তাহারা মারমুখী কবে ছিল না?

আপডেট : ২৯ মে ২০২২, ০৬:০৯

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু দিন ধরিয়া কোনো সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটে নাই। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরিয়া প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় আবার উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। 

দুটি বিবদমান ছাত্রসংগঠনের মধ্যে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র লইয়া সংঘর্ষে লিপ্ত হইতে দেখা গিয়াছে। এমনকি প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া দেখা গিয়াছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলেও ইহার জের ধরিয়া জাতীয় রাজনীতিও সরগরম হইয়া উঠিয়াছে। চলিতেছে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্লেমগেইম বা দোষারোপের রাজনীতিও। 

ইহারই মধ্যে একটি রাজনৈতিক জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ছাত্রসংগঠনটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযোগ আনিলেন। তাহার বক্তব্য অনুযায়ী এই ছাত্রসংগঠন ছাত্রদের নহে, সন্ত্রাসীদের সংগঠন। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে কেহ পালটা প্রশ্ন করিতে পারেন, তাহা হইলে কোন্ আমলে সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠন এমন মারমুখী আচরণ করে নাই?

আমাদের প্রশ্ন হইল, প্রতিটি সরকারের আমলে আমরা সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনকে কি লাঠিয়াল বাহিনী হিসাবে ব্যবহৃত হইতে দেখি নাই? পাকিস্তান আমলে এনএসএফ কী পরিমাণ অত্যাচার-নির্যাতন করিয়াছে, তাহা বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের যেসব নেতাকর্মী আজো বাঁচিয়া আছেন, তাহারাই বড় সাক্ষী। স্বাধীনতা লাভের পর রাজনীতির এই ধারা বহাল থাকিবার কথা ছিল না। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ছাত্রনেতা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কাহারা জড়িত ছিলেন তাহা আমাদের অজানা নহে। সেই ধারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশতক পর এখনো চলিতেছে।

উল্লেখ্য, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি মুসলমানদের ক্ষতিপূরণের উপায় ও সান্ত্বনা হিসাবে। এই কারণে আমরা দেখিতে পাই, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররা গোড়া হইতেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন। ১৯২৮ সালে কংগ্রেসের উদ্যোগে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি, ১৯৩২ সালে মুসলিম লীগের উদ্যোগে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি এবং ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এতদাঞ্চলে ছাত্ররাজনীতি বিকশিত হয়। 

এই রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ ও সচেতনতার কারণে বাঙালির ভাষা আন্দোলন হইতে শুরু করিয়া শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ২০০৭ সালে তথাকথিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী শিক্ষক-ছাত্রগণ ঐতিহাসিক ও সাহসী ভূমিকা পালন করিয়াছেন। ছাত্রসমাজের এই গৌরবজনক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা কম-বেশি বিতর্কিত ও সমালোচিত ছিল। 

পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে রাজনীতির প্রভাব দূর করিতে ও উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখন দেড় শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকিলেও এবং ২০১৫ সালে ভ্যাট আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করিলেও আজও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বলিলেও অতু্যক্তি হইবে না। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে কোনো বড় ধরনের সংঘাতেও দেশবাসী এতটা উত্তেজিত ও উদ্বিগ্ন হয় না, যতটা উদ্বিগ্ন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া। এই কারণে প্রতিটি সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখিতে চাহিয়াছে। একই ভয় ও আশঙ্কায় বিরোধীদের ওপর সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা বরাবরই ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের হল এমনকি ক্যাম্পাসছাড়া করিয়াছে।

অতএব, সবাইকে বিশেষত নূতন প্রজন্ম ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ছাত্রকে বোকা ভাবার কোনো কারণ নাই। সন্ত্রাস কাহারা, কখন, কীভাবে ও কত প্রকারে করিয়াছে তাহা তাহাদের ভালোমতোই জানা।

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন