রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা!

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০৫:০৪

বাংলায় একটি প্রবাদ রহিয়াছে: সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা? দুর্নীতি ও অনিয়ম আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে পৌঁছাইয়া গিয়াছে, ইহার প্রতিকার করাও আজ কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। দুর্নীতি নির্মূল ও অনিয়ম দূর করিবার কাজটি কোথা হইতে শুরু করিতে হইবে—ইহা লইয়াও আমরা অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অনিশ্চয়তায় ভুগিতেছি। আবার ব্যাপকভাবে অভিযান পরিচালনা করিতে গেলে দেখা যাইবে ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড় হইয়া যাইতেছে। ভোক্তা অধিকার রক্ষা ও ইহার আইন লইয়া একটি সেমিনার হইয়া গেল এই রাজধানীতে। সেইখানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলিলেন যে, সকল জায়গাতেই অনিয়ম রহিয়াছে। যেইখানেই হাত দেওয়া হইতেছে সেইখানেই অনিয়ম পাওয়া যাইতেছে।

তাহার এই হতাশার কথা খুবই দুঃখজনক। বর্তমানে অন্যায়-অনিয়মের কারণে ভোক্তারা প্রতারিত হইতে হইতে এমন পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে যে, অনিয়মকে এখন তাহাদের আর অনিয়ম বলিয়া মনে হয় না। অনিয়মই নিয়মে পরিণত হইয়াছে। ইহাতে আমাদের অধিকার যে খর্ব হইতেছে, তাহা অনেক সময় আমরা বুঝিতেই পারিতেছি না। হাসপাতাল ও চিকিৎসকের চেম্বারে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের বাড়াবাড়ি, স্কুল-কলেজ হইতে বই-খাতাপত্র, পোশাক ইত্যাদি অধিক মূল্যে ক্রয় করিতে বাধ্য করা, পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে অতিরিক্ত ব্যয়, উচ্চহারে মূল্য দিয়াও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া, পানির খারাপ মান, গ্যাসের চাপ কম থাকিলেও পুরা মূল্য পরিশোধে বাধ্য করা, ওয়াসা, ডেসা, ডেসকো, তিতাস প্রভৃতি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের দুর্নীতি ও গ্রাহকদের বিড়ম্বনা ইত্যাদির কারণে সাধারণ নাগরিকদের জীবন আজ দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে।

আগে দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার সময় রাখঢাক করা হইত। এখন সকল কিছুই যেন ওপেন সিক্রেট। আগে ঘুষ দেওয়া হইত টেবিলের নিচ দিয়া; এখন প্রকাশ্যে টেবিলের উপরই রাখা হইতেছে। অবশ্য যেই সকল অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা রহিয়াছে তাহার কথা ভিন্ন। এখন ঘুষকে কেহ আর ঘুষ বলেন না। ইহার নাম হইয়া উঠিয়াছে কমিশন, উপরি, বকশিশ ইত্যাদি। আমাদের সমাজে বিবাহ-শাদির ক্ষেত্রে এখন উপরি পাওয়া জামাইয়ের কদরই বেশি। বিসিএসে অ্যাডমিন, পুলিশ, কাস্টমস ইত্যাদি ক্যাডারের চাহিদা অত্যধিক। যেই দেশে এই পরিস্থিতি বিরাজমান, সেইখানে সর্বত্র অনিয়মের বাসা বাঁধিবে ইহাই তো স্বাভাবিক। অফিস-আদালতগুলিতে আজ টাকা ছাড়া তেমন কোনো কাজ হয় না। কে যে কী করিতেছে, তাহা অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না। দেখা গেল কাগজপত্রে সকল কিছু ঠিক আছে, কিন্তু ইহারই মধ্যে শত শত এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকা গায়েব। যাহারা এই সকল অনিয়মের কারিগর, তাহাদেরও দেখা যাইতেছে দুই দিন পর লাপাত্তা। তাহারা ধরাছোঁয়ার বাহিরে চলিয়া যাইবার পর আমাদের হুঁশ হয়। বিভিন্ন হায় হায় কোম্পানি এমনকি একশ্রেণীর ধড়িবাজ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মানুষের পকেট কাটিয়া লইবার পর প্রশাসনের টনক নড়ে। অপরাধ সংঘটিত হইবার সময় আমাদের কাহারও কোনো হদিস থাকে না, থাকে না সচেতনতাও। এইভাবে চারিদিকে আজ অনিয়মের ডালপালা ছড়াইয়া পড়িয়াছে।

উপরি ছাড়া আজ কেহ চক্ষু তুলিয়াও চাহেন না। ফাইল অনুমোদন করিতে টাকা লাগে টেবিলে টেবিলে। এমনকি অনুমোদনের পর কাগজপত্র সংগ্রহ করিতে হইলেও পয়সা না দিয়া কোনো উপায় নাই। দেখিয়া শুনিয়া মনে হয়, যেন অনিয়ম করিবার জন্যই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়া হইয়াছে, লাইসেন্স দেওয়া হইয়াছে। আজ অনেক সময় টাকা দিয়াও কাজ হয় না, কাজ না হইলে সেই টাকা অনেক সময় আদায় করাও যায় না। টাকা চাহিতে গেলে উলটা জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়। অর্থাৎ অন্যায়-অনিয়মকারী ও দুর্নীতিবাজদের ‘ইমান’ও আজ নষ্ট হইয়া গিয়াছে, এমন কথাও আজ বলিতে শোনা যায়। উপরতলা হইতে নিচতলা, শিক্ষিত হইতে অশিক্ষিত সমাজ কোথায় অনিয়ম নাই, সেই প্রশ্নই আজ বড় আকারে দেখা দিয়াছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ডিজি যে কথা বলিয়াছেন, তাহাতে তাহার উপস্থাপনায় চমৎকারিত্ব আছে, কিন্তু ইহাতে কোনো নতুনত্ব আছে বলিয়া মনে হয় না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘মতৈক্য’ ছাড়া মুক্তি বহুদূর

‘বুঝিবে সে কীসে, দংশেনি যারে’

কোনো কিছুই ভালো যাইতেছে না!

এই প্রবণতা বন্ধ করা উচিত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আত্মতৃপ্তি লাভ মানে যবনিকা পতন

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল