মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পশ্চাৎপদতা: সমাজের চিন্তক অংশকেও দায় নিতে হবে 

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ২৩:৪৪

পৃথিবীতে এ মুহূর্তে ধর্ম-বর্ণসহ নানান কারণে পশ্চাৎপদতা জেঁকে বসছে। তাই সে আমেরিকার এবরসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা হোক, আফগানিস্তানে মেয়েদের মুখ ঢেকে চলার নির্দেশ হোক আর নরসিংদীতে শার্ট-প্যান্ট পরার অপরাধে কিশোরীকে হেনস্তা করা হোক। তারপরে কেউ-বা ইতিহাস খুঁড়ে অতীতকে বের করে বর্তমানের সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগিয়ে দিচ্ছে ধর্মের নামে। আবার কেউ-বা তাদের দেশে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষ প্রবেশের বিরুদ্ধে রাজনীতির মাঠ গরম করছে।

যদিও মৌলবাদ কথাটির শব্দার্থ পজিটিভ, অর্থাৎ কোনো মৌল চিন্তায় বিশ্বাসী। তবে এ মুহূর্তে বাংলা ভাষায় মৌলবাদ ও ইংরেজিতে ফান্ডামেন্টালিস্ট দুই-ই চিহ্নিত হচ্ছে নেগেটিভ অর্থে। অর্থাৎ, যারা মৌলবাদে বিশ্বাস করে তারা মূলত একধরনের ধর্মীয়, বর্ণীয় বা কোনো আচরণগত পশ্চাৎপদ চিন্তায় বিশ্বাস করে। এই ধর্মীয় মৌলবাদকে বা যারা এ ধরনের মৌলবাদ ছড়াচ্ছে তাদের কাজকে একটু চিন্তা করে দেখল প্রথমে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো সশস্ত্র অংশ আরেকটি মনোজাগতিক। সশস্ত্র অংশ মূলত হত্যা ও খুনের রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা নিজ মতের পক্ষে তাদের সশস্ত্র মনোভাবকে প্রকাশ করে। আরেক অংশ হলো, ক্রমেই সমাজের মানসিকতাকে পেছন দিকে ঠেলতে থাকে। যার ফলে সমাজ থেকে আধুনিকতা চলে যায়। মানুষের ভেতর চিন্তার অগভীরতা সৃষ্টি হয়। মানুষ অনেক সময় চিন্তা না করেই পশ্চাৎপদ বিষয়গুলো জীবনাচরণে ও পারিবারিক সংস্কৃতিকে আরোপ করে।

সাধারণত এই দুই অংশের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সশস্ত্র অংশ মূলত সমাজের আধুনিক চিন্তার মানুষকে যেমন হত্যা করে, তেমনি কোনো বড় স্হাপনা বা অন্য কোনো জনঘনত্বপূর্ণ এলাকায় হামলার মাধ্যমে বেশি লোক হত্যা করে সমাজে একটা ভীতির সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্হির করে। অন্যদিকে মনোজাগতিক বিষয়টি ঘুণ পোকার মতো কুরে কুরে খেয়ে মানুষের মনের আধুনিক চেতনাকে শেষ করে দেয়। পরিবার থেকে ক্রমেই আধুনিক চিন্তা চলে যায়। আর এই পরিবার ও মানুষের চেতনা পশ্চাৎপদতা দ্বারা আক্রান্ত হলে মূলত সমাজের কমজোর অংশটির ওপর তার আঘাত পড়ে বেশি। সমাজের এই কমজোর অংশের প্রথম প্রতিনিধি নারী ও দ্বিতীয় প্রতিনিধি শিশু। সমাজে পশ্চাৎপদতা এলে নারীর স্বাভাবিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়। আর নারীর ওপর এই প্রভাব ফেলার ফলে তার বড় অংশ গিয়ে পড়ে শিশুর ওপর।

বাংলাদেশে এই মৌলবাদ ২০০৪-৫-এর সময় থেকে চেপে বসে জোর আকারে। নানান জায়গায় বোমা হামলা হতে থাকে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ‘হলি আর্টিজান বেকারি’, শোলাকিয়া ঈদের জামাতসহ বিভিন্ন স্হানে জঙ্গি হামলাও হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের সমাজে পশ্চাৎপদতার এই সশস্ত্র অংশটি জঙ্গিরূপে নানান স্হানে হামলা করতে থাকে। তাদের ভেতর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসএর সদস্যও পাওয়া যায়। এমনকি অল্প হলেও কিছু বাঙালি ছেলেমেয়ে স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে জঙ্গি জীবনে চলে যায়। যেমনটি এখনো জঙ্গিরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পরেও আফগানিস্তানে আছে। আর এই জঙ্গি আছে পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশে, এমনকি মাঝে মাঝে ইউরোপের কোনো কোনো দেশে তাদের তত্পরতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশকে ঐ শক্তি আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ধরেছিল। তারা পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু এখানে বাংলাদেশের সরকার, বিশেষ করে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার বড় সাফল্য হলো, বাংলাদেশ থেকে তিনি সশস্ত্র জঙ্গি নিমূ‌র্ল করেছেন। এখন বাংলাদেশে সশস্ত্র জঙ্গির হার জিরো না হলেও পাকিস্তান বা নাইজেরিয়ার সঙ্গে তুলনার তো কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

এ মুহূর্তে চারপাশে তাকালে মনে হবে, আসলে এই পশ্চাৎপদ অনাধুনিক চিন্তাচেতনা সত্যিই পাকাপোক্ত আসন গেড়ে বসেছে সমাজে ও অধিকাংশ মানুষের মনে। এবং এটাও সত্য, রাষ্ট্র সরাসরি না করলেও এ কাজে কিছুটা হলেও পৃষ্ঠপোষকতা করছে। কিন্তু এই সত্য মানতে হবে, রাষ্ট্র যদি তার পৃষ্ঠপোষকতা তুলেও নেয়, তার পরও একা রাষ্ট্র মানুষকে এখান থেকে ফেরাতে পারবে না। মানুষকে এখান থেকে ফেরাতে হলে রাষ্ট্রের পাশে, বিশেষ করে সরকারের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে মুক্ত বিবেক নিয়ে, আধুনিক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে—সমাজের সব চিন্তক অর্থাৎ, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক সবাইকে। তাদেরকে নিজ নিজ কাজের ভেতর দিয়ে সাহস করে সত্যর পক্ষে, আধুনিকতার পক্ষে প্রতিনিয়ত কথা বলতে হবে। একসময় যেমন ব্রিটিশ তাড়ানোর জন্য কবিতা থেকে সাংবাদিকতা পর্যন্ত এককাট্টা হয়েছিল, ঠিক একই অবস্হা ঘটেছিল পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে। এখন এই সমাজের পশ্চাৎপদতা কাটাতেও সব শ্রেণির চিন্তককে এককাট্টা হতে হবে। তাদের লেখালেখি, তাদের সভা, সমাবেশ, সেমিনার, কবিতা, গান, নাটক ও সিনেমা সবকিছুর মাধ্যমে সমাজকে আধুনিক সমাজ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি নিবেদিত মন নিয়ে নামতে হবে।

এ কাজে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তারা যদি মনে করে সরকার আমাদের শতভাগ সাহাঘ্য করবে, সরকার আমাদের প্রটেকশন দেবে—তাও ভুল হবে। কারণ, একদিকে বর্তমানের এই পরিবর্তিত সময় ও সমাজের সঙ্গে সরকার অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের অসত্ আমলা শ্রেণি ও অসত্ ব্যবসায়ী শেণি সব সময়ই চায়—সমাজ এমন অন্ধকারে থাকুক। কারণ সমাজের যত চোখ ফুটবে ততই ঐ অসাধুদের কীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে। আর ঐ সেই হীরক রাজার দেশের শ্লোক, ‘যত কম জানে, তত বেশি মানে’। এক শ্রেণির রাজনীতিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের ঐ অসত্ আমলা ও রাষ্ট্রের পাশাপাশি ঘুরঘুর করা অসত্ ব্যবসায়ীরা এই বেশি মান্যই চায়। সে কারণে সমাজের চোখ খুলে যাক, এটা তারা চায় না।

তাই সমাজের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক ও শিক্ষক সবাইকে যেমন আধুনিক সমাজের জন্য, আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য সমাজের ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে তেমনি সরকারের একাংশের সঙ্গেও তাদের যুদ্ধ করতে হবে।

সকলেই জানে, সমাজের এই চিন্তক শ্রেণির একটি বড় অংশের মেরুদণ্ড নানান কারণে ভেঙে গেছে। কারণ, তাদের অনেকের পেশা এখন একশ্রেণির অসাধু আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে কঠিনভাবে বাঁধা। এদের অস্বীকার করে বেরিয়ে আসার মতো ক্ষমতা অনেকেই হারিয়ে ফেলেছে। তবে একটা বিষয় সত্য হলো, যদি সমাজের একটা অংশও সাহস করে এই অন্ধত্বের বিরুদ্ধে তাদের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাতে শুরু করে, আর তারা যদি অকুতোভয় হয়, তাহলে সেখানে একটা সময়ে গিয়ে তারা নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার সমর্থন পাবে।

একটু ইতিহাসের পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বাংলাদেশে যেখানেই যারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে আধুনিক পথে এগিয়ে নিতে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, শেষ অবধি শেখ হাসিনা তাদের সমর্থন করেছেন। তা সে যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হোক আর গণজাগরণ মঞ্চ হোক। এখানে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, মানুষকে এ পথে আনার দায়িত্ব তো রাজনৈতিক নেতার। সারা পৃথিবীর ইতিহাস দেখুন—আধুনিকতা, আধুনিক সমাজ, রাষ্ট্র কিন্তু শুধু রাজনীতিবিদদের হাত ধরে আসেনি। সেখানে এই সিভিল সোসাইটি, এই চিন্তক সমাজের সব দেশে সব কালে বড় ভূমিকা আছে। তারা তরুণ হোক আর প্রবীণ হোক, তারাই আগে হেঁটেছে। তারা আধুনিকতার দুয়ারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে যখন খিল ভাঙতে অনেক বেশি শক্তির দরকার হয়েছে, তখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এসেছে।

তাই আজও বাংলাদেশের সেই সময়। এখন সমাজের চিন্তকদের সামনে হাঁটতেই হবে। সে পথে প্রথমে হয়তো সবাই নামবেন না, তার পরও কাউকে না কাউকে সাহস করে নামতে হবে। আর একবার চলা শুরু হলে—দেখা যাবে যতই পথ পাড়ি দেওয়া হবে, ততই এ কাজের মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। আলো নেই বলে যারা অন্ধকারে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল, তারা যখন জানবে আলোর জন্য ওরা পথে বের হয়েছে, তখন তারাও আর পিছে পড়ে থাকবে না। আর দেশকে আগামী নির্বাচনে সঠিক পথে রাখতে হলে দেশের চিন্তক সমাজকে এ কাজে এখনই নেমে পড়তে হবে, যত দেরি হবে ততই পথ দুর্গম হবে। তাই সত্য হলো, সময় বয়ে যায়। এখন আর ঘরের কোণে থাকার সময় নয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্যে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষকের গলায় জুতার মালা ও জুতার মাহাত্ম্য

একটু চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পাবেন

সিলেটে বন্যা: ত্রাণবিতরণে সমন্বয় জরুরি

ছেলের কাছে চিঠি ও বাক্‌স্বাধীনতা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পদ্মা সেতু: শেখ হাসিনার সক্ষমতার স্মারক

আমরা পারি-আমরাই পারি

পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী