রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিজের সীমানা জানিতে হইবে

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ০৩:৪২

পৃথিবীতে এমন কোনো বড় অপরাধী নাই যিনি মেধাবী নহেন। গতকাল সোমবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রধান খবর হইতে জানা গিয়াছে—নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটাইয়া ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েক জন সদস্যের সম্মতির মাধ্যমে ক্যাম্পাস উন্নয়নের নামে ৯ হাজার ৯৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ জমির দাম ৩০৩ কোটি ৮২ লক্ষ ১৩ হাজার ৪৯৭ টাকা অধিক দেখাইয়া তাহা আত্মসাৎ করিয়াছে।

এই টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫ মে মামলা করিয়াছে দুদক। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠিয়াছে—‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের টাকা আত্মসাতের হীন উদ্দেশ্যে কম মূল্যে জমি ক্রয় করা সত্ত্বেও অধিক মূল্য দেখাইয়া তাহারা প্রথমে বিক্রেতার নামে টাকা প্রদান করেন। পরবর্তীকালে বিক্রেতার নিকট হইতে নিজেদের লোকের নামে নগদ চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করিয়া আবার নিজেদের নামে এফডিআর করিয়া রাখেন এবং পরবর্তীকালে নিজেরা উক্ত এফডিআরের অর্থ উত্তোলন করিয়া আত্মসাৎ করেন। আদালত বলিয়াছে—ইহা সিরিয়াস অপরাধ। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার খুনের চাইতেও ভয়াবহ। খুনের কারণে ব্যক্তি শেষ হইয়া যায়। আর দুর্নীতির কারণে সমাজ ধ্বংস হইয়া যায়।

কিছুদিন পূর্বে মুদি দোকানদারের নিকট হইতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের নায়ক হইয়াছিলেন হলমার্কের একজন উদ্যোক্তা। ব্যাংকার, সরকারের উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, নেতা, পাতি নেতা, পুলিশ, আইনজীবী প্রমুখকে ম্যানেজ করিবার যেই যোগ্যতা এই ধরনের অপরাধীরা দেখাইয়া থাকেন, তাহা কোনো বোকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নহে। সুতরাং কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই যে, বড় বড় অপরাধ যাহারা করেন, তাহারা অসাধারণ মেধাবী হইয়া থাকেন। তবে তাহারা সকলেই বুদ্ধিমান কি না—তাহা অন্য প্রশ্ন। কেননা, মেধাবী হইলেই যে তিনি বুদ্ধিমান হইবেন, এমন নহে। বুদ্ধিমানরা নিজের পায়ে কুড়াল মারিবেন না। মেধাবীরা যখন অপরাধে যুক্ত হন, তখন তাহারা এক ধরনের চক্রবূ্যহে প্রবেশ করেন। ঐ বূ্যহে সহজে প্রবেশ করা যায়; কিন্তু সহজে বাহির হওয়া যায় না। আর বাহির হইতে না পারিলে অর্থাৎ অপরাধ করিয়া পার না পাইলে জীবনের সকল অর্জন ধ্বংস হইয়া যায়। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিশ্চয়ই জানিয়া শুনিয়া নিজেকে ধ্বংস করিবেন না। বলা হইয়া থাকে—চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি ধরা না পড়ে। মেধাবী অপরাধীরাও মনে করেন, তাহারা ধরা পড়িবেন না; কিন্তু যেইখানে অপরাধ করিয়া ধরা পড়িবার সমূহ সম্ভাবনা থাকিবে, এমন অপরাধ কোনো বুদ্ধিমান মেধাবী কখনই করিবেন না।

মেধাবীরা যখন অপরাধী হইয়া উঠেন তখন তাহারা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেন। আর যে কোনো ধরনের অপরাধে যখন মেধার সমন্বয় ঘটে—তখন তা হয় নিপুণ, প্রায় নির্ভুল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বেগ পাইতে হয় সে অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন করিতে। অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমাগুলিতে এই সকল কাহিনী আমরা দেখিতে পাই। একবার পশ্চিমা দেশের একজন সিরিয়াল কিলার একের পর এক খুন করিবার পরও পুলিশ তাহাকে টিকিও ছুঁইতে পারিতেছিল না। ঐ সিরিয়াল কিলার শেষ অপরাধ করেন অত্যন্ত হিসাবনিকাশ করিয়া, আর তাহার পরই সে ধরা পড়ে পুলিশের জালে। পুলিশ তাহাকে ধরিবার পর জানিতে চাহিলেন তিনি এত বুদ্ধিমান হইবার পরও এইবার এত আনাড়ি ও বোকার মতো খুন করিলেন কেন? সিরিয়াল কিলার বলিলেন, এই খুনটি ছিল তাহার সবচাইতে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

সুতরাং যতই পরিকল্পনা করিয়া অপরাধ করা হউক না কেন, কোনো কোনো ত্রুটি বা আলামত অপরাধীরা রাখিয়া যান। আর তাহার সূত্র ধরিয়া অপরাধীর নাগাল পাওয়া খুব কঠিন হয় না। বড় বড় অপরাধীকে যাহারা শায়েস্তা করেন তাহারা ঐ সকল অপরাধীর চাইতেও নিশ্চিতভাবেই বুদ্ধিমান। শিক্ষিতও বটে। তবে তাহাদের সবচাইতে বড় শক্তি হইল সততা। সততার পরাজয় নাই। আপাতদৃষ্টিতে অপরাধীরা জয়ী হইলেও শেষ বিচারে তাহারা পরাজিত হইতে বাধ্য। এই জন্য ‘নো দাইসেলফ’—সবচাইতে বড় উপলব্ধির কথা। বুদ্ধিমানরা নিজেদের চিনিয়া থাকেন। নিজেদের না চিনিলে অনেকে মেধাবী হইয়া দুর্ধর্ষ অপরাধ করেন এবং লোভের যূপকাষ্ঠে নিজেদের বলি দেন। সুতরাং সর্বাগ্রে নিজেকে জানুন।

 

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘মতৈক্য’ ছাড়া মুক্তি বহুদূর

‘বুঝিবে সে কীসে, দংশেনি যারে’

কোনো কিছুই ভালো যাইতেছে না!

এই প্রবণতা বন্ধ করা উচিত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আত্মতৃপ্তি লাভ মানে যবনিকা পতন

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল