সংকট নিষ্পত্তির প্রশ্নে ১৯৪৩ সালে হিটলারের সঙ্গে আলোচনার যে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক ভিত্তি ছিল প্রগতিশীলদের কাছে। হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটাতে নাৎসিদের সঙ্গে চুক্তি আলোচনার উদ্যোগ সেই পরিস্থিতিতে ক্ষমার অযোগ্য হয়ে ওঠে। মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের কাছে সে সময় একটাই বিকল্প ছিল—হিটলারের বার্লিন ব্যাংকারের ওপর দাঁড়িয়ে শেষ সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া। সেই ঘটনার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতির তুলনা করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জনের চিন্তা করা কিংবা আমরা যারা অবিলম্বে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তির আহ্বান জানাচ্ছি, তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করা একটি মারাত্মক ভুল হবে।
১৯৪৩ সালে যে দেশগুলো চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল, তারা প্রত্যেকেই যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল অথবা তাদের অনেকেরই অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল। মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক জনগণও ফ্রন্টলাইনে ছিল। জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেরূপ ভূমিকা পালন করেছিল, আজ পশ্চিমারা সেই একই কাজ করছে। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধরতদের সশস্ত্র করে উল্লাস করছে। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে জল, স্থল কিংবা আকাশে আক্রমণের চিন্তা পর্যন্ত করেনি ন্যাটো। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের চূড়ান্ত বিজয়ের পক্ষে আহ্বান জানানো নিতান্তই ভণ্ডামি এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। যেহেতু মস্কোর বাংকারে পুতিন বাহিনীকে শুধু কোণঠাসা করে রাখার মধ্যেই পশ্চিমের খেলা শেষ হবে না, তাহলে ইউক্রেনের চূড়ান্ত বিজয় কীভাবে আসবে? অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রের বিশাল এয়ারলিফ্ট ব্যবহারের সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে ইউক্রেনীয়রা শুধু রাশিয়ান সৈন্যদের ২৪ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগর উপকূলে এবং পূর্ব ডনবাস অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর পুতিন সন্দেহাতীতভাবে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাবেন। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য ফলাফল হবে সিরিয়া ও সাইপ্রাসের মতো ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকা ‘ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধের’ মতো।
তাছাড়া ইউক্রেনীয় যোদ্ধারা যদি রাশিয়ান সৈন্যদের পেছনে ঠেলে দিতে সফলও হয়, সেক্ষেত্রে আহত রাশিয়ান সরকার ইউক্রেনের স্বাভাবিকতার চিহ্নের পথে সর্বদা বাধা দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে চেষ্টা চালাবে। এক্ষেত্রে শুধু মস্কোর শাসন পরিবর্তনই ইউক্রেনের চূড়ান্ত বিজয়ের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ইউক্রেন ও ন্যাটোর জন্য এমন একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল কতটা সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন? তাছাড়া এই ভবিষ্যৎ ধারণার ওপর ইউক্রেনের বাজি রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, যেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টার বিষয়ে পশ্চিমাদের ট্র্যাক রেকর্ডের ফলাফল হতাশাব্যঞ্জক? এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বেশির ভাগ প্রমাণ বিপরীত চিত্র নির্দেশ করে। যুদ্ধের ফলাফল পুতিনের জন্য খারাপ হলেও অর্থনৈতিক যুদ্ধ তার জন্য বরং সুন্দরভাবে কাজ করছে। এটা সত্য যে, সুবিধাবঞ্চিত রাশিয়ানরা ভুগছে, দক্ষ শ্রমিকেরা পালিয়ে যাচ্ছেন এবং অনেক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সত্ত্বেও ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের রবিন ব্রুকসের মতে, রাশিয়ার চলতি হিসাবে একটি বিশাল পরিমাণ উদ্বৃত্ত জমা হচ্ছে (২০২২ সালে ২০০-২৫০ বিলিয়নে পৌঁছানোর অনুমান করা হচ্ছে, যা এপ্রিলে ৯৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ছিল)। রুবল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার মতো কিছুই থাকবে না। এই ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থায়নে পুতিনের শাসনব্যবস্থার কাজকে সহজ করে তুলবে। অনেক রাশিয়ান দরিদ্র হবে এবং তাদের আর্থিক অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা নেমে আসবে। মনে রাখতে হবে, পুতিনের দাবার বোর্ডে সাধারণ রাশিয়ানরা নিছক ঘুঁটি; ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করার জন্য প্রয়োজনবোধে তাদের বলিদান দিতেও পুতিন পিছপা হবেন না। তাছাড়া শক্তিশালী পশ্চিমা মিডিয়া যখন অন্যান্য বিষয়ে তাদের মনোযোগ ঘোরাবে, সে সময় ইউক্রেন ও ন্যাটোর মধ্যে ফাটল সৃষ্টির অপেক্ষায় রয়েছেন পুতিন।
এমন প্রেক্ষাপটে একটি চূড়ান্ত ইউক্রেনীয় বিজয়ের আহ্বান সবার জন্য একটি বড় পরাজয়ের ইঙ্গিত বহন করে। অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং জীবাশ্ম-জ্বালানি শিল্পপতিরা, যাদের ভাগ্য ইউক্রেন যুদ্ধ শক্তিশালীভাবে পুনরুজ্জীবিত করেছে, তারা ছাড়া এর সুফল পাবে না অন্য কেউই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ম্লান হয়ে আসবে। কেননা, ইউরোপ ইতিমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েছে। ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে উৎপাদিত শস্য ও সার আমদানির ব্যাঘাতের কারণে উন্নয়নশীল বিশ্ব ক্ষুধা এবং জোরপূর্বক অভিবাসনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। এমতাবস্থায় শুধু আলোচনার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব। এমনটি করা গেলে তা ইউক্রেন, ইউরোপ এবং মানবতার জন্য আরো ভালো ফলাফল বয়ে আনবে।
আমরা যারা চূড়ান্ত ইউক্রেনীয় বিজয়ের ভাবনার বিপক্ষে সতর্ক করছি, তাদের প্রতি নানা ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে। ‘ইউক্রেনীয়দের কী করতে হবে তা বলার আপনি কে?’—এজাতীয় প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমি প্রশ্নটি এখন উত্তরহীন রেখে দেব এবং এর পরিবর্তে ‘কীভাবে ইউক্রেনীয়দের সর্বোত্তম সমর্থন করা যায়’, তার ওপর ফোকাস করব। আমরা জানি, যারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাদের দুর্বল বলে চিহ্নিত করার পরিবর্তে অবশ্যই আলোচনার প্রস্তাবের ওপর আস্থাশীল ও অনুগামী করতে চেষ্টা করতে হবে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি এ মাসের শুরুতে ঘোষণা করেছেন, আলোচনা ছাড়া যুদ্ধ শেষ হতে পারে না। তিনি বলেছেন, ‘তারা আমাদের সেতুগুলো ধ্বংস করছে, তা সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি, সবগুলো সেতু এখনো ধ্বংস হয়নি।’ কাজেই যারা সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, তাদের উচিত যোদ্ধাদের একটি শান্তি আলোচনার পথে ধাবিত করতে চেষ্টা করা। আলোচনা শুরু হওয়ার আগে উভয় পক্ষের কথা বলতে পারার পরিবেশ নিশ্চিত করা। একটি ন্যঘ্য চুক্তির স্বার্থে সবাইকে অবশ্যই একমত হতে হবে যে, প্রত্যেকের কিছুটা অসন্তুষ্টি থাকবে সত্য, তবে প্রতিটি সম্ভাব্য বিকল্পের ওপর দাঁড়িয়েই একটি দুর্দান্ত ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে’ উপনীত হওয়া যায়। উভয় পক্ষকেই তাদের ক্ষতির চেয়ে লাভের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। পুতিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের অবস্থান ও সাহসী প্রতিরোধকে সম্মান জানাতে পরিকল্পিত শান্তিচুক্তিতে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে যে, রাশিয়ান সৈন্যরা তাদের ২৪ ফেব্রুয়ারির পূর্ববর্তী ঘাঁটিতে ফিরে যাবে। ডনবাস ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে গুড ফ্রাইডে চুক্তি (যা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘সমস্যা’ শেষ করেছে) বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শাসনের বিষয়ে বাস্তব নিদর্শন হতে পারে। উপরন্তু, সামরিক পুনর্নিযুক্তির ভয়কে প্রশমিত করতে রাশিয়ান-ইউক্রেনীয় সীমান্তের চারপাশে একটি বিস্তৃত ‘অসামরিক বাফার জোন’ অন্তভুর্ক্ত করা যেতে পারে।
তবে প্রশ্ন হলো, পুতিন কি এতে রাজি হবেন? মূলত এই চুক্তিতে তিনি তিনটি জিনিস চাইতে পারেন। পুতিন চাইবেন অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক। তিনি আরো চাইবেন যে, ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়াকে সংযুক্ত করার বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার টেবিলে ঠেলে দিয়ে ভবিষ্যতের অনির্ধারিত সময়ে সমাধান করা হোক। এবং তিনি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইবেন, যা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ের কাছ থেকে ইউক্রেনেরও একই ধরনের নিরাপত্তা গ্যারান্টির প্রয়োজন রয়েছে। ইউক্রেনের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর উচিত হবে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউকে জড়িত করে এমন একটি ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা। মনে রাখতে হবে, আলোচনার মাধ্যমেই যে শান্তি নেমে আসবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে একটি চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা না করা হলে তা ইতিহাসের পাতায় ‘ক্ষমার অযোগ্য’ হয়ে থাকবে।
হ লেখক:গ্রিক অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ
দ্য জর্ডান টাইমস থেকে ভাষান্তর: সুমৃত্ খান সুজন
