মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লিজেন্ডদের জানিতে হয়—কখন থামিতে হইবে

আপডেট : ২৬ মে ২০২২, ০২:১৯

বলা হইয়া থাকে, প্রতিটি মানুষ একটি নির্দিষ্ট কর্মদায়িত্ব লইয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। মানুষটি তাহার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন এবং একটি সময়ে তাহাকে পৃথিবী হইতে বিদায় লইতেই হয়। মানুষের শক্তি-সামর্থ্য, মেধা, কার্যক্ষমতা চিরকাল একরকম থাকে না। থাকিতে পারে না। ব্রায়ান লারা কিংবা শচীন তেন্ডুলকারকেও অভূতপূর্ব পারফরম্যান্সের মহাসমুদ্রে সাঁতার শেষে একসময় তীরে ভিড়িতে হইয়াছে।

দিয়াগো ম্যারাডোনা মাঠে নামিলেই প্রতিটি ম্যাচে ভেলকি দেখাইতে পারিবেন, ঈশ্বরের হাত দিয়া গোল দিতে পারিবেন—এমনটি আকাশকুসুম কল্পনা। রোনালদিনহো ফ্রি-কিক পাইলেই প্রতিবারই বাতাসের ঘূর্ণিতে প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াইতে পারিবেন—ইহা বাড়াবাড়ি কল্পনা। খ্যাতির মধ্যগগন হইতে এই সমস্ত লিজেন্ড যখন ক্রমশ পশ্চিমে হেলিয়া পড়েন তখন সময় থাকিতেই তাহাদের অবসর গ্রহণ করিতে হয়। তেন্ডুলকার কিংবা লারা বয়স হইবার পরও অবসর না লইয়া যদি ব্যাটিং করিতে গিয়া প্রতিবারই শূন্য বা সামান্য রানে আউট হন এবং খারাপ পারফরম্যান্স করিতে করিতে অবশেষে দল হইতে বাদ পড়েন এবং অতঃপর দলের বাহিরে থাকিয়াই দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া অবসর গ্রহণ করেন, তবে তাহা অত্যন্ত বেদনার হইত। কারণ, লিজেন্ডদের জানিতে হয়—কখন থামিতে হইবে। কখন ফুলস্টপ দিতে হইবে। ফর্মে থাকা অবস্থায় বৎসরের পর বৎসর তাহারা যেই ভেলকি দেখাইয়াছিলেন, তাহা কখনই চিরকাল বজায় থাকিবে না, ইহাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কেহ যদি সঠিক সময়ে অবসরে না যান, তখন কী হইতে পারে? ইহার উদাহরণ আমরা মহাভারতে দেখিতে পাই। মহাপরাক্রমশীল পঞ্চপাণ্ডবের শক্তিকে ভয় পাইত না—ভূ-ভারতে এমন কেহ ছিল না। অজু‌র্ন ছিল তাহাদের শ্রেষ্ঠ বীর। মৌষলপর্বে শ্রীকৃষ্ণ যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তাহার সখা অজু‌র্নের প্রতি অনুরোধ ছিল—দ্বারকানগরীর অসহায় নারী এবং শিশুদের রক্ষা করিয়া অজু‌র্ন যেন তাহাদের পাণ্ডবরাজ্য হস্তিনাপুরে লইয়া যায়! অজু‌র্ন যখন সখার আদেশ রক্ষায় যাদব নারীদের লইয়া হস্তিনাপুরে যাইতেছিলেন তখন পথিমধ্যে কিছু ডাকাত, যাহাদের সম্বল কেবল লাঠি, আক্রমণ করিয়া বসিল শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধারী অজু‌র্নকে। অজু‌র্ন তাহার গাণ্ডীব তুলিতে গিয়া দেখিলেন তিনি গাণ্ডীব তুলিতেই পারিতেছেন না! তাহার যত শক্তিশালী অস্ত্র ছিল—সকল অস্ত্র তিনি ভুলিয়া গিয়াছেন! মহাশক্তিশালী অর্জুনের চোখের সামনে দিয়ে সমস্ত সম্পত্তি এবং যাদব নারীদের লইয়া ডাকাতরা চলিয়া গেল। অজু‌র্ন রিক্ত হস্তে হস্তিনাপুরে ফিরিয়া মহাজ্ঞানী জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করিলেন—কেন তিনি তাহার গাণ্ডীব ধনুক তুলিতে পারিতেছেন না, কেন সামান্য কয়েক জন ডাকাতের নিকট তাহাকে পরাজয় বরণ করিতে হইল? কেন তাহার অক্ষয় তূর্ণ নিঃশেষিত হলো। মহাজ্ঞানী যুধিষ্ঠির বলিলেন যে, অজু‌র্নের এখন অবসর গ্রহণের সময় আসিয়াছে। তাহাদের সময় হইয়াছে পৃথিবীর হইতে বিদায় লইবার, মহাপ্রস্থানে যাইবার।

সুতরাং, লিজেন্ডদের জানিতে হয় কখন থামিতে হইবে। সেই অনুযায়ী সময় থাকিতেই অবসরে চলিয়া যান। নিজের দুর্দান্ত ভাবমূর্তি জনমানসে ধরিয়া রাখেন। আমরা দেখিয়াছি, ২৭ বৎসর কারাবন্দি থাকিবার পর মুক্তি পাইয়া ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা। অতঃপর ১৯৯৬ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নূতন গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার তত্ত্বাবধান করেন এবং ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয় বারের মতো অংশ না লইয়া রাজনীতি হইতে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর লইবার পর তিনি আরো ১৪ বৎসর বাঁচিয়া ছিলেন। স্পষ্টতই নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মহামানবেরা জানেন কখন থামিতে হয়। তাহাকে কী হিসাবে পৃথিবীর মানুষ মনে রাখিবে—এই প্রশ্নের জবাবে নেলসন ম্যান্ডেলা বলিয়াছিলেন—‘আমি চাই আমার সম্পর্কে এই রকম কথাই বলা হউক, এইখানে এমন এক মানুষ শায়িত আছেন, যিনি পৃথিবীতে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিয়াছেন।’

সময়মতো নিজ কর্মসম্পাদন শেষে নিজেকেই বুঝিতে হইবে এখন সময় হইয়াছে থামিবার। যিনি ইহা বুঝিতে পারেন—তিনিই যথার্থ জ্ঞানী। পৃথিবীর মানুষ তাহাকে আরো বেশি মনে রাখে।

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল

স্বপ্ন ভাঙিয়া যায় বাস্তবতার করাঘাতে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নার্স নিয়োগ ও সেবাব্রত

গণপরিবহনের দুই রকম চিত্র কেন?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই রক্ষাকবচ

কিছু শিক্ষার মূল্য অনেক অনেক বেশি