মধু ফলের মাস

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০৪:০৪

অভিধানে মধুমাস চৈত্র হলেও বাঙালির মুখে-জিহ্বায় জ্যৈষ্ঠই মধুমাস। গাছে গাছে পেকে আছে আম—কোনোটা সিঁদুরে, কোনোটা হলুদে, কোনোটা উভয়রই মিশ্রণে রাঙানো। কত কত নাম তার! সূর্যপুরি, আম্রপালি, খিরসাপাতি, গোবিন্দভোগ, মিছরিভোগ, চিনিভোগ, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, বারি...হাল আমলে নতুন নতুন স্বাদ, পুষ্টি, রং নিয়ে যুক্ত হচ্ছে আরো কত আম! গবেষণার শেষ নেই। 

এখন আর ভিটা, জঙ্গল, জমির আল, বাইরের উঠান কিংবা আঙিনায় দু-চারটি বড় বড় গাছ নয়, আমগাছ টবে করে উঠে গেছে ছাদে। বিঘাকে বিঘা চাষ হচ্ছে আমের। অর্থনৈতিক লাভ আর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হচ্ছে সময়ের সঙ্গে। আমরা কি বুঝতে পারছি, গাছ থেকে পড়া আম কুড়ানোর দিন সংকুচিত হয়ে আসছে! কেননা, বামন গাছে ফলানো হচ্ছে! গ্রীষ্মের তপ্ত গরমে গাছতলায় বসে কাঁচা-পাকা আম কেটে কেটে লবণ, মরিচ, হলুদ, তেল আর চিনি বা গুড় মেখে কচুপাতা কিংবা কলাপাতায় আমঝালা বা আমমাখা খাওয়ার দিন কি ফুরিয়ে যাচ্ছে! লাল লাল পাকা পাকা লিচু যেন ফুলে ফুলে সাজিয়ে গাছকে করেছে উজল রঙিন! কে লোভ সামলাতে পারে সুমিষ্ট রসের স্বাদ না নিতে! কত কত নাম—মাদ্রাজি, চায়না, বোম্বাই...। ঝোপা ঝোপা সাদা জামরুল আর লাল জামরুলও কি কম লোভ ধরায়! যদিও সাদাটির স্বাদ খানিকটা পানসে। কিন্তু এর রসালো গন্ধ লোভাতুর করে তোলে নাকি! জামের রস দিয়ে মুখ রঙিন করতে চায় না কে! মানুষে পাখিতে স্বাদ নেওয়ার প্রতিযোগিতা লেগেই থাকে যতক্ষণ না জাম শেষ হয়! বাতাস আর পাখিদের কল্যাণে ঝরে পড়া জাম কুড়ানোতে যে কী মজা! ধূসর হলুদে পাকা পাকা গাব। তবে কোনো কোনো গাছে ফের ধূসর রঙা গাবের গুটি দেখা যাচ্ছে। 

গোলাপ জামের ঘ্রাণমাখা মিষ্টি স্বাদ যে পেয়েছে সে কি ভুলতে পারে! দেশি হলুদ রঙা খেজুরের বাদা ঝুলে আছে গাছের ডগায়। খেজুরের বিচি ফাটিয়ে দাঁতের ওপরে বসিয়ে বড় দাঁত দেখানোর খেলা কি আজো হয়! প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডেউয়া কাঁঠালের মতো গাছে গাছে। পাকা ডেউয়া টক মেশানো মিষ্টি। কাঁঠালের কথা কী আর নতুন করে বলা! ঠোঁটে হাতে লাগুক আঠা, তাতে কী! পাকা কাঁঠালের ঘ্রাণে কে তিষ্ঠতে পারে! কাঁঠালেরও কত নাম—বারোমাসি, ভুরভুরি, মলা, সাংগাইল, শিয়াল খাওয়া, চাপিয়া, খাজা, রসুয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। লটকন আর আঁশফলের স্বাদ থেকে কে বঞ্চিত হতে চায়! ঝোপে-জঙ্গলে বড় হতে থাকা বুনো আনারস, আহা, কী তার সৌন্দর্য! বুনো বা জংলি আনারস বিলুপ্ত প্রায়। চাষ করা আনারস পাওয়া যায় ফলের দোকানে। 

তরমুজ, বাঙির কথা কি নতুন করে বলতে হবে! বাঙিতে মিষ্টি বা চিনি মিশিয়ে যতই খাই, তবু স্বাদে-গন্ধে কম নয়! আর সুমিষ্ট রসালো তরমুজ কেজি দরে না হেচকায় কেনাবেচা হবে তা নিয়ে কথাবার্তা হলেও স্বাদে ভরায় জিহ্বা আর রসে ভরায় মুখ! অন্যদিকে জ্যৈষ্ঠ কি শুধু ফলের মাস! পথের ধারে, ঝোপে-জঙ্গলে বেড়ে ওঠা সোনালুর হলুদে সোনা রাঙা আভায় কার না চোখ জুড়ায়! যদিও অবহেলার এ গাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে! কেউ কি বেলফুলের ঘ্রাণ পেয়েছে এ সময়! কিংবা অজু‌র্ন আর হরিতকির! কিংবা রক্ত চন্দন ফুলের! শুধু কি ঘ্রাণ! তাকিয়ে দেখি খানিকটা সময়, দেখব, এদেরও সৌন্দর্য আছে চোখ আর মন জুড়ানোর। ফল কি শুধু মানুষের রস আস্বাদন আর উদরপূর্তির জন্যই! কিংবা অর্থনৈতিক লাভের জন্য! প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণী বা পাখি, যারা সৌন্দর্য বাড়ায়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, তারাও ফল খাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু আজকাল ফল রক্ষার জন্য যেভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে (জাল পাতানো, বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া, বিষটোপ ব্যবহার, তীব্র আলোক রশ্মি বা শব্দের ব্যবহার) তাতে তো এদেরকে ফল খাওয়া থেকে শুধু বঞ্চিতই করছি না, পাশাপাশি ফল খেতে এসে নিজের জীবন দেওয়ার ব্যবস্থাও করছি! তাদের আবাসস্থল, খাবারের সংস্থান—বন, জঙ্গল, গাছ, গুল্মলতা কেটে উজাড় করছি। 

অন্যদিকে ফল রক্ষায় ব্যবস্থা নিচ্ছি। এদের জন্য একটু সদয় হতে কি পারি না! আবার অপরিপক্ব ফল ভোক্তাদের কাছে চলে যাচ্ছে বিক্রেতাদের অর্থ লোভের কারণে। কেননা অপরিপক্ব ফল পেড়ে বেশি লাভের আশায় রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে আগাম বিক্রি করা হয়। এতে একদিকে ভোক্তারা পরিমিত পুষ্টি ও স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ফলের রাসায়নিক পদার্থ শরীরে রোগ বাধাচ্ছে। আবার ফল দীর্ঘদিন সতেজ রাখতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন জাতীয় পদার্থ মেশানো হয়। এসব কি দূর হবে না! 

গাইবান্ধা।

ইত্তেফাক/এএইচপি