মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কি আমাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলবে

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ০২:২৩

সব সময়ই আমি বলে এসেছি, দাম বাড়লেও যে কোনো পরিস্থিতিতে খাদ্য কিনতে পাওয়া যাবে। তবে এ অনুমান মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন অবরুদ্ধের ফলে শস্য ও তৈলবীজের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে হঠাত্ করেই চিত্র পালটে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের অসাধারণ সাফল্যে পশ্চিমারা উল্লাস প্রকাশ করলেও চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার নিষ্পত্তিমূলক অবস্থান অনেক কিছুকেই ঝুলিয়ে রেখেছে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য ঘাটতির উদ্বেগ নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব সতর্কবার্তা উচ্চারণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অবিশ্যম্ভাবী খাদ্য ঘাটতি সম্পর্কে কথা বলার কারণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নরকে অনেক উপহাস করা হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তার শব্দচয়ন অগোছালো-আনাড়ি ছিল সত্য, তবে তার আশঙ্কা আজ সঠিক ছিল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিশ্বের প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের ৯ ভাগের জোগানদাতা ইউক্রেন। কাজেই ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির বিকল্প পাওয়ার কোনো উপায় নেই। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার শস্য রপ্তানি থমকে যাওয়ার ফলে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে আরো। সড়কপথ ও রোমানিয়ার বন্দর দিয়ে ইউক্রেন থেকে অল্পসংখ্যক খাদ্যশস্য বিশ্ববাজারে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে। ইউক্রেনের এই অচলাবস্থার কারণে রাশিয়ার ওপর বড় ধরনের অবরোধ আরোপ করা হলেও দেশটি তার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটছে না। এসবের ফলে ইতিমধ্যেই শস্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, যা জানুয়ারি মাসের তুলনায় ৫৯ শতাংশ বেশি। পরিস্থিতি আগের চেহারায় ফেরার সম্ভাবনা কম। স্বল্প আয়ের দেশগুলো উচ্চমূল্যে খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে কয়েক মিলিয়ন খাদ্য-উদ্বাস্ত্ত সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

খাদ্য ঘাটতির কারণে ব্রিটেনের মতো দেশগুলো পর্যন্ত প্রভাবিত হবে, যদিও এজাতীয় দেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্যচাহিদা পূরণে ব্রিটেন সামগ্রিকভাবে প্রায় অর্ধেক খাদ্য আমদানি করে থাকে। বিশ্বের যেসব দেশ শস্য এবং অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে তারা তাদের খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ২২টি দেশ খাদ্যরপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব খাদ্য বাণিজ্য ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ব্রিটেনে খাদ্য সরবরাহকারী প্রধান চারটি দেশ হলো ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি। ইইউ সহযোগী এবং প্র্রাক্তন অংশীদার এসব দেশও ব্রিটেনে খাদ্য রপ্তানি করছে না।

এরকম একটা মুহূর্তেও জনসন সরকার ইইউ বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। চিরাচরিত অভ্যাসগত বেপরোয়া মনোভাব দেখিয়ে ব্রেক্সিট চুক্তিকে একতরফাভাবে বাতিলের সিদ্ধান্েত অনড় রয়েছে দেশটি। যুক্তরাজ্য কোনো অবস্থাতেই ইইউর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য আমদানির ক্ষতি হয়, এমন কাজ করতে চাইবে না সত্য, যেহেতু আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত কোনো নিয়ন্ত্রক চেক স্হগিত করেনি দেশটি। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত হবে এমন একটি দেশের সঙ্গেই খেলার সুযোগ নেওয়া। কেননা, ইউরোপীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত ‘সাধারণ কৃষি নীতি’ (কমন এগ্রিকালচার পলিসি-সিএপি) সম্পর্কে সমালোচনা করতেও ব্রিটেন পিছপা হয়নি।

সিএপি একটি কৌশল খাটাতে চলেছে। কৃৃষকদের প্রতি ব্রিটেনের ঘৃণাজনক অবহেলার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইইউর সঙ্গে কৃৃষকদের উৎপাদনশীল ক্ষমতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে শক্তিশালী করার মিশনে এগিয়ে চলেছে সিএপি। এটি ব্রিটেনকে বেকায়দায় ফেলবে। এক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে ইইউ। খাদ্য রপ্তানিতে ব্রিটেনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ইইউ অন্য দেশের নাম প্রস্তাব করতে পারে। যেসব দেশ ইউক্রেনকে বেশি পরিমাণ খাদ্যসহায়তা দিয়েছে, সেসব দেশের বেশি খাদ্যের প্রয়োজন রয়েছে। এমতাবস্থায়, ইইউ উৎপাদনকারীরা তাদের খাদ্য অন্যত্র বিক্রি করার ফলে ব্রিটেনে খাদ্যের ঘাটতি তৈরি হবে। ইইউ যদি এটা করতে না পারে, তাহলে বরিস জনসনকে বেকায়দায় ফেলার জন্য আরেকটি কার্যকর উপায় রয়েছে। রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম সার রপ্তানিকারক দেশ। পশ্চিমা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সারের দাম এখন ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। ব্রিটেনের কৃষকদের যে সার প্রয়োজন হয় তার মাত্র দুই-পঞ্চমাংশ ইউকে উৎপাদন করে; বাকি অংশের জন্য মূলত ইইউ এবং কিছুটা জার্মানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এমতাবস্থায়, ইইউ ব্রিটেনে সার রপ্তানি সীমিত করলে ব্রিটেন খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে।

আমরা এতটাই খারাপ শাসকদের অধীনে বসবাস করছি যে, ২০২৩ সাল নাগাদ খাদ্য রেশনিং ব্যাপক ঝুঁকির সম্মুখীন। আবার ব্রেক্সিট ভোটাররা মনে করতে পারেন যে, তাদের সঙ্গে মিথ্যাচার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিগত ৩০ বছরে বিশ্বায়ন যেখানে থাকার জন্য ছিল সেই ‘অতি আত্মবিশ্বাসের’ ফলে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা গভীরভাবে পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে কয়েকটি দেশ ও কয়েকটি শক্তিশালী কৃষি ব্যবসায়-প্র্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। যেমন—আমার সহকর্মী জর্জ মনবিওট তার বিখ্যাত বই রিজেনেসিসে যুক্তি দিয়েছেন, প্রক্রিয়াটি আরো বেশি বাজারভিত্তিক এবং কম স্থিতিস্থাপক হয়ে উঠেছে। কতিপয় দেশ, বিশেষ করে ব্রিটেন, মনে করে যে, স্টোরেজ সুবিধা, খাদ্যমজুত বা খাদ্যনিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয় বিষয়, এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। যদিও গার্হস্থ্য পরিবেশগতভাবে এগুলো টেকসই উপাদান। নিরাপদ আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলার মাধ্যমে খাদ্য, পশুখাদ্য এবং সার নির্বিঘ্নে প্রবাহিত হতে পারে। ‘গ্লোবাল’ ব্রিটেন বিষয়টিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

আজকের বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখেও সচেতন মহল মূর্খতায় বসবাস করছেন। খাদ্য উৎপাদন ও বিতরণে স্থিতিস্থাপকতা, স্থায়িত্ব, সবার স্বাস্থ্যকর খাদ্য খাওয়ার সামর্থ্য নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সভ্যতার একটি মৌলিক বিল্ডিং ব্লক গঠন করতে হবে। এমনকি যদি এসব বিষয় নিয়ে কঠোর সমালোচনা, অবমূল্যায়ন কিংবা উপহাস করাও হয় তার পরও।

গত সপ্তাহে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ ছিল খাদ্যের অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি। জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের মুদ্রাস্ফীতির হার সর্বোচ্চ। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের সরবরাহকৃত পণ্য ও পরিষেবা সবচেয়ে কম স্থিতিস্থাপক। তাছাড়া, সর্বাধিক বাজার-ভিত্তিক ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক চলমান প্রবণতা থেকে আংশিকভাবে হলেও নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম এমন একটি বড় ব্লকের সদস্য নই আমরা। এক্ষেত্রে বিশ্বে আমরা মূলত মহাসাগরের চারপাশে অসহায়ভাবে নিক্ষিপ্ত একটি ‘কর্ক’।

লেখক: বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর:সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষকের গলায় জুতার মালা ও জুতার মাহাত্ম্য

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পাবেন

সিলেটে বন্যা: ত্রাণবিতরণে সমন্বয় জরুরি

ছেলের কাছে চিঠি ও বাক্‌স্বাধীনতা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পদ্মা সেতু: শেখ হাসিনার সক্ষমতার স্মারক

আমরা পারি-আমরাই পারি

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী