভয় পাই নানান কিছুর। গাফ্ফার উত্তরে বলেছিলেন, এটা আমার মানিক ভাইয়ের (ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) শিক্ষা। তিনি সব সময়ই বলতেন, গাফ্ফার সাংবাদিকতায় ভয় পাবে না। আর কোনো কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখবে না। মানুষ সোজাসুজি সব কথা শুনতে চায়।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া চলে গিয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের এক দুর্দিনে। ’৬৯ সালে। তখন দেশ পাকিস্তানি সামরিক থাবার নিচে। আর আজ তার প্রকৃত উত্তরসূরি, বাংলা সাংবাদিকতার জগতে যাকে মহাকবি বলা যায় সেই গাফ্ফার চৌধুরী যখন চলে গেলেন, তখন তার মতে সময়টা দুর্দিন। মারা যাওয়ার মাত্র এক দিন আগেই বাংলাদেশ সময় দুটোর দিকে আমাকে ফোন করেন। যদিও হাসপাতাল থেকে ফোন করেছেন তার পরেও তার গলাটা ভালো শুনে মনটা ভালো লাগে। নিজে থেকেই বলি, গাফ্ফার ভাই আপনার গলা শুনে মনে হচ্ছে, আপনার শরীর অনেক ভালো। তিনি বললেন, ডাক্তাররাও হয়তো আমাকে খুব শিগ্গিরই বাড়ি যেতে দেবেন। তারপরে তিনি নিজের কথা বাদ দিয়ে যথারীতি চলে যান দেশের কথায়। দেশের নানান অবস্হা খুঁটিয়ে খঁুটিয়ে জানতে চান। তারপরে একপর্যায়ে বলেন, দেশে ধর্মান্ধতা যেভাবে বাড়ছে তাতে দেশের বড় দুর্দিন দেখেই চলে যেতে হবে। সত্যি যে আধুনিক বাংলাদেশ গাফ্ফার ভাইয়েরা চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ এখন অনেক দূরে সরে গেছে। তাই বলা যেতে পারে একই রকম দুর্দিন না হলেও মানিক মিয়ার মতোই দেশ না হোক, সমাজের এক বড় দুর্দিনে চলে গেলেন গাফ্ফার চৌধুরী।

মারা যাওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে তিনি ইত্তেফাক ও সমকালে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কয়েকটি লেখা লেখেন। লেখাগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল পঁচাত্তরের পরে যখন ক্যাপ্টেন সাত্তার ভাই বা অন্য কারো মাধ্যমে গাজী শাহাবুদ্দিন ভাই দুই এক কপি করে ‘বাংলার ডাক’ আনাতেন আর সেখানে বঙ্গবন্ধুর কথা গাফ্ফার ভাই যে সাহস নিয়ে লিখতেন, যে মনের বিশ্বাস থেকে লিখতেন, তেমনি মনের বিশ্বাস থেকেই তিনি এই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখেছেন।

গাফ্ফার ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় এরশাদ পতনের পরে তিনি ঢাকায় এলে। তার সেই স্নেহ থেকে কখনো বঞ্চিত হতে হয়নি আর জীবনে। আর কেন যেন তিনি, আমার দেওয়া ইনফরমেশানে বিশ্বাস করতেন। যে কারণে তিনি কোনো কিছু জানতে চাইলে কনফার্ম না হলে কিছুই বলতাম না।

২০০১-এর পরে বাংলাদেশের ওপর একটা দুঃসময় আসে। সে সময়ে ফোনে কথা বলাও অনেক রিস্কি ছিল। তার পরেও অনেক রিস্ক নিয়ে অনেক কথা বলেছি সে সময়ে গাফ্ফার ভাইকে। যদি কোনো দিন বলতে যেতাম, গাফ্ফার ভাই আমি কনফার্ম এ তথ্য সম্পর্কে—তার পরেও আপনি একটু কনফার্ম করে নেবেন। তিনি হেসে উত্তর দিতেন যে, আমার তথ্যতে তার আস্হা আছে।

গাফ্ফার চৌধুরী এরশাদ পতনের পরে ঢাকায় এসে তার স্ত্রীর ছোট বোনের বাড়িতে ওঠেন। বাড়িটি ছিল হাটখোলা রোডে। তখন প্রায় প্রতিদিনই গাজী শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে গাফ্ফার ভাইকে আনতে যেতাম। এই যাওয়ার পেছনে সব থেকে বড় কারণ ছিল, গাফ্ফার চৌধুরী ঐবার মূলত যে কারণে ঢাকা এসেছিলেন, সেটা তিনি পেয়েছেন কি না তা জানতে।

আসলে গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডনে চলে যাওয়ার আগ অবধি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখছিলেন। লন্ডনে যাওয়ার আগে কয়েকটি ট্রাংকে সেই পাণ্ডুলিপিগুলো ভরে তিনি তার স্ত্রীর ছোট বোনের বাসায় রেখে যান। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে তারা ভয়ে সেগুলো নানান জায়গায় রাখেন। গাফ্ফার ভাই এসেছিলেন ঐগুলো উদ্ধার করতে। যেদিন তিনি গাড়িতে উঠেই বললেন, গাজী সাহেব, (গাজী শাহাবুদ্দিন, সচিত্র সন্ধানী সম্পাদক), স্বদেশ, আমি সবগুলো ট্রাংক পেয়ে গেছি। সেই আলো-আঁধারিতেও যেন গাড়ির ভেতর গাফ্ফার চৌধুরীর মুখটি চিকচিক করছিল—যা এখনো আমার চোখে ভাসে। আসলে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার অন্যরকম একটা ভালোবাসা ছিল; যা ঠিক আমাদের মতো কলমে প্রকাশ করা যায় না।

তার ছোট মেয়েটি গত মাসে ক্যানসারে মারা যাওয়ার পরে তিনি খুবই নিঃসঙ্গ মনে করতে থাকেন নিজেকে। একদিন তাই ফোনে বলেন, স্বদেশ পারলে প্রতিদিনই একটু ফোন কোরো। বড় নিঃসঙ্গ লাগে। প্রতিদিন না হলেও এক-দুই দিন পরপরই ফোন করতাম। তিনি বারবারই একই দুঃখ করতেন, বলতেন, স্বদেশ আমি জীবনে কারো কোনো ক্ষতি করিনি। কেন আমি জীবনে এ কষ্ট পেলাম? তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না।

কারণ, গাফ্ফার চৌধুরী তো আর শুধু একজন সাংবাদিক নন, গাফ্ফার চৌধুরী কবি, গাফ্ফার চৌধুরী গল্পকার, গীতিকার, ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক। আসলে তিনি যে লন্ডনে বাস করে গেছেন সেখানে যদি তিনি জম্মাতেন—তার যা কলমের ক্ষমতা ছিল তাতে তিনি সাংবাদিকতা করে সময় নষ্ট করতেন না। তিনিও ডিকেন্সদের মতো অমর কথাসাহিত্যিক হতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমন একটা দেশে জম্মেছিলেন যে দেশটিতে প্রতিদিন কোনো না কোনো সমস্যা। কখনো ধর্ম ব্যবসায়ীরা সমস্যা সৃষ্টি করে, কখনো রাজনীতিকরা সমস্যা সৃষ্টি করেন, কখনো সামরিক শাসক এসে সমস্যা সৃষ্টি করেন, আর দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, আমলাদের রক্তচক্ষু এগুলো তো আছেই। প্রতিদিনের এই শত সমস্যার সমাধান ও প্রতিবাদের জন্যই গাফ্ফার চৌধুরী তার মহাকাব্যিক কলম নিয়ে সাংবাদিকতা করে গেছেন। তাই তার অন্য সবকিছু ছাড়িয়ে সাংবাদিক পরিচয়, কলাম লেখক পরিচয়ই বড় হয়েছে। কিন্তু তার ভাষা, তার ভাষার বিন্যাস তার কালের সব বড় সাহিত্যিককে হার মানায়। তিনি যখন ছোটগল্প লিখতেন সে সময়ে তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো গল্প কেবল শওকত ওসমানই লিখতেন। উপন্যাসও তা-ই।

শেষ বয়সে যদি তিনি কম কলাম লিখে, উপন্যাস ও আত্মজীবনীতে মন দিতেন তাহলে হয়তো আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনার’ থেকেও অনেক বিস্তীর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্যানভাস নিয়ে তিনি উপন্যাস লিখে যেতে পারতেন; যা হতে পারত বাংলা সাহিত্যে সেরা সাহিত্য। তেমনি তিনি তার আত্মজীবনী শেষ করে গেলে বাঙালি পেত একটা ইতিহাসের দলিল। অন্তত গত চার দশকের যোগাযোগ থেকে এটুকু বলতে পারি, এসব তিনি করার সময় পাননি কোনো অর্থের চাহিদা থেকে নয়, সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশ ও মানুষকে পরিবর্তন করে, দেশকে স্বাধীনতার মূল চেতনার পথে আনা ও আধুনিক সমাজ গড়ার স্বার্থে।

তাই তার এই মহাপ্রয়াণ মুহূর্তে বলা যায়, দেশ ও মানুষের বেদিমূলে যে মহাকাব্যিক সাংবাদিকতা গাফ্ফার চৌধুরী করে গেছেন—এর প্রতিদান সেই দিনই দেওয়া হবে—যেদিন বাংলাদেশ একটি আধুনিক দেশ হবে। যে দেশে কোনোরূপ মধ্যযুগীয় অন্ধকার থাকবে না।

এই লেখা যখন লিখছি, তখনো সিদ্ধান্ত হয়নি, গাফ্ফার চৌধুরীকে কোথায় সমাহিত করা হবে। তবে আমি জানি, বনানী গোরস্হানে তার স্ত্রীর কবরের পাশে তার জন্য একটা কবর কেনা আছে। তাই বিশ্বাস করি, গাফ্ফার চৌধুরীর অত্যন্ত স্নেহের আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাকি কাজটুকু করবেন। সেটা আমাদের কারোরই বলার প্রয়োজন নেই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউনসেলর নিয়োগ জরুরি

টাকার ধর্মই হচ্ছে অধিক মুনাফার দিকে ধাবিত হওয়া

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব: সম্ভাবনার দুয়ারে বাংলাদেশ

শিক্ষকের গলায় জুতার মালা ও জুতার মাহাত্ম্য

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পাবেন

সিলেটে বন্যা: ত্রাণবিতরণে সমন্বয় জরুরি

ছেলের কাছে চিঠি ও বাক্‌স্বাধীনতা

পদ্মা সেতু: শেখ হাসিনার সক্ষমতার স্মারক